জাতীয় গৃহায়ণ অধিদপ্তরের শাহীনের বিরুদ্ধে অভিযোগের অন্ত নেই
জাতীয় গৃহায়ণ অধিদপ্তরে দুর্নীতি পর্ব-২
মোঃ আলমগীর হোসেন: অভিযোগের অন্ত নেই মোস্তফা কামাল শাহীনের বিরুদ্ধে। দুর্নীতি দমন কমিশনের এজাহারভুক্ত একজন আসামী হওয়া সত্ত্বেও রয়েছেন ধরা ছোয়ার বাইরে । যেন দেখার কেউ নেই। অভিযোগ আছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে একাধিক ছাত্রজনতা হত্যা মামলার আসামী ও অর্থ সরবরাহকারী। গত আওয়ামীলিগ সরকারের আমলে নানা অনিয়মের কারণে চাকরিচ্যুত হন।এখন মোটা অংকের অর্থ দিয়ে চেষ্টা করছেন নিজের হারিয়ে যাওয়া পদ পদবি ফিরে পেতে। ইতিমধ্যে নাকি প্রমোশনসহ চাকরি ফিরেও পেয়েছেন। চালাচ্ছেন অর্থ কামানোর শক্তিশালী সিন্ডিকেট। বর্তমানে শাহীনের সকল কাজ চালিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব পালন করছেন বহিরাগত (যাদের সরকারি নথিতে হাত দেওয়া নিষেধ) শওকত ও রবিউল। শাহীন জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের একজন তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারী। গত আওয়ামী সরকারের আমলে দোর্দন্ডপ্রতাপশালী হওয়া সত্তেও নানাবিধ দুর্নীতির অভিযোগে তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। সে সময় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিলো-প্লট জালিয়াতি, ফ্ল্যাট জালিয়াতি, প্রতিবেদন জালিয়াতি, টেন্ডারবাজি, সেবা প্রত্যাশিদের জিম্মি করে অর্থ আদায়সহ নানাবিধ অপরাধ। জ্ঞ্যত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের দায়ে মোস্তফা কামাল শাহিন ও তার স্ত্রী নাছরিন সুলতানার বিরুদ্ধে এজাহার দাখিল হয় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)'এ। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারী মাসের ১৬ তারিখে দুদকের দাখিল করা এজাহারে দেখা যায়, মির্জা জাহিদুল আলম, উপ-পরিচালক (বি/অনু:ও তদন্ত-২) স্বাক্ষরিত চিঠিতে উল্লেখ আছে, মিসেস নাছরিন সুলতানা, স্বামী-মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল (অফিস সহকারী, ভূমি ও সম্পত্তি ব্যাবস্থাপনা উইং, জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ, ঢাকা), ঠিকানা: হাউজিং ষ্টাফ কোয়ার্টার, গ/৯, রোড-১,ব্লক-সি, মিরপুর-২, ও স্থায়ী ঠিকানা: দুখু মিয়ার বাড়ি, গ্রাম: এগারগ্রাম, ডাকঘর-এগারগ্রাম-৩৫৬০, বরুড়া, কুমিল্লা। সুত্রোক্ত নথির অভিযোগের আলোকে দাখিলকৃত অনুসন্ধান পর্যালোচনা করে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ এর ২৭(১) ধারায় এজাহার দায়েরের জন্য নির্দেশক্রমে অনুমতি প্রদান করা হলো। যার স্বারক নং-০০.০১.০০০০.৫০২.০৩.০০৩.০০৫.২০-৭৩০৮/১(৯)।
ঠিক একই বছর অর্থাৎ ২০২২ সালের মার্চ মাসের ৮ তারিখে শাহীনের স্ত্রী নাছরিন সুলতানা এর বিরুদ্ধে উপ-পরিচালক, মোশাররফ হোসেন মৃধা নিজে বাদি হয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন, সমন্বিত জেলা কার্যালয়, ঢাকা-১ এ আরেকটি এজাহার দায়ের করেন। ওই চিঠিতে উল্লেখ আছে, মিসেস নাছরিন সুলতানা (৩৮), স্বামী- মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল (অফিস সহকারী, ভূমি ও সম্পত্তি ব্যাবস্থাপনা উইং, জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ, সেগুনবাগিচা-ঢাকা), এর বিরুদ্ধে ২৩,৭৫০০০/জ্ঞ্যাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করে তা নিজ দখলে রাখার অপরাধে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন,২০০৪ এর ২৭ (১) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন। ওই এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়, দুর্নীতি দমন কমিশন, প্রধান কার্যালয়, ঢাকার স্বারক নং-০০.