চার ইঞ্চির পর্দায় বন্দি এক প্রজন্ম
লেখক ঃ মোঃ নজরুল ইসলাম, সাংবাদিক ও কলামিষ্ট:
একটি জাতিকে ধ্বংস করতে সব সময় কামান, ট্যাংক কিংবা যুদ্ধবিমান লাগে না। কখনো কখনো একটি ছোট্ট মোবাইল ফোনই যথেষ্ট। যে অস্ত্র শব্দ করে না, রক্ত ঝরায় না, কিন্তু ধীরে ধীরে একটি জাতির মনোযোগ, চিন্তাশক্তি, মানবিকতা, পারিবারিক বন্ধন এবং ভবিষ্যৎকে নিঃশেষ করে দেয়।
একটি বিন্দু থেকেই যেমন জ্যামিতিতে একটি বৃত্তের জন্ম হয়, তেমনি একটি শিশুর হাতে অবাধে তুলে দেওয়া একটি স্মার্টফোন থেকেই শুরু হতে পারে দীর্ঘ আসক্তির বৃত্ত। প্রথমে কার্টুন, তারপর গেম, এরপর ভিডিও, তারপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, তারপর রাত জাগা, পড়াশোনায় অনীহা, পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা, মানসিক অবসাদ, সাইবার বুলিং, অশ্লীল কনটেন্ট, অনলাইন প্রতারণা এবং শেষ পর্যন্ত একটি বিপন্ন ব্যক্তিত্ব। বিন্দু থেকে বৃত্ত, আর সেই বৃত্ত একসময় জীবনের চারপাশে লোহার বেড়া হয়ে দাঁড়ায়।
ফ্রান্সের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত তাই কেবল একটি আইন নয়; এটি একটি সভ্য রাষ্ট্রের আত্মরক্ষার ঘোষণা। রাষ্ট্র বলছে, শিশুদের মস্তিষ্ক কোনো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের বাজার নয়।
বাংলাদেশেও বহু বছর ধরে জাতীয় দৈনিকগুলোতে উদ্বেগজনক সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। কোথাও দেখা গেছে অনলাইন গেমের নেশায় কিশোর আত্মহত্যা করেছে। কোথাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়ের সূত্র ধরে ব্ল্যাকমেইলের শিকার হয়েছে শিক্ষার্থী। কোথাও ভুয়া আইডি ব্যবহার করে প্রতারণা, আবার কোথাও টিকটক কনটেন্ট বানাতে গিয়ে প্রাণহানির ঘটনা। বিভিন্ন সময় প্রথম আলো, দৈনিক ইত্তেফাক, সমকাল, কালের কণ্ঠ, যুগান্তর, বাংলাদেশ প্রতিদিনসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এসব ঘটনা প্রকাশিত হয়েছে। এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এগুলো একটি বৃহত্তর সামাজিক সংকটের লক্ষণ।
আগে সন্ধ্যা নামলে পাড়া ভরে উঠত শিশুদের খেলাধুলার শব্দে। এখন সন্ধ্যা নামে, কিন্তু মাঠ নীরব। গোলপোস্ট দাঁড়িয়ে থাকে একা, ক্রিকেট ব্যাটে ধুলো জমে, অথচ প্রতিটি ঘরে জ্বলতে থাকে একটি নীল আলো। সেই আলো বিদ্যুতের নয়, আসক্তির।
মোবাইল ফোন নিজে শত্রু নয়। যেমন ছুরি দিয়ে ফলও কাটা যায়, আবার মানুষও আহত হতে পারে। সমস্যা প্রযুক্তিতে নয়, তার অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে। অ্যালগরিদম এমনভাবে তৈরি হয় যে ব্যবহারকারী যত বেশি সময় স্ক্রিনে থাকবে, তত বেশি লাভ হবে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের। অর্থাৎ শিশুর মনোযোগ আজ একটি পণ্য।
রাষ্ট্র যখন গাড়ি চালাতে লাইসেন্স চায়, ব্যাংক হিসাব খুলতে পরিচয়পত্র চায়, ভোট দিতে বয়স নির্ধারণ করে, তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বয়সভিত্তিক সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকা অস্বাভাবিক নয়। এটি স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া নয়; এটি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
আমার দীর্ঘদিনের প্রস্তাবও ছিল একই দর্শনের ওপর প্রতিষ্ঠিত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যাকাউন্ট খুলতে জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট অথবা শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রত্যয়িত পরিচয়পত্র এবং নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। এতে ভুয়া পরিচয় কমবে, জবাবদিহি বাড়বে এবং শিশুদের সুরক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে।
আমাদের এখন প্রশ্ন করা দরকার, আমরা কি সন্তানকে স্মার্টফোন দিচ্ছি, নাকি তার শৈশব কেড়ে নিচ্ছি? আমরা কি প্রযুক্তি শেখাচ্ছি, নাকি অ্যালগরিদমের কাছে তার মন বিক্রি করে দিচ্ছি?
একটি জাতির ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে বিদ্যালয়ে, পরিবারে, খেলার মাঠে এবং বইয়ের পাতায়। যদি সেই ভবিষ্যৎ সারাক্ষণ একটি পর্দার মধ্যে বন্দি থাকে, তাহলে উন্নত ভবন তৈরি হবে, কিন্তু উন্নত মানুষ তৈরি হবে না।
আজ প্রয়োজন আতঙ্ক নয়, সচেতনতা। নিষেধাজ্ঞা নয়, সুরক্ষিত নীতিমালা। প্রযুক্তিবিরোধিতা নয়, প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহার।
বাংলাদেশের উচিত এখনই একটি সমন্বিত ডিজিটাল সুরক্ষা নীতি গ্রহণ করা। বয়স যাচাই বাধ্যতামূলক করা, অভিভাবকীয় নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল নৈতিকতা শিক্ষা চালু করা এবং ভুয়া পরিচয়ে অ্যাকাউন্ট খোলা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা।
ফ্রান্স একটি দরজা খুলেছে। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি সেই দরজায় কড়া নাড়বে, নাকি আরও কয়েকটি প্রজন্মকে মোবাইলের নীল আলোয় হারিয়ে যাওয়ার পর জেগে উঠবে?


