আজ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ,ত্যাগ, সংগ্রাম, গৌরব ও ঐতিহ্যের ৪৮ বছর।

  • প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, দুপুর ১২:৩৬
  • আপডেট: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, দুপুর ১২:৩৬
BNP

১ সেপ্টেম্বর। বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল বিএনপির প্রতিষ্ঠার ৪৮ বছর পূর্ণ হলো। দীর্ঘ এই পথচলায় দলটি অতিক্রম করেছে নানা রাজনৈতিক সংকট, আন্দোলন-সংগ্রাম, প্রতিকূলতা, ত্যাগ ও অর্জনের অধ্যায়। বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসের সঙ্গে বিএনপির ৪৮ বছরের পথচলা গভীরভাবে সম্পৃক্ত।

ত্যাগ, সংগ্রাম, প্রতিকূলতা, গণতন্ত্রের জন্য লড়াই এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় নিয়ে দীর্ঘ ৪৮ বছর অতিক্রম করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তমের হাতে প্রতিষ্ঠিত এই রাজনৈতিক দল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা করে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ছিলেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান।

তাঁর নেতৃত্বে বিএনপি প্রতিষ্ঠার অন্যতম লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে সুদৃঢ় করা, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদকে ধারণ করা এবং বহুদলীয় গণতান্ত্রিক রাজনীতির বিকাশ ঘটানো। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই নানা রাজনৈতিক সংকট ও পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বিএনপি দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

শহীদ জিয়াউর রহমান, একটি রাজনৈতিক দর্শনের নাম

বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তম বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক, মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান সামরিক নেতা, জেড ফোর্সের অধিনায়ক এবং সাবেক সেনাপ্রধান। স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠনের ইতিহাসের সঙ্গে তাঁর নাম গভীরভাবে সম্পৃক্ত।

১৯৭৮ সালে তাঁর উদ্যোগে বিএনপির যাত্রা শুরু হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই দলটি দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে সাংগঠনিক বিস্তার লাভ করে। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদকে রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তি করে বিএনপি দেশের রাজনীতিতে একটি স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করে।

১৯৮১ সালে শহীদ জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর বিএনপির সামনে নেমে আসে কঠিন এক সময়। সেই সংকটময় মুহূর্তে দলের নেতৃত্বের দায়িত্ব গ্রহণ করেন তাঁর সহধর্মিণী বেগম খালেদা জিয়া।

দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আপসহীন নেতৃত্বের প্রতীক

শহীদ জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর বেগম খালেদা জিয়া বিএনপির নেতৃত্বে আসেন এবং ধীরে ধীরে নিজেকে বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।

এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তাঁর দৃঢ় ও আপসহীন নেতৃত্ব তাঁকে ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিতি এনে দেয়। গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তাঁর নেতৃত্বে বিএনপি দীর্ঘদিন রাজপথে সংগ্রাম করেছে। ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে তিনি কারাবরণসহ নানা রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছেন।

১৯৯০ সালের গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে স্বৈরশাসনের অবসান এবং গণতান্ত্রিক ধারায় দেশে নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা হয়। সেই আন্দোলনে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে।

১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হলে বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর নেতৃত্বে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীকালে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালেও তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

তাঁর সরকারের সময় শিক্ষা, নারীশিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতির ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।

২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর বেগম খালেদা জিয়া রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। তাঁর মৃত্যু বিএনপির জন্য যেমন গভীর শোকের, তেমনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি।

তাঁর জানাজায় বিপুলসংখ্যক মানুষের উপস্থিতি ঘটে। রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউসহ আশপাশের এলাকা জনসমুদ্রে পরিণত হয়। লাখো মানুষের উপস্থিতি তাঁর প্রতি সাধারণ মানুষের গভীর আবেগ ও শ্রদ্ধার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে প্রতিভাত হয়।


জনাব তারেক রহমান নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব। 

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহন করে দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন জনাব তারেক রহমান।

তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠনকে শক্তিশালী করা, নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং দলকে সাংগঠনিকভাবে পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকার কথা বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাসে উল্লেখ করা হয়।

দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম ও প্রবাসজীবনের পর তাঁর দেশে প্রত্যাবর্তন বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনার সৃষ্টি করে। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তারেক রহমান দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বর্তমানে তিনি বিএনপির চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর বাণীতে তিনি দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মী, শুভানুধ্যায়ী ও দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। তাঁর নেতৃত্বে নতুন প্রজন্মের বিএনপি কীভাবে সংগঠনকে এগিয়ে নেয়, সেটিই এখন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

