রামিসার নীরব আর্তনাদ ও ন্যায়বিচারের প্রতিধ্বনি

  • প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬, বিকাল ০৬:১৮
  • আপডেট: ০৭ জুন ২০২৬, বিকাল ০৬:১৮
WhatsApp Image 2026-06-07 at 5.48.05 PM

মোঃ নজরুল ইসলাম:

কিছু মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের নয়, একটি জাতির হৃদয়ে ক্ষত তৈরি করে। কিছু কান্না শুধু একটি ঘরের দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হয় না, তা ছড়িয়ে পড়ে সমাজের বিবেকের গভীরে। ছোট্ট রামিসার নির্মম মৃত্যু ছিল তেমনই একটি ঘটনা।একটি নিষ্পাপ শিশুর হাসি থেমে গেলে পৃথিবী কিছুটা অন্ধকার হয়ে যায়। একটি শিশুর স্বপ্ন ভেঙে গেলে মানবতার আয়নায় একটি ফাটল দেখা দেয়। রামিসার মৃত্যু আমাদের সেই ফাটল দেখিয়েছে, আমাদের বিবেককে প্রশ্ন করেছে, আমরা কেমন সমাজ গড়ে তুলছি।রামিসার মরদেহ উদ্ধারের মাত্র বিশ দিনের মাথায় আদালতের রায় এসেছে। বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। যে দেশে বছরের পর বছর ধরে অনেক মামলা বিচার অপেক্ষায় থাকে, সেখানে এমন দ্রুত বিচার সাধারণ মানুষের মনে আইনের প্রতি নতুন আস্থা সৃষ্টি করেছে।অনেকের ধারণা ছিল, নারী হওয়ার কারণে স্বপ্না হয়তো কোনো না কোনোভাবে শাস্তি থেকে রেহাই পেতে পারেন। কিন্তু আদালত দেখিয়ে দিয়েছেন, ন্যায়বিচারের চোখে নারী পুরুষের আলাদা কোনো পরিচয় নেই। অপরাধের পরিচয়ই সেখানে একমাত্র পরিচয়। প্রমাণের ভিত্তিতে স্বামী ও স্ত্রী উভয়ের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় সেই বার্তাই দিয়েছে।এই রায়ের আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো অর্থদণ্ড এবং সম্পত্তি বিক্রির মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ। কোনো অর্থই একটি সন্তানের জীবন ফিরিয়ে দিতে পারে না। কোনো সম্পদই মায়ের বুকের শূন্যতা পূরণ করতে পারে না। তবুও এই নির্দেশ সমাজকে স্মরণ করিয়ে দেয়, অপরাধ শুধু প্রাণ কেড়ে নেয় না, একটি পরিবারকে আজীবনের বেদনার মধ্যে নিক্ষেপ করে।আজ প্রশ্ন উঠছে, এই রায় কি শুধু দুই ব্যক্তির শাস্তি, নাকি এটি একটি সামাজিক বার্তা। আমার বিশ্বাস, এটি একটি বার্তা। এমন একটি বার্তা, যা বলে দেয় শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র নীরব দর্শক হয়ে থাকবে না।তবে শাস্তিই শেষ কথা নয়। বিচার অপরাধের প্রতিকার দিতে পারে, কিন্তু অপরাধ প্রতিরোধ করতে পারে না একা। পরিবারকে সচেতন হতে হবে, সমাজকে দায়িত্ব নিতে হবে, শিক্ষাকে মানবিক হতে হবে। আইনকে যেমন কঠোর হতে হবে, তেমনি বিবেককেও জাগ্রত হতে হবে।রামিসা আর কখনো ফিরে আসবে না। তার ছোট্ট পায়ের শব্দ আর কোনো উঠানে শোনা যাবে না। তার হাসি আর কোনো বিকেলকে আলোকিত করবে না। কিন্তু তার নাম হয়তো ইতিহাসে থেকে যাবে এমন এক ঘটনার সাক্ষী হয়ে, যেখানে একটি শিশুর নীরব আর্তনাদ বিচারালয়ের দেয়াল ভেদ করে ন্যায়বিচারের ভাষা হয়ে উঠেছিল।একটি সভ্য সমাজের শক্তি তার উঁচু অট্টালিকায় নয়, তার শিশুদের নিরাপত্তায়। একটি রাষ্ট্রের মর্যাদা তার অর্থনীতিতে নয়, তার ন্যায়বিচারে। রামিসার রায় সেই সত্যকেই আবার স্মরণ করিয়ে দিল।আজ যখন আমরা এই রায়ের দিকে তাকাই, তখন শুধু একটি মামলার সমাপ্তি দেখি না। আমরা দেখি একটি মায়ের অশ্রু, একটি শিশুর হারিয়ে যাওয়া ভবিষ্যৎ, এবং দেখি ন্যায়বিচারের সেই দীপশিখা, যা অন্ধকারের বিরুদ্ধে মানুষের শেষ আশ্রয় হয়ে জ্বলতে থাকে।

Ad