হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে বহুমাত্রিক হরিলুট
- কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরে দুর্নীতি, পর্ব-২,
মোঃ আলমগীর হোসেন:
কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের আওতাধীন এসেট (ASSET) প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে একের পর এক নিত্যনতুন দুর্নীতির তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে নিত্যনতুন কৌশল অবলম্বন করে নিজেদের ধরাছোঁয়ার বাইরে রাখার চেষ্টা করছেন তারা। নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য দপ্তরটিকে হরিলুটের স্বর্গরাজ্যে পরিণত করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যেন দেখার কেউ নেই। এমন কোনো খাত নেই, যেখানে দুর্নীতির কালো ছায়া পড়েনি। এসেট (ASSET) প্রকল্পটি ২০২১ সালে দেশের যুবসমাজের দক্ষতা বৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক মান উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকারি অর্থায়নে সম্পূর্ণ বিনা খরচে এন্টারপ্রাইজ-বেইজড (ক থেকে চ সিরিয়াল নম্বর অনুযায়ী) ছয় ধরনের প্রশিক্ষণের ব্যয় নির্ধারণ করে। পরবর্তীতে এটিকে ভাগ করে তিনটি সাইকেলে রূপান্তর করা হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মালিক তাদের দুর্নীতি-সংক্রান্ত অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট মালিক পক্ষের অভিযোগ সমুহ:
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট মালিক পক্ষের অভিযোগ, বহিরাগত প্রশিক্ষকের Subsistence Expense (মোট ১৬ ঘণ্টা, এক মাসে অনধিক ৮ ঘণ্টা) হিসেবে প্রতি ঘণ্টায় ২,৫০০ টাকা করে মোট ৪০,০০০ (চল্লিশ হাজার) টাকা নির্ধারিত রয়েছে।
প্রশিক্ষণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের প্রশিক্ষকের Subsistence Expense হিসেবে দুজন প্রশিক্ষককে ৪৩ দিন প্রতিদিন দুই ঘণ্টা করে প্রতি ঘণ্টায় ৫০০ টাকা হিসেবে মোট ৮৬,০০০ (ছিয়াশি হাজার) টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
‘খ’ সিরিয়ালের ক্ষেত্রে বহিরাগত প্রশিক্ষকের Subsistence Expense (মোট ১৬ ঘণ্টা, এক মাসে অনধিক ৮ ঘণ্টা) হিসেবে প্রতি ঘণ্টায় ২,৫০০ টাকা করে মোট ৪০,০০০ (চল্লিশ হাজার) টাকা নির্ধারিত রয়েছে।
প্রশিক্ষণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের দুজন প্রশিক্ষকের Subsistence Expense হিসেবে ৪৩ দিন প্রতিদিন দুই ঘণ্টা করে প্রতি ঘণ্টায় ৫০০ টাকা হিসেবে মোট ৮৬,০০০ (ছিয়াশি হাজার) টাকা এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রশিক্ষকের Subsistence Expense হিসেবে দুজন প্রশিক্ষককে প্রতিদিন মোট ৪৩ দিন প্রতি ঘণ্টায় ৫০০ টাকা করে মোট ৮৬,০০০ (ছিয়াশি হাজার) টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রধান অতিথির গিফট বাবদ ৫,০০০ (পাঁচ হাজার) টাকা, সভাপতির সান্ড্রি গিফট বাবদ ৪,০০০ (চার হাজার) টাকা এবং তিনজন বিশেষ অতিথির সান্ড্রি গিফট বাবদ জনপ্রতি ৪,০০০ টাকা করে মোট ১২,০০০ (বারো হাজার) টাকা বরাদ্দ রয়েছে।
এ ছাড়া সরেজমিন মনিটরিংয়ের জন্য ISC/Association-১টি, PMU-১টি, DTE-১টি এবং TMED-১টিসহ মোট চারটি প্রতিষ্ঠান থেকে চারজনকে প্রতিবার ৪,০০০ টাকা করে মোট ১৬,০০০ (ষোল হাজার) টাকা দেওয়ার কথা রয়েছে।
তথ্যদাতাদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, এ খাতে মোট ব্যয় দাঁড়ায় ৩,৭৫,০০০ (তিন লাখ পঁচাত্তর হাজার) টাকা। তবে তাদের দাবি, এখানে প্রকৃত খরচ হয় শুধুমাত্র ISC/Association-এর ব্যবস্থাপনা ব্যয় হিসেবে প্রতি প্রতিষ্ঠান ও প্রতি ব্যাচে থোক ৬,০০০ (ছয় হাজার) টাকা। বাকি অর্থ আত্মসাৎ করা হচ্ছে বলে তারা অভিযোগ করেন। এত গেল একটি প্রতিষ্ঠানের হিসাব। প্রতিবেদকের কাছে সমগ্র বাংলাদেশ থেকে অন্তত ৮৫৩টি প্রতিষ্ঠানের নাম, ঠিকানা ও দপ্তর সম্পর্কিত অনিয়মের তথ্য এসেছে।
