জাতীয় গৃহায়ণে হারিজুরের জালিয়াতি সিন্ডিকেট, দেখার কেউ নেই?

  • প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬, দুপুর ০৪:২৭
  • আপডেট: ২২ আগস্ট ২০২৬, দুপুর ০৪:২৭
WhatsApp Image 2026-08-22 at 4.20.59 PM

মোঃ আলমগীর হোসেন:

২০২৪শের বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় ফ্যাসিবাদী সরকারের হয়ে দেশে যে কজন ব্যক্তি অর্থায়ন, হামলা ও মামলায় উৎসাহ যুগিয়েছে তাদের মধ্যে অন্যতম জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের (এনএইচএ) ঢাকা সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো.হারিজুর রহমান বলে জানিয়েছে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি। প্রভাব বিস্তার, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, সরকারি জমি দখল, প্লট ও ফ্ল্যাট বরাদ্দের নিয়ন্ত্রণের অভিযোগও আছে তার বিরুদ্ধে। গত ২০২৫ সালের ১২ মে রাজধানীর মিরপুর মডেল থানায় স্বৈরাচার বিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় গণঅভ্যুত্থান দমনের ষড়যন্ত্র ও অর্থায়নের অভিযোগে মো. হারিজুর রহমানের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা থাকলেও অফিস করছেন নিয়মিত বলে অভিযোগ রয়েছে।এসব দুর্নীতি ও অপকর্মের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন সংস্থাটির ঢাকা সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. হারিজুর রহমান। বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ও চলমান সময়সহ টানা ১৯ বছরের শাসনামলে ঢাকায় কর্মরত থাকা এই কর্মকর্তাকে ঘিরে একটি ভয়াবহ শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে ওঠেছে। 

এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সরকারি জমি ব্যবস্থাপনা, উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ এবং বরাদ্দ প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করা হয়েছে। এই সিন্ডিকেটের মাঠপর্যায়ের সহযোগী হিসেবে মিরপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. কাওসার মোর্শেদ এবং উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো.সাখাওয়াত হোসেনের নামও বিভিন্ন নথিতে উঠে এসেছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হামলা ও অর্থায়ন: স্বৈরাচার বিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় গণঅভ্যুত্থান দমনের ষড়যন্ত্র ও অর্থায়নের অভিযোগে মো. হারিজুর রহমানের বিরুদ্ধে একটি ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়েছে। ২০২৫ সালের ১২ মে রাজধানীর মিরপুর মডেল থানায় মামলাটি রুজু করা হয়। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরের ওভারব্রিজের নিচে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার ওপর ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা হামলা চালায়। ওই ঘটনায় দাঙ্গা, হাঙ্গামা এবং হত্যার উদ্দেশ্যে হামলার অভিযোগ আনা হয়েছে তার বিরুদ্ধে । এই মামলায় ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনাকে ১ নম্বর আসামি করা হয়েছে। একই সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. হারিজুর রহমানকে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার অন্যতম মূল অর্থদাতা হিসেবে আসামির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। রাজধানীর পল্লবীর ঝিলপাড়ায় ৭ একর জমি দখল ও ৩৭ কোটি টাকা আত্মসাতের সুস্পষ্ট অভিযোগও আছে তার বিরুদ্ধে । হাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সমন্বিত জেলা কার্যালয়, ঢাকা-১-এ দায়ের করা এক মামলায় (মামলা নং-২৯, তারিখ: ১৮ জুলাই ২০২৫/২৮ জুলাই ২০২৫) জমি দখল ও কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলায় প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা-১৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মো. ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহর সঙ্গে যোগসাজশে জাতীয় গৃহায়ণের ঢাকা ডিভিশন-১-এর তৎকালীন কর্মকর্তারা পল্লবীর ঝিলপাড় এলাকার প্রায় ৭ একর সরকারি জমি অবৈধভাবে দখলে রাখেন। তৎকালীন উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা মো. হারিজুর রহমান ছিলেন এই দখলদারিত্বের মূল খলনায়ক। গত ২০০৮ সাল থেকে ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত ওই জমিতে ৬৫০ থেকে ৭০০টি টিনের ঘর নির্মাণ করে অবৈধভাবে ভাড়া আদায়ের মাধ্যমে প্রায় ৩৭ কোটি ৪৪ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়। পরবর্তীতে স্বৈরাচারী হাসিনা সরকারের পতনের পর ২০২৫ সালের ২১ জানুয়ারি অভিযান চালিয়ে জমিটি উদ্ধার করে কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনায় দণ্ডবিধির ৪০৯, ২১৭ ও ১০৯ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে।