০১.০০০০.৫০২.০২.০৭৯.১৯.-৪৫৯৯০ তারিখ ২৬-১২-২০১৯ খ্রি:মুলে অভিযোগ সংশ্লিষ্ট মিসেস নাসরিন সুলতানা এর প্রতি সম্পদ বিবরণী দাখিলের জন্য নোটিশ জারি করা হয়। তৎপ্রেক্ষিতে তিনি গত ১৫-০১-২০২০ খ্রি: তারিখে পরিচালক(বি:/অনু ও তদন্ত-২) দুর্নীতি দমন কমিশন, প্রধান কার্যালয়, ঢাকা বরাবর সম্পদ বিবরণী দাখিল করেন। দাখিলকৃত সম্পদ বিবরণীতে অভিযোগ সংশ্লিষ্ট মিসেস নাসরিন সুলতানা মোট ৪০,২৫০০০/ টাকার সম্পদের তথ্য উল্লেখ করেছেন। যাচাই/ অনুসন্ধানকালে তার নামে মোট ৪০,২৫০০০/ টাকার সম্পদ অর্জনের তথ্য পাওয়া যায়। মিসেস নাসরিন সুলতানার আয়কর নথি অনুযায়ী ২০১৭-২০১৮ করবর্ষ হতে ২০১৯-২০২০ করবর্ষ পর্যন্ত ব্যাবসার আয়, ব্যাবসার মূলধন, বিবাহের সময় প্রাপ্ত উপহার ইত্যাদি উৎস হতে মোট আয় ৫৪,০০,০০০/ টাকা প্রদর্শন করেছেন। উক্ত আয়ের মধ্যে মিসেস নাসরিন সুলতানা কর্তৃক ব্যবসার মূলধন প্রদর্শিত ২০,০০,০০০/ টাকার উৎস সম্পর্কে কোন গ্রহণযোগ্য তথ্য বা সাক্ষ্য প্রমানাদি পসওয়া যাইনি বিধায় উক্ত আয় ২০,০০,০০০/ গ্রহণযোগ্য নয় মর্মে প্রতীয়মান হয়।এছাড়া যাচাই/অনুসন্ধানকালে তার কমিশন এজেন্ট বা অন্য কোন ব্যবসার কাগজপত্র পাওয়া যায় নাই, বিধায় ব্যবসার আয় হিসাবে প্রদর্শিত ১৫,০০,০০০/ টাকা তার গ্রহণযোগ্য আয় নয় মর্মে প্রতীয়মান হয়। সুতরাং তার অগ্রহণযোগ্য আয় পাওয়া যায়। (ব্যাবসার মূলধন ২০,০০,০০০+ব্যাবসার আয় ১৫,০০,০০০)=৩৫,০০,০০০/টাকা। যাচাই/ অনুসন্ধানকালে
কাগজ/রেকর্ডপত্র পর্যালোচনায় তার গ্রহণযোগ্য আয় পাওয়া যায় (৫৪,০০,০০০-৩৫,০০,০০০)=১৯,০০,০০০/টাকা। তার আয়কর নথি অনুযায়ী পারিবারিক ও অন্যান্য খরচবাবদ মোট ব্যয় পাওয়া যায় ২,২৫০,০০০/টাকা। প্রাপ্ত রেকর্ডপত্র অনুযায়ী মিসেস নাছরিন সুলতানা কর্তৃক পারিবারিক খরচসহ সম্পদ অর্জনে ব্যয়িত অর্থেট পরিমাণ (৪০,২৫,০০০+২,৫০,০০০)=৪২,৭৫,০০০/ টাকা। এক্ষেত্রে তার জ্ঞ্যত আয় বহির্ভূত সম্পদ পাওয়া যায় (৪২,৭৫,০০০-১৯,০০,০০০)=২৩,৭৫,০০০/টাকা। অর্থাৎ অভিযোগ সংশ্লিষ্ট মিসেস নাছরিন সুলতানা ২৩,৭৫,০০০/টাকার জ্ঞ্যত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করে তা নিজ দখলে রাখার অপরাধে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ এর ২৭ (১) ধারায় শান্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন।
এমতাবস্থায়, নাছরিন সুলতানার বিরুদ্ধে ২৩,৭৫,০০০/ টাকা জ্ঞ্যত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের প্রমাণ পায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
অথচ সেই প্রমানিত দুর্নীতিবাজ শাহীনকেই আবারও কর্তৃপক্ষ প্রমোশন দিয়ে সপদে বহাল রেখে উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলীর কার্যালয়, কুষ্টিয়া উপ-বিভাগে সংযুক্ত করেছে। যার স্বারক নং-২৫.৩৮.০০০০.৩০২.১৯.০১৭.২৫-৬১৭/১/(১১)। গত ১৯/০৮/২০২৬ (মোঃ মুশফিকুল ইসলাম) উপ-পরিচালক (প্রশাসন ও প্রশিক্ষণ) চিঠিতে দেখা যায়, দাপ্তরিক কার্যাদি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা এবং প্রশাসনিক সুবিধার্থে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত পদায়ন করা হলো। যা নিয়ে দপ্তরটিতে চলছে নানা আলোচনা ও সমালোচনা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সাথে কথা বলে জানা গেছে, এই পদ ফিরে পেতে শাহীনুর কোটি কোটি টাকা খরচ করেছেন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করলেও থোড়াই কেয়ার করছে দপ্তরটির কিছু অসাধু কর্মকর্তা। তারিধারাবাহিকতায়
একের পর এক দুর্নীতি-জালিয়াতির ঘটনা ফাঁস হবার পরও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয় না। উল্টো আরও পদন্নোতি প্রদান করা হয়। এমনকি মানা হয়না মন্ত্রণালয় থেকে লিখিত নির্দেশনাও। নানা কৌশলে সেটি ধামাচাপার চেষ্টা চলে। সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটির ভূমি শাখায় কর্মরত অফিস সহকারী মোস্তফা কামাল শাহিনের দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত গোপন করে সেটাকে আড়াল করার অপচেষ্টা চলমান রয়েছে।
প্রসঙ্গত, একের পর এক দুর্নীতি আর জালিয়াতির মাধ্যমে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন অফিস সহকারী মোস্তফা কামাল শাহিন দম্পতি। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্তে অনেক তথ্যের খোঁজও মিলেছে। দীর্ঘ তদন্ত শেষে শাহিন ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে মামলা করেছিল দুদক। অথচ তিন বছরেও সে মামলা আলোর মুখ দেখেনি। দেয়া হয়নি অভিযোগপত্র। প্লট জালিয়াতি কিংবা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার জাল স্বাক্ষরসহ বহু অপকর্মে হাতেনাতে ধরা পড়ার পরও বহাল তবিয়তে রয়েছেন শাহীন। তবে ক্ষমতার দাপটে বারবার তিনি ধরাছোয়ার বাইরে থেকেছেন। অভিযোগ আছে, মোস্তফা কামাল শাহিন ছিলেন পতিত ফ্যাসিস্ট সরকারের অন্যতম সুবিধাভোগী। সে নিজেকে বড় আওয়ামী লীগার পরিচয় দিয়েই ১৬ বছর ক্ষমতার ছড়ি ঘুরিয়েছেন। স্বঘোষিত সিবিএ নেতা বনে দেখিয়েছেন ক্ষমতার দাপটে। ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন হলেও তার ক্ষমতায় তেমন হেরফের হয়নি। বরং কালো টাকার জোরে ঊর্ধ্বতনদের বশ করে বহাল তবিয়তে আছেন অদ্যাবধী।
এর আগেও মন্ত্রণালয়ে তার বিরুদ্ধে একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। এ প্রেক্ষিতে মন্ত্রণালয় থেকে তার দুর্নীতি অনুসন্ধানের নির্দেশনা পেয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ (জাগৃক)। মজার বিষয় হচ্ছে, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার দুই মাসের বেশি সময় পর গত ২৮ জানুয়ারি তিন সদস্যের কমিটি করে অফিস আদেশ জারি করা হয়। কমিটির আহ্বায়ক করা হয় পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) মো. আহসান হাবিবকে। সদস্য দু’জন হলেন যথাক্রমে উপ-পরিচালক (ভূমি ও সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা-২) তায়েব-উর রহমান আশিক এবং সহকারী পরিচালক (অর্থ) মো. আরিফুজ্জামান।
উপ-পরিচালক (প্রশাসন ও প্রশিক্ষণ) মো. মুশফিকুল ইসলাম স্বাক্ষরিত তদন্ত কমিটি গঠন সংক্রান্ত চিঠিতে গত বছরের ১৭ নভেম্বর গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের এ সংক্রান্ত চিঠির উদ্ধৃতি দেয়া হয়। যার স্মারক নম্বর-২৫.০০.০০০০.০৫৩.০১.০০২.২৩.১৯০। চিঠিতে সূত্র হিসেবে এ স্মারক নম্বর উল্লেখ করে বলা হয়েছে, “জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের প্রধান কার্যালয় ভূমি শাখায় কর্মরত অফিস সহকারী মোস্তফা কামাল শাহীন ও তার স্ত্রী মিসেস নাছরিন সুলতানাসহ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ঘুষ, দুর্নীতি, ফাইল গায়েব করা, ফাইল আটকে রেখে হয়রানি, ডিজিটাল নম্বরবিহীন জাল কাগজ সৃজন করে লীজ দলিল রেজিস্ট্রিকরণ, নথি অফিসে সৃজন করাসহ শতকোটি টাকার অবৈধ সম্পদের অভিযোগ” এসকল বিষয়ে তদন্তের জন্য নির্দেশক্রমে তদন্ত কমিটি গঠন করা হলো। আগামী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন দাখিল করতে চিঠিতে অনুরোধ জানানো হয়েছে। তবে পিলে চমকানো তথ্য হচ্ছে, নির্ধারিত ১৫ কার্যদিবস অতিবাহিত হলেও সেই তদন্ত কমিটি কোনো প্রতিবেদন দাখিল করেনি। বরং আঁতুরঘরে সেটিকে সমাহিত করার তোড়জোড় চলছে বলে জানা যাচ্ছে। এসকল বিষয় জানতে শাহীনকে একাধিকবার মুঠোফোনে কল করে পাওয়া যায়নি। চলবে----



