বাংলার অবাধ্য ‘মসনদ-ই-আলা’: ঈসা খাঁ কি আমাদের শেষ স্বাধীন শাসক?

  • প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৬, বিকাল ০৭:০২
  • আপডেট: ২৪ মে ২০২৬, বিকাল ০৭:০২
Gemini_Generated_Image_x9qg4ox9qg4ox9qg

ইমদাদুল হক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট:

আমরা সাধারণত বলে থাকি, ১৭৫৭ সালে পলাশীর আম্রকাননে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার পতনের মধ্য দিয়ে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়েছিল। এরপর দীর্ঘ ব্রিটিশ শাসন পেরিয়ে ১৯৭১-এর আগে এই ভূখণ্ড আর পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা দেখেনি। কিন্তু একটু পেছনে ফিরে তাকালে একটি মৌলিক প্রশ্ন মনে জাগে—মুঘল শাসন কি টেকনিক্যালি আমাদের জন্য ‘বহিরাগতদের শাসন’ ছিল না? মায়ের দিক থেকে চেঙ্গিস খান আর বাবার দিক থেকে তৈমুর লং-এর রক্ত বহন করা সম্রাট বাবর ছিলেন এই উপমহাদেশের বাইরের এক শক্তি। সম্রাট অশোকের পর এই অঞ্চলে এত বড় সাম্রাজ্য আর কেউ গড়তে পারেনি।কিন্তু এই অপরাজেয় মুঘল শক্তিকেও পদে পদে থমকে যেতে হয়েছিল একটি বিশেষ অঞ্চলের কাছে—তা হলো আমাদের এই নদীমাতৃক বাংলা এবং বাংলার অদম্য ‘বারো ভূঁইয়ারা’। আজ থেকে প্রায় ৪০০ বছর আগের ঘটনা হওয়ায় বহু ইতিহাস আজ লোককথার রূপ নিয়েছে। তবে পুরো উপমহাদেশে মুঘলদের বিজয়ডঙ্কা বাজলেও, এই বাংলার মাটিতে তারা প্রায় ৪০ বছর ধরে শাসন কায়েম করতে পারেনি—এটি এক অনস্বীকার্য সত্য। আর এই প্রতিরোধ পর্বেই সোনারগাঁওয়ের বৈভব মুগ্ধ করেছিল ইবনে বতুতা, মাহুয়ান কিংবা রালফ ফিচের মতো বিশ্বপরিব্রাজকদের।

বারো ভূঁইয়ার গোলকধাঁধা এবং ঈসা খাঁর উত্থান

শুরুতেই একটি ঐতিহাসিক বিভ্রান্তি দূর করা প্রয়োজন। ‘বারো ভূঁইয়ার’ বারো সংখ্যাটি কিন্তু আক্ষরিক অর্থে ১২ জন শাসককে বোঝায় না। ঐতিহাসিক কৈলাশ চন্দ্র সিংহের মতে, আকবরের জন্মের আগে পাঠান আমলে বাংলা ১২টি প্রশাসনিক ভাগে বা ‘ভাটি’ অঞ্চলে বিভক্ত ছিল, যার শাসকেরা সম্মিলিতভাবে বারো ভূঁইয়া নামে পরিচিত হন। অন্যদিকে দুর্গাচন্দ্র সান্যালের ‘বাংলার সামাজিক ইতিহাস’ বইয়ে দাবি করা হয়েছে, এটি আসলে ‘বড় ভূঁইয়া’ শব্দের অপভ্রংশ। প্রকৃতপক্ষে শক্তিশালী শাসক কখনো ৯ জন, কখনো ১৬ জন ছিলেন। এরা পুরোপুরি স্বাধীন না হলেও দিল্লি থেকে দূরত্বের সুযোগ নিয়ে স্বাধীনচেতা রাজার মতোই চলতেন।১৫৭৬ সালে রাজমহলের যুদ্ধে মুঘলদের হাতে আফগান শাসক দাউদ খাঁ কররানীর মৃত্যুর পর বাংলার ভাগ্যাকাশে মেঘ জমতে শুরু করে। স্থানীয় হিন্দু-মুসলিম ভূঁইয়ারা বুঝতে পেরেছিলেন, মুঘলরা শুধু রাজস্ব নিয়ে শান্ত থাকবে না, পুরো বাংলা গ্রাস করতে আসবে। এই অস্তিত্বের সংকটই তাঁদের এক সুতোয় বাঁধে, যার অবিসংবাদী নেতা হিসেবে উত্থান ঘটে সোনারগাঁওয়ের ঈসা খাঁর।মুসলিম ঐতিহাসিকদের চোখে ঈসা খাঁ ছিলেন ‘ভাটি অঞ্চলের অধীশ্বর’। তার ধমণীতে ছিল অযোধ্যার রাজপুত বংশের রক্ত। পিতা কালিদাস গজদানী ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে হোসেন শাহী বংশের সুলতান গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহের কন্যা সৈয়দা মোমেনা খাতুনকে বিয়ে করেন। অর্থাৎ, মাতুলালয় সূত্রে বাংলার রাজকীয় ঐতিহ্য ছিল ঈসা খাঁর রক্তে। শৈশবে পিতাকে হারিয়ে ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি হয়ে যাওয়ার পর মামা কুতুব খাঁর হাত ধরে পুনরায় বাংলায় ফেরা এবং কররানী আমলে জমিদারি পুনরুদ্ধার—তার জীবন যেন কোনো রোমাঞ্চকর উপন্যাসের চেয়ে কম নয়।

