খেলা-ই পড়া: আনিস মুহম্মদের ‘আম্মাম মডেল’-এ ভাষা শিক্ষায় নতুন সম্ভাবনা
এনামুল হক আরিফ ,জেলা প্রতিনিধি ব্রাহ্মণবাড়িয়া
প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার একঘেয়েমি ও মুখস্থনির্ভরতার বাইরে গিয়ে খেলাধুলার মাধ্যমে ভাষা শেখার এক অভিনব পদ্ধতি “আম্মাম মডেল” নতুন করে আলোচনায় এসেছে। শিক্ষাবিদ আনিস মুহম্মদের উদ্ভাবিত এই পদ্ধতির মূল দর্শন “খেলা-ই পড়া”—যেখানে শেখা আর খেলা একাকার হয়ে যায়।
সম্প্রতি আয়োজিত এক কর্মশালায় এই মডেলের বাস্তব প্রয়োগ দেখা গেছে, যেখানে অংশগ্রহণকারীরা খেলতে খেলতেই ভাষা শেখার সুযোগ পান। শিশু, কিশোর ও তরুণদের অংশগ্রহণে আয়োজিত এই কর্মশালায় ছিল বিভিন্ন ধরনের ভাষাভিত্তিক খেলা, দলীয় কার্যক্রম, গল্প বলা, অভিনয় এবং পরিস্থিতিভিত্তিক সংলাপচর্চা।
আয়োজকদের দাবি, এই পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীরা কোনো চাপ ছাড়াই স্বতঃস্ফূর্তভাবে নতুন শব্দ, বাক্যগঠন এবং ভাষার ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জন করতে সক্ষম হয়। ফলে শেখার প্রতি ভয় বা অনাগ্রহ কমে গিয়ে তৈরি হয় আগ্রহ ও আনন্দ।
কর্মশালায় অংশ নেওয়া এক শিক্ষার্থী বলেন, “আমরা বুঝতেই পারিনি কখন শিখে ফেলেছি। খেলতে খেলতেই নতুন অনেক শব্দ ও বাক্য ব্যবহার করতে পেরেছি। এটা আমাদের জন্য একদম নতুন অভিজ্ঞতা।”
আরেকজন অংশগ্রহণকারী জানান, “এখানে এসে সবচেয়ে ভালো লেগেছে যে মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে হয়নি। আমরা বন্ধুদের সঙ্গে মিশেছি, কথা বলেছি, খেলেছি—এতে অনেক ভালো লেগেছে।”
বর্তমান সময়ে মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন গেমে অতিরিক্ত নির্ভরতা শিশু-কিশোরদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকেই এই প্রবণতাকে “ডিজিটাল কোকেন” হিসেবে উল্লেখ করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে ডুবে থাকার ফলে শিশুদের মনোযোগ কমে যাচ্ছে, সামাজিক যোগাযোগ দক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং মানসিক চাপ বাড়ছে।
এই প্রেক্ষাপটে “আম্মাম মডেল”-এর কর্মশালাটি অংশগ্রহণকারীদের জন্য এক ভিন্নধর্মী অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে। মোবাইল স্ক্রিন থেকে দূরে থেকে বাস্তবমুখী কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়ে তারা মানসিক প্রশান্তি অনুভব করেছে বলে জানিয়েছেন অনেকে।
শিক্ষাবিদ আনিস মুহম্মদ বলেন, “শেখাকে আনন্দময় না করলে তা টেকসই হয় না। আমাদের লক্ষ্য হলো এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে শিশুরা খেলতে খেলতেই শিখবে এবং শেখাকে ভালোবাসবে।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা লক্ষ্য করেছি, শিশুরা যখন খেলার মধ্যে থাকে, তখন তারা স্বাভাবিকভাবেই বেশি মনোযোগী ও সৃজনশীল হয়। এই সুযোগটাকেই আমরা শিক্ষার জন্য কাজে লাগাতে চাই।”
শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, এই ধরনের অংশগ্রহণমূলক ও আনন্দভিত্তিক শিক্ষাপদ্ধতি শিশুদের সামগ্রিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এতে তাদের ভাষাগত দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আত্মবিশ্বাস, সৃজনশীলতা এবং দলগত কাজের দক্ষতাও বাড়ে।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, খেলাধুলার মাধ্যমে শেখা শিশুদের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশে সহায়ক এবং এটি দীর্ঘমেয়াদে শেখার আগ্রহ ধরে রাখতে সাহায্য করে। “আম্মাম মডেল” সেই তত্ত্বের একটি বাস্তব ও আধুনিক প্রয়োগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অভিভাবকদের মধ্যেও এই পদ্ধতি নিয়ে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। তারা মনে করছেন, এমন উদ্যোগ বিস্তৃত হলে শিশুদের পড়াশোনার প্রতি ভীতি কমবে এবং তারা আনন্দের সঙ্গে শেখার সুযোগ পাবে।
সবমিলিয়ে, “খেলা-ই পড়া” ধারণার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা “আম্মাম মডেল” দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় একটি সম্ভাবনাময় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা ও বিস্তারের মাধ্যমে এটি ভবিষ্যতে শিক্ষাক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে।