৪৮ বছরের পথচলা, একটি রাজনৈতিক ইতিহাস

বিএনপির ৪৮ বছরের ইতিহাস কেবল একটি রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে বহু আন্দোলন, সংগ্রাম, সংকট, সাফল্য ও পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত একটি দীর্ঘ পথচলা।

এই দীর্ঘ সময়ে দলের অসংখ্য নেতাকর্মী রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছেন। অনেকে কারাবরণ করেছেন, অনেকে নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। তাঁদের ত্যাগ, শ্রম, সাহস ও সাংগঠনিক অবদান বিএনপির ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

রাজনীতির ময়দানে সময় পরিবর্তিত হয়েছে, নেতৃত্বের প্রজন্ম পরিবর্তিত হয়েছে। কিন্তু বিএনপির নেতাকর্মীদের কাছে দলটির মূল আদর্শ বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি অঙ্গীকার এবং গণতান্ত্রিক রাজনীতির চর্চা আজও গুরুত্বপূর্ণ।

শোকের মধ্যেও প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী

এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী বিএনপির জন্য বিশেষভাবে আবেগঘন। কারণ দলটি প্রথমবারের মতো তার দীর্ঘদিনের চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে ছাড়া প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করছে।

১ সেপ্টেম্বর সকাল ৬টায় নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সারাদেশে দলীয় কার্যালয়ে দলীয় পতাকা উত্তোলনের কর্মসূচি রয়েছে। সকাল ৯টায় বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ দলের নেতাকর্মীরা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও প্রয়াত চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন ও দোয়া করবেন।

এছাড়া ৫ সেপ্টেম্বর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ মিলনায়তনে বিএনপি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ও তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা সভার কর্মসূচি রয়েছে। পাশাপাশি বৃক্ষরোপণ ও মৎস্য অবমুক্তকরণ কর্মসূচিও রয়েছে।

ত্যাগীদের স্মরণ, ভবিষ্যতের প্রত্যয়

বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী শুধু আনন্দের দিন নয়; এটি আত্মসমালোচনা, আত্মপর্যালোচনা এবং ভবিষ্যৎ পথচলারও দিন।

যাঁদের ত্যাগ, শ্রম, সাহস ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বিএনপি আজ ৪৮ বছরে পদার্পণ করেছে, তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো আমাদের দায়িত্ব। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের নেতাকর্মীদের দায়িত্ব হলো ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে সংগঠনকে আরও শক্তিশালী, সুশৃঙ্খল, জনসম্পৃক্ত ও দায়িত্বশীল করে গড়ে তোলা।

রাজনীতির প্রকৃত শক্তি মানুষের ভালোবাসা ও আস্থা। তাই মানুষের আস্থা অর্জন, জনগণের পাশে থাকা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে ধারণ করা এবং দেশ ও মানুষের কল্যাণে কাজ করাই হতে পারে আগামী দিনের সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার।

৪৮ বছরের পথচলায় বিএনপি দেখেছে উত্থান-পতন, বিজয়-পরাজয়, আনন্দ-বেদনা এবং অসংখ্য প্রতিকূলতা। তবুও দলটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় শক্তি তার ত্যাগী নেতাকর্মী ও সমর্থকদের দীর্ঘ সংগ্রাম।

আজকের এই দিনে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তমকে। গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি প্রয়াত চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে। শ্রদ্ধা জানাই বিএনপির সকল প্রয়াত নেতা-কর্মী এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনে আত্মত্যাগকারীদের।

ত্যাগের ইতিহাস হোক শক্তির উৎস,

সংগ্রামের ইতিহাস হোক পথচলার প্রেরণা,

গৌরবের ইতিহাস হোক ভবিষ্যৎ নির্মাণের ভিত্তি।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী হোক নতুন প্রত্যয়, নতুন শপথ ও নতুন সম্ভাবনার সূচনা। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই মাহেন্দ্রক্ষণে বিএনপির সকল নেতাকর্মী, সমর্থক, শুভানুধ্যায়ী এবং দেশবাসীর প্রতি রইল আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।

বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি জিন্দাবাদ।




লেখক পরিচিতি-

মোঃ আকতার হোসেন ফরাজী

বিএসএস (অনার্স), রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ।

এমএসএস (মাস্টার্স), রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ। 

সভাপতি, তেজগাঁও থানা ছাত্রদল।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক,বিএনপি-সমর্থিত।

Ad