নৌযুদ্ধ, কৃত্রিম বন্যা ও কুটনীতির দাবাখেলা

দাউদ খাঁর পতনের পর দলছুট আফগান যোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়ে ঈসা খাঁ এক বিশাল মুঘল-বিরোধী জোট গড়ে তোলেন। কটকের সন্ধির সময় মীর-ই-বহর শাহ বরদির নেতৃত্বাধীন মূল মুঘল নৌবহরকে যেভাবে ঈসা খাঁ আচমকা আক্রমণে পরাস্ত করেছিলেন, তা দিল্লির রাজদরবারে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছিল।মুঘলরা বারবার বাংলার স্বাধীনতা হরণ করতে সেনা পাঠিয়েছে, আর ঈসা খাঁ প্রতিবারই তাদের ফিরিয়ে দিয়েছেন এক-একটি নতুন রণকৌশলে। ১৫৭৮ সালের বর্ষা মৌসুমে সুবেদার খান জাহান যখন ভেবেছিলেন নদীমাতৃক বাংলায় বর্ষায় আক্রমণ করে ঈসা খাঁকে চমকে দেবেন, ঈসা খাঁ তখন উল্টো রণনীতি সাজান। বর্তমান কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামের কাছে তাইথলের যুদ্ধে মুঘলদের কামানের মুখে শুরুতে ভূঁইয়ারা ছত্রভঙ্গ হলেও, মুঘল সেনাদের লুটপাটের ব্যস্ততা এবং আকস্মিক বৃষ্টির সুযোগ নিয়ে ঈসা খাঁ, মজলিস দিলোয়ার ও মজলিস প্রতাপের ছোট বাহিনী চিতার গতিতে পাল্টা আঘাত হানে। নিশ্চিত বিজয় হাতছাড়া করে কোনোমতে প্রাণ বাঁচিয়ে ফেরে মুঘল বাহিনী।ঈসা খাঁর শ্রেষ্ঠত্ব শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই ছিল না, তিনি ছিলেন একজন ঝানু কূটনীতিবিদ। ১৫৭৯ সালে বাংলার মুঘল সৈন্যদের ভেতর আকবরের ধর্মীয় ও রাজস্ব নীতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ফেটে পড়লে ঈসা খাঁ সেই সুযোগের পূর্ণ ব্যবহার করেন। মুঘল বিদ্রোহী নেতা মাসুম খান কাবুলিকে বুকে টেনে নেন। ত্রিপুরা রাজ অমর মাণিক্যের সাথে কৌশলগত মিত্রতা করেন। ১৫৮৪ সালের মধ্যে ঢাকা, ময়মনসিংহ, সোনারগাঁও, এগারসিন্দুর ও বাজিতপুরকে যুক্ত করে পুরো বাংলাকে এক দুর্ভেদ্য সামরিক দুর্গে পরিণত করেন তিনি।আকবরের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সেনাপতি শাহবাজ খান কামবোহ যখন ১৫৮৩ সালে বিশাল অশ্বারোহী বাহিনী নিয়ে বাংলা অভিযানে আসেন, তখনো ঈসা খাঁ তাকে মুখোমুখি যুদ্ধের চেয়ে ‘গেরিলা’ ও ‘প্রক্সি’ যুদ্ধে ব্যস্ত রাখেন। শাহবাজ খান যখন সন্ধির প্রস্তাব দেন, ঈসা খাঁ তখন ব্রহ্মপুত্রের ১৫টি পয়েন্টে বাঁধ নির্মাণের কাজ করছিলেন। বর্ষা নামতেই সেই বাঁধের মুখ খুলে দেওয়া হয়। কৃত্রিম বন্যায় ভেসে যায় মুঘলদের অহংকার। প্রকৃতির ঋতুচক্রকে সামরিক অস্ত্রে পরিণত করার এমন নজির ইতিহাসে বিরল।