তাদের দাবি, দেশে এমন হাজার হাজার প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সেই হিসাব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষই করবে। তাদের অভিযোগ, বহুমাত্রিক দুর্নীতির কালো ছায়া দপ্তরটির কর্মকর্তাদের একটি অংশকে গ্রাস করেছে। জবাবদিহিতা না থাকায় কতিপয় কর্মকর্তা স্বেচ্ছাচারিতার সীমা অতিক্রম করে চলেছেন।
শাহীনুরের বিরুদ্ধে খন্দকার খালেদ রিয়াজের তদন্ত প্রতিবেদন:
খন্দকার খালেদ রিয়াজ, তৎকালীন উপ-প্রকল্প পরিচালক ও তদন্তকারী কর্মকর্তা। গত ২৮-১১-২০২৪ তারিখে তার স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে দেখা যায়, দিনাজপুর উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের স্বত্বাধিকারী জান্নাতুস সাফা শাহিনুর তিনটি জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করছেন মর্মে প্রমান পান।
১. মোছাঃ শাহিনুর বেগম, জন্মতারিখ—২ মে ১৯৭৩।
২. MST JANNATUS SAFA SHAHINUR, জন্মতারিখ—১০ সেপ্টেম্বর ১৯৮২।
৩. জান্নাতুস সাফা শাহিনুর, জন্মতারিখ—১০ সেপ্টেম্বর ১৯৮২। সে সময় খন্দকার খালেদ রিয়াজের তদন্ত শেষে সঠিকতা যাচাই করে প্রতিবেদন প্রেরণসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ করা হয়।
শাহিনুরের বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থা:
ওই চিঠির আলোকে গত ২৩-০১-২০২৫ তারিখে শোয়াইব আহমেদ খান, মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব), কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর স্বাক্ষরিত প্রতিবেদনে জানা যায়, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন ASSET প্রকল্পের আওতায় এন্টারপ্রাইজ-বেইজড প্রশিক্ষণ প্রদানের লক্ষ্যে ৩০ মে ২০২৪ তারিখে দিনাজপুর উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি মোছাঃ জান্নাতুস সাফা শাহিনুর তার জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর ১৯৮২২৭২৬৪০৫০০০০০৯ এবং জন্মতারিখ ১০ সেপ্টেম্বর ১৯৮২ উল্লেখ করে প্রকল্প পরিচালকের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করেন।
চুক্তি স্বাক্ষরের পর মোছাঃ জান্নাতুস সাফা শাহিনুরের বিরুদ্ধে একাধিক জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে বিভিন্ন আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ প্রকল্প দপ্তরে প্রেরণ করা হয়। তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ তদন্তে ব্যবহৃত জাতীয় পরিচয়পত্র ও জন্মতারিখ নকল প্রমাণিত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
জান্নাতুস সাফা শাহিনুর একইভাবে নকল জাতীয় পরিচয়পত্র ও জন্ম তারিখ ব্যবহার করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে দিনাজপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের অনুমোদন এবং জয়েন্ট স্টক রেজিস্ট্রারের সত্যায়িত কপি গ্রহণ করেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
শোয়াইব আহমেদ খান স্বাক্ষরিত চিঠিতে জান্নাতুস সাফা শাহিনুরের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ করা হয়।
অন্যদিকে, ASSET প্রকল্পের পরিচালক মীর জাহিদ হাসান (অতিরিক্ত সচিব) স্বাক্ষরিত একই তারিখের, অর্থাৎ ২৩-০১-২০২৫ তারিখের অপর এক চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, মোছাঃ জান্নাতুস সাফা শাহিনুর (জাতীয় পরিচয়পত্র—১৯৮২২৭২৬৪০৫০০০০০৯, জন্মতারিখ—১০ সেপ্টেম্বর ১৯৮২) প্রকল্পের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তিনামার শর্ত অনুযায়ী ২৫ (A) অনুচ্ছেদ ভঙ্গ করায় চুক্তিটি বাতিল করা হলো।
খন্দকার খালেদ রিয়াজের বক্তব্য:
জানা যায় জান্নাতুস সাফা শাহিনুরের বিষয়ে সঠিক প্রতিবেদন দেওয়ায় কপাল পুড়েছে খন্দকার খালেদ রিয়াজের-এমন দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দপ্তরটির একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী জানিয়েছেন, রিয়াজ সাহেব একজন সৎ মানুষ। তাদের দাবি, তার সততার কারণে ASSET প্রকল্পে থাকা কিছু কর্মকর্তার নিজ সার্থ চরিতার্থ করায় বিভিন্ন সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছিল।
ASSET প্রকল্প নিয়ে খন্দকার খালেদ রিয়াজের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, তার বিরুদ্ধে গত ৩১-১২-২০২৪ তারিখে স্মারক নং-৫৭.০৩.০০০০.০০০.১৮.০২৬.২৩-৩৪২৩-এর মাধ্যমে সচিব, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ঢাকায় একটি চিঠি পাঠানো হয়।
মীর জাহিদ হাসান ও প্রকল্প প্রশাসন কর্মকর্তা সবুজ আলম স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ASSET প্রকল্পের উপ-প্রকল্প পরিচালক জনাব খন্দকার খালেদ রিয়াজের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে স্বপদে প্রত্যাহারের আবেদন করা হয়েছে।
খন্দকার খালেদ রিয়াজের বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষের ষড়যন্ত্র:
আবেদনে উল্লেখ করা হয়, জনাব খন্দকার খালেদ রিয়াজ, মূল পদে সহকারী অধ্যাপক (রাষ্ট্রবিজ্ঞান), বর্তমানে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের অধীন কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরাধীন Accelerating and Strengthening Skills for Economic Transformation (ASSET) শীর্ষক প্রকল্পে ১৪ জুন ২০২২ খ্রি. তারিখ থেকে উপ-প্রকল্প পরিচালক পদে (প্রেষণে) কর্মরত আছেন। তিনি গত ৯ ডিসেম্বর ২০২৪ খ্রি. তারিখে উপ-প্রকল্প পরিচালকের পদ থেকে অব্যাহতি চেয়ে আবেদন দাখিল করেছেন।
তিনি তার আবেদনে উল্লেখ করেন যে, যথাসময়ে তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন না করায় তাকে তিরস্কার করা হয়, যা তার আত্মসম্মানে আঘাত হেনেছে।
চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, খন্দকার খালেদ রিয়াজের বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মূলত তিনি কিছুদিন ধরে মানসিক দুশ্চিন্তায় ভুগছেন। অনতিকাল পূর্বে তার পিতা ইন্তেকাল করেছেন। এ ছাড়া তিনি থাইরয়েডের সমস্যায় ভুগছেন। পাশাপাশি কাজের চাপ বৃদ্ধি পেলে তার ব্লাড প্রেসার বৃদ্ধি পায়।
সর্বোপরি, তিনি সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার থেকে এসে কারিগরি শিক্ষা প্রকল্পে কাজ করতে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, প্রকল্পের কাজগুলো মূলত Civil Technology, Electrical Technology, Mechanical Technology এবং Computer Technology-সংক্রান্ত। প্রকল্পের ডিপিপি অনুসারে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের চিফ ইনস্ট্রাক্টররা মূলত প্রকৌশল জ্ঞানসম্পন্ন কর্মকর্তা এবং উক্ত পদের জন্য যোগ্য।
ফলে প্রকৌশল জ্ঞান না থাকায় এ পদের কাজ তার মূল পদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং প্রকল্পে কাজ করা তার জন্য দুরূহ হয়ে পড়েছে। এমতাবস্থায়, তাকে মূল পদে প্রত্যাবর্তনের লক্ষ্যে দাখিলকৃত আবেদনপত্র জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে প্রেরণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হয়।
চিঠি সম্পর্কে খন্দকার খালেদ রিয়াজের বক্তব্য:
এই ধরনের কোনো আবেদন আমি কখনো করিনি।” বিষয়টি নিয়ে আদালতে মামলা চলমান বলেও তিনি জানান।
তার দাবি, বর্তমান প্রকল্প পরিচালক মীর জাহিদ হাসানের নেতৃত্বাধীন একটি সিন্ডিকেট সরকারের নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করে আমার ও সিভিল সার্জনের অনুমতি ছাড়াই আমাকে অসুস্থ সাজিয়ে অন্যত্র বদলি করিয়েছে। এতে আমি মারাত্মকভাবে মানসিক ও সামাজিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছি বলে তিনি জানান।