গত ১৯ বছর ঢাকায় অবস্থান ও সিন্ডিকেট রাজত্ব: ফ্যাসিস্ট সরকারের মো. হারিজুর রহমান (তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, ঢাকা সার্কেল) রাজনৈতিক পরিচয়ে একজন সাবেক শিবির নেতা হলেও আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে টানা ১৯ বছরের পুরো সময়জুড়েই ঢাকায় লোভনীয় পদায়ন বাগিয়ে নিয়েছেন। জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের সরকারি জমি দখল, জালিয়াতির মাধ্যমে বিক্রি এবং টেন্ডার সিন্ডিকেটের মূল কর্ণধার হিসেবে নিজ আখের গোছাতে হাসিনা সরকার হয়ে পুরো সময় জুড়ে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করেছেন। গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও তিনি বদলি না হয়ে স্বপদে বহাল তবিয়তে আছেন এবং এখনও তাঁর নিয়ন্ত্রণে টেন্ডার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। যা নিয়ে দপ্তরটিতে আছে নানা আলোচনা, সমালোচনা। অভিযোগ রয়েছে, সেই পুরনো আওয়ামী সরকারের দোসরদের যোগসাজশে সিন্ডিকেট তৈরি করে, প্রভাব খাটিয়ে বিএনপিপন্থি কর্মকর্তাদের ঢাকায় বদলি হয়ে আসতে দিচ্ছেন না। জানা যায়, হাফিজুরের আরেক সহযোগী মো. কাওসার মোর্শেদ (নির্বাহী প্রকৌশলী, মিরপুর) সাবেক ছাত্রলীগ নেতা। তাঁর চাচা মাহফুজুর রহমান ছিলেন আওয়ামী লীগ আমলের সচিব। কাওসার মোর্শেদও কম যাননি, তিনিও আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের পুরো সময় ঢাকায় অবস্থান করেছেন দীর্ঘ ১৯ বছর যাবৎ ঢাকায় চাকরিরত আছেন। দৈনিক ভোরের সময়'র অনুসন্ধানে জানা যাচ্ছে, হারিজুর রহমানই সিন্ডিকেটের অন্যতম প্রধান সদস্য হিসেবে মাঠপর্যায়ে কাজ করেন এবং অবৈধ অর্থ সংগ্রহের মূল দায়িত্বও পালন করেন। তাঁর বিরুদ্ধে দুদকের মামলাও রয়েছে। এই সিন্ডিকেটের আরেক সহচর হলেন সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মো. সাখাওয়াত হোসেন (উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী, মিরপুর)। সাখাওয়াত হোসেনের চাচা শ্বশুর ছিলেন আওয়ামী সরকারের সাবেক হুইপ লিটন চৌধুরী। আওয়ামী লীগ আমলে তিনিও টানা ১৯ বছর যাবৎ ঢাকায় অবস্থান করছেন। কাওসার মোর্শেদের মতো তিনিও মাঠপর্যায়ে হারিজুর রহমানের হয়ে কাজ করেন এবং অর্থ সংগ্রহের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর বিরুদ্ধে দুদকে একাধিক গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।


স্বপ্ননগর সম্পদের পাহাড় :

মিরপুর-৯ নম্বর সেকশনে বাস্তবায়নাধীন স্বপ্ননগর-২য় পর্ব প্রকল্পের ১৫টি ১৪ তলা ভবনে ১,৫৬০টি ফ্ল্যাট নির্মাণকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে বড় জালিয়াতির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পে অকেজো ও অব্যবহৃত মালামালের প্রকৃত বাজারমূল্য প্রায় ৭৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা হলেও টেন্ডার প্রক্রিয়ার আগেই গোপনে তা বিক্রি করে দেওয়া হয়। পরে বিষয়টি ঢাকতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে মাত্র ৭ লাখ ৪৪ হাজার টাকা মূল্য দেখিয়ে ভুয়া নথিপত্র অনুমোদন করানো হয়। এই ঘটনায় অভিযুক্ত উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন ও তাঁর পরিবারের নামে ঢাকায় বসিলা ও ধানমন্ডিতে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ও বাড়ি, উত্তরায় একাধিক ফ্ল্যাট, পাবনা সদরে বহুতল ভবন, গাজীপুরে কারখানা এবং বিভিন্ন ব্যাংকে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থের তথ্য পাওয়া গেছে।


দোলনচাঁপা ও কনকচাঁপা দুর্নীতি: 

রাজধানীর মোহাম্মদ পুরে নির্মিতব্য দোলনচাঁপা ও কনকচাঁপা প্রকল্পে মো. হারিজুর রহমান প্রকল্প পরিচালক (পিডি) এবং তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মূল বরাদ্দ পরিকল্পনা পরিবর্তন করে প্রকল্পের বাজেট ৪৬৯ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫৪১ কোটি ১১ লাখ টাকায় উন্নীত করা হয়। ১৯৬০ সাল থেকে বসবাসকারী মূল ক্ষতিগ্রস্ত কলোনির বাসিন্দাদের জন্য সংরক্ষিত ২৫৩টি ফ্ল্যাট কমিয়ে ১১৮টিতে নামিয়ে আনা হয়। বাকি ১৬৬টি ফ্ল্যাট লটারি ও নীতিমালা লঙ্ঘন করে সাবেক আওয়ামী সরকারের ঘনিষ্ঠ আমলা, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর পিএস, ছাত্রলীগ ও যুবলীগ নেতাদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করে দেওয়া হয়।


সেবার নামে গ্রাহকদের জিম্মি :

দীর্ঘ দিন যাবৎ অভিযোগ আছে জাতীয় গৃহায়ণের ঢাকা সার্কেলে সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের দালাল ও সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে থাকতে হয়। ঘুষ ছাড়া ফাইল নড়ে না। কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী প্রতিবাদ করলে তাঁকে তাৎক্ষণিক বদলি বা বরখাস্তের হুমকি দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে মো. হারিজুর রহমান, মো. কাওসার মোর্শেদ ও মো. সাখাওয়াত হোসেন সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ও অপরাধ সংক্রান্ত বিষয়গুলো বর্তমানে দুদক, থানা-পুলিশ ও মন্ত্রণালয়ের তদন্তাধীন থাকলেও বহাল তবিয়তে দাপটের সাথে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করে যাচ্ছেন এই কর্মকর্তারা। এ সকল বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সিভিল) মো. হারিজুর রহমানের ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করে পাওয়া যায়নি।

Ad