মানসিংহের ট্র্যাজেডি ও দিল্লির দরবারে স্বীকৃতি

১৫৯৪ সালে বাংলার সুবেদার হয়ে আসেন অপরাজেয় রাজপুত রাজা মানসিংহ। তিনি এসে বুঝতে পারেন, বাংলা মুঘলদের কাছে এক ‘অভিশপ্ত ও অবাধ্য অঞ্চল’ (বিদ্রোহ ভূমি)। মানসিংহের সাথে ঈসা খাঁর লড়াই রূপ নেয় এক মনস্তাত্ত্বিক কোল্ড ওয়ারে। কামরূপ ও কামতার দুই ভাইয়ের (রঘুদেব ও লক্ষ্মীনারায়ণ) পারিবারিক বিরোধে মানসিংহ ও ঈসা খাঁ দুজনেই প্রক্সি ওয়ারে জড়িয়ে পড়েন।১৫৯৭ সালে মানসিংহের ছেলে দুর্জন সিংহ যখন কত্রাভুতে আক্রমণ করেন, তখন বাংলার চিরচেনা বর্ষা আবারও ঈসা খাঁর পক্ষ নেয়। শীতলক্ষ্যা, মেঘনা ও ধলেশ্বরীর জলরাশিতে অবরুদ্ধ হয়ে দুর্জন সিংহ নিহত হন এবং মুঘল বাহিনীর শোচনীয় পরাজয় ঘটে। একের পর এক পুত্র হারিয়ে মানসিংহ মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন।তবে ঈসা খাঁ জানতেন, মুঘলদের অন্তহীন জনবল ও সম্পদের সাথে চিরকাল শুধু যুদ্ধ করে টিকে থাকা সম্ভব নয়। তাই চূড়ান্ত গৌরবের মুহূর্তে দাঁড়িয়েও তিনি শান্তির হাত বাড়ান। মানসিংহের মাধ্যমে তিনি সম্রাট আকবরের দরবারে হাজির হন। আকবর ততদিনে বাংলার এই অবাধ্য বীরের সাহসিকতায় মুগ্ধ। তিনি ঈসা খাঁকে কোনো শাস্তি বা অপমান না করে উল্টো ২২টি পরগনার জমিদারি এবং লোকমুখে প্রচলিত ‘মসনদ-ই-আলা’ উপাধির রাজকীয় স্বীকৃতি দেন। এর বিনিময়ে ঈসা খাঁও তার জীবনের শেষ দিনগুলোতে দিল্লির সাথে আর কোনো দ্বন্দ্বে জড়াননি।

ইতিহাসের অন্তরালে এক বিস্মৃত নায়ক

১৬০৩ সালে ভাওয়ালের জমিদার বন্ধু ফজল গাজীর বাড়ি যাওয়ার পথে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে ইতিহাসের এই মহাবীর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। আজ গাজীপুরের কালীগঞ্জের বক্তারপুর দুর্গের দিঘির পাড়ে নিভৃতে শুয়ে আছেন তিনি।যে সোনারগাঁওয়ের বৃত্ত ও বৈভবে মুগ্ধ হয়