এমনকি দিনাজপুর উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক জান্নাতুস সাফা শাহিনুরকে দিয়ে আমার বিরুদ্ধে মামলাও করানো হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
শাহিনুরকে ঘিরে যত অভিযোগ:
জানা যায়, শাহিনুর আওয়ামী রাজনীতির সক্রিয় সদস্য। গত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে বর্তমানে আত্মগোপনে আছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তার বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৫০০, ৪৬৫, ৪৬৬ ও ৪৭১ ধারায় মামলাও হয়েছে বলে জানা যায়। ওই মামলায় মুচলেকা দিয়ে তিনি জামিন নেন বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশ্ন, এত বিতর্ক থাকার পরও নিশ্চয়ই কোনো গোপন সমঝোতার মাধ্যমে শাহিনুরকে কর্তৃপক্ষ কাজ দিচ্ছে। জালিয়াতি ধরা পড়ার পর আবারও তাকে কেন, কোন আইনে এবং কত টাকা কমিশনের বিনিময়ে কাজ দেওয়া হলো—তা নিয়ে আছে নানা আলোচনা-সমালোচনা।
প্রতারক প্রমানের পরও শাহীনুরের একাউন্টে এসেটের টাকা:
ইতোমধ্যে ASSET প্রকল্পের আওতায় এন্টারপ্রাইজ-বেইজড প্রশিক্ষণ পরিচালনাকারী দিনাজপুর উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজকে (DWCCI) পার্টনার হিসেবে মূল্যায়ন করে ADTP-এর ১৭টি ব্যাচের ৩য় সাইকেলের ৮০ শতাংশ প্রশিক্ষণ ব্যয় নির্বাহের জন্য “কোনটাসা” হিসাব নম্বর ০২০০০১৭৯১৫৪৪৬ থেকে ৯২,৬১,৩৫০ (বিরানব্বই লাখ একষট্টি হাজার তিনশত পঞ্চাশ) টাকা স্থানান্তর করা হয়েছে।
সে হিসেবে মোট অর্থের পরিমাণ প্রায় ১.৫ কোটি টাকা। গত ৩০-০৬-২০২৬ তারিখে মীর জাহিদ হাসানের স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে ব্যবস্থাপক, অগ্রণী ব্যাংক লিমিটেড, পরিবেশ ভবন শাখা, আগারগাঁও, ঢাকা-১২০৭-এর প্রতি প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণের জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানা যায়। চিঠিটির স্মারক নং-৫৭.০৩.০০০০.০৫১.০২.২৯৯.২৬-২৪১৭। সেখানে “জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে নয়” মর্মে উল্লেখ করা হয়েছে।
শুধু এক শাহিনুরেই থেমে নেই সিন্ডিকেটটি—এমন অভিযোগও রয়েছে। বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায় এমন শাহিনুর সৃষ্টি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে চক্রটির বিরুদ্ধে।
প্রশিক্ষণ কার্যক্রম নিয়ে যত অভিযোগ:
প্রশিক্ষণ কার্যক্রম নিয়েও আছে বিস্তর অভিযোগ।
এন্টারপ্রাইজ-বেইজড ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে দেশের যুবসমাজকে দক্ষ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে গঠিত ASSET প্রকল্পে একের পর এক দুর্নীতির তথ্য পাওয়া যাচ্ছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
ট্রেনিং সেন্টারের সক্ষমতা না থাকা এবং অনুপযোগী হওয়া সত্ত্বেও টাকার বিনিময়ে অনুমতি দেওয়ার তথ্য জানিয়েছেন শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট একাধিক প্রতিষ্ঠান মালিক ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা।
তাদের দাবি, উপ-প্রকল্প পরিচালক রবীন্দ্রনাথ মাহাত তার বন্ধু রইচের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান Dhaka Centre NIC IT Ltd.-এর মাধ্যমে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করে লভ্যাংশ ভাগ-বাটোয়ারা করেন।
DWCCI-এর সভাপতি জান্নাতুস সাফা শাহিনুর এবং BWCCI-এর ম্যানেজার বিকাশ ঘটকের সহযোগিতায় হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাচারের অভিযোগও রয়েছে এই চক্রের কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে।
অভিযোগ রয়েছে, ISC, BAPA, BWCCI-সহ বিভিন্ন অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশিক্ষণার্থীদের নামে টাকা উত্তোলন করে কর্মকর্তারা ভাগ-বাটোয়ারা করছেন। সূত্রের দাবি, অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে প্রতি অকুপেশনে ৮৬,০০০ টাকা করে সিন্ডিকেটের পকেটে চলে যাচ্ছে।
