বাজেট ২০২৬–২৭: উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি নাকি ব্যয়ের ফাঁদে আটকে পড়া অর্থনীতি?
লেখক: ইমদাদুল হক,সাংবাদিক ও কলামিস্ট:
প্রতি মাসে আমরা আয় করি, খরচ করি, কিছু সঞ্চয় করার চেষ্টা করি—আর না পারলে ধার করি। মাসের শুরুতে যত পরিকল্পনাই করি না কেন, মাস শেষে প্রায়ই দেখা যায় হিসাব মেলে না।রাষ্ট্রের বাজেটও ঠিক এই বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি—তবে পার্থক্য হলো, এখানে ভুলের খেসারত দেয় কোটি কোটি মানুষ।বাংলাদেশের ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট আকারে বিশাল—প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি। কিন্তু বড় প্রশ্ন হলো: এই বাজেট কি বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়িয়ে তৈরি, নাকি কাগজে-কলমে উচ্চাভিলাষী এক আর্থিক নকশা?
রাজস্বের সংকট: লক্ষ্য বড়, সক্ষমতা ছোট সরকার বাজেটে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে প্রায় ৫ লাখ কোটি টাকার বেশি। কিন্তু এখানে একটি মৌলিক সমস্যা রয়েছে—বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবে রাজস্ব সংগ্রহে পিছিয়ে।জিডিপির তুলনায় কর-জিডিপি অনুপাত এখনো ৮–৯ শতাংশের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় কম।অর্থাৎ, বাস্তবতা বলছে—সরকার যত আয় করতে চায়, তত আয় করতে পারে না।ফলে যা হয়—→ বাজেটের শুরুতেই ঘাটতির বীজ বপন হয়ে যায়।ঘাটতির অর্থনীতি: নিয়ন্ত্রিত ঝুঁকি নাকি বিপজ্জনক নির্ভরতা?এই বাজেটে সম্ভাব্য ঘাটতি প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি, যা জিডিপির প্রায় ৫ শতাংশের কাছাকাছি।তাত্ত্বিকভাবে এটি সহনীয়। কিন্তু আসল প্রশ্ন হলো—এই ঘাটতি কীভাবে পূরণ হবে?
সরকারের পরিকল্পনা:
বৈদেশিক ঋণ
অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ঋণ
সঞ্চয়পত্র
এখানেই ঝুঁকির কেন্দ্রবিন্দু।
যদি সরকার ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেয়—
→ বেসরকারি খাত ঋণ পাবে না
→ বিনিয়োগ কমবে
→ কর্মসংস্থান স্থবির হবে
অন্যদিকে, সঞ্চয়পত্রে উচ্চ সুদ দিয়ে ঋণ নিলে—
→ ভবিষ্যতে সুদের চাপ বাড়বে
→ বাজেটের বড় অংশ চলে যাবে ঋণ শোধে
অর্থাৎ, আজকের উন্নয়ন কালকের বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
উন্নয়ন ব্যয়: প্রকৃত বিনিয়োগ নাকি রাজনৈতিক প্রদর্শনী?
বাজেটে উন্নয়ন ব্যয় (ADP) উল্লেখযোগ্য অংশ জুড়ে আছে। অবকাঠামো, জ্বালানি, যোগাযোগ খাতে বড় বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
কিন্তু একটি কঠিন প্রশ্ন এড়ানো যায় না—
এই প্রকল্পগুলো কি অর্থনৈতিকভাবে যৌক্তিক, নাকি রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণীয়?
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে একটি সমস্যা দেখা যাচ্ছে:
প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি
সময়মতো বাস্তবায়ন না হওয়া
প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক রিটার্ন না পাওয়া
ফলে উন্নয়ন ব্যয় সবসময় উন্নয়ন তৈরি করে না—
কখনো কখনো এটি হয়ে ওঠে অপচয়ের আরেক নাম।
মূল্যস্ফীতি: বাজেটের নীরব প্রভাব
বর্তমানে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। খাদ্য ও নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে চাপে ফেলেছে।
এই বাজেটে যদি—
ভ্যাট বা শুল্ক বাড়ানো হয়
জ্বালানি বা বিদ্যুতের দাম সমন্বয় করা হয়
তাহলে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে বাজারে।
অর্থাৎ, বাজেট ঘোষণার দিনই নির্ধারণ হয়ে যায়—
আপনার মাসের বাজার খরচ বাড়বে, না কমবে।
টাকা ছাপানোর প্রলোভন: অদৃশ্য বিপদ
যখন ঘাটতি বাড়ে, তখন একটি “সহজ সমাধান” সামনে আসে—কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা সরবরাহ বাড়ানো।
কিন্তু বাস্তবতা নির্মম:
→ উৎপাদন না বাড়লে
→ টাকা বাড়ানো মানে
→ মূল্যস্ফীতি বাড়ানো
এটি ধীরে ধীরে অর্থনীতিকে অস্থিতিশীল করে তোলে।
সামাজিক খাত: বিনিয়োগ নাকি আনুষ্ঠানিকতা?
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হলেও প্রশ্ন থেকে যায়—
এটি কি পর্যাপ্ত?মানবসম্পদ উন্নয়ন ছাড়া কোনো অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হতে পারে না।
দি শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ জিডিপির তুলনায় কম থাকে,
তাহলে উন্নয়ন কাগজে থাকবে—বাস্তবে নয়।
একজন নাগরিক কী বুঝবেন?
পুরো বাজেট পড়ার দরকার নেই। এই ৫টি প্রশ্ন করলেই আপনি বুঝে যাবেন বাজেট আপনার পক্ষে নাকি বিপক্ষে:
১. আমার খরচ বাড়বে নাকি কমবে?
২. আমার আয় থেকে কর বেশি কাটা হবে কি না?
৩. নতুন চাকরির সুযোগ তৈরি হবে কি না?
৪. সরকার ভবিষ্যতে বিনিয়োগ করছে নাকি শুধু ব্যয় করছে?
৫. ঋণের বোঝা বাড়ছে নাকি নিয়ন্ত্রণে আছে?
বাজেট শুধু অর্থনীতি নয়, এটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত
বাজেট মূলত একটি রাজনৈতিক দলিল—যেখানে ঠিক করা হয় কে কত সুবিধা পাবে, আর কে কত চাপ বহন করবে।
সুতরাং প্রশ্নটা এখন অর্থনীতির নয়, দায়িত্বের—
রাষ্ট্র কি সত্যিই নাগরিকের পকেটের কথা ভাবছে, নাকি সংখ্যার খেলায় বাস্তবতাকে আড়াল করছে?
কারণ শেষ পর্যন্ত বাজেটের সফলতা নির্ভর করে একটি বিষয়েই—
এটি কি মানুষের জীবন সহজ করছে, নাকি আরও কঠিন করে তুলছে।