EBT-এর মাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে মাহাতের বন্ধু রইচের মাধ্যমে অর্থের বিনিময়ে পছন্দের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কর্মচারী প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, শর্ট কোর্সের PMU Support Service-এর টাকা না দিয়ে সমুদয় অর্থ আত্মসাৎ করেছে এই সিন্ডিকেট।
অভিযোগ রয়েছে, মোট বিলের ওপর ১০ থেকে ২০ শতাংশ হারে অগ্রিম টাকা নিয়ে একই মালিকের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দেখিয়ে, যেমন Starlab International-কে আটটি প্যাকেজ দিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।
Advance Technology-এর মালিক আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। তার কাছ থেকে ২০ শতাংশ হারে অগ্রিম টাকা নিয়ে বিভিন্ন প্যাকেজের কাজ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
Green Dot নামীয় প্রতিষ্ঠান দরদামে পঞ্চম সর্বনিম্ন হওয়া সত্ত্বেও তার মোট বিলের ওপর ২০ শতাংশ অগ্রিম দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে Green Dot কাজ চালিয়ে যেতে অক্ষম হওয়ায় কাজটি বর্ণমালা নামক প্রতিষ্ঠান দিয়ে করানো হয় বলে জানা গেছে।
অযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও শুধুমাত্র পরিচিতির কারণে কোটি কোটি টাকার কাজ নেওয়ার নজিরও রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এর মধ্যে Smart Technology, ATI Corporation, Unique, Variety এবং মোহনা এন্টারপ্রাইজ-এর নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রয়োজনীয় ও অপ্রয়োজনীয় মালামাল ক্রয়ের নামে RFQ করে নামমাত্র মালামাল দেখিয়ে বাকি অর্থ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ভাগ-বাটোয়ারা করা হয়েছে।
এমনও অভিযোগ রয়েছে, কমপক্ষে ২০ শতাংশ হারে অগ্রিম অর্থ না পেলে টেন্ডার বাতিল করা, নতুন করে টেন্ডার ইভ্যালুয়েশন করা এবং দীর্ঘদিন তা স্থগিত রাখাসহ নানা অনিয়ম করা হয়।
আউটসোর্সিং নিয়োগের ক্ষেত্রেও পুরোনো কর্মচারীদের বাদ দিয়ে অর্থের বিনিময়ে নতুন কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া এবং তাদের কাছ থেকে গোপনে লিখিত স্ট্যাম্প নেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। তাদের দাবি, টাকার বিষয়টি যাতে তারা জন সমক্ষে প্রকাশ না করেন, সে জন্য এ ধরনের লিখিত অঙ্গীকার নেওয়া হয়।
শুধু এখানেই থেমে নেই সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য। ওয়ার্কশপ/সেমিনারের ম্যানেজমেন্ট ফি বাবদ বরাদ্দ করা ১০ হাজার টাকাও আত্মসাৎ করার অভিযোগ রয়েছে। কাজের বুয়াকে ওয়ার্কশপ/সেমিনারের সদস্য বানিয়ে তাদের সম্মানী ও খাবারের বিলের অর্থ আত্মসাতের তথ্যও দিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ:
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এই সিন্ডিকেটের মূল হোতা হলেন মীর জাহিদ হাসান, প্রকল্প পরিচালক; প্রকৌশলী রবীন্দ্রনাথ মাহাত, উপ-প্রকল্প পরিচালক; মোঃ সবুজ আলম, উপ-প্রকল্প পরিচালক; সেলিম ভূঁইয়া, হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা; মোঃ মনজুরুল ইসলাম, প্রকিউরমেন্ট, ফিন্যান্স ও প্রশাসন; এবং মোহাম্মদ নুর আলম।তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হবে। দৈনিক ভোরের সময়-এ কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের দুর্নীতি নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদনের প্রথম পর্ব প্রকাশের পর দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা প্রশংসা করছেন এবং নাম গোপন রাখার শর্তে নিত্যনতুন তথ্য সরবরাহ করছেন।
আমরাও তথ্যদাতাদের আশ্বস্ত করতে চাই, দেশের স্বার্থে আপনার নাম, ঠিকানা ও পরিচয় সর্বোচ্চ গোপনীয়তার সঙ্গে সংরক্ষণ করা করবো। চলবে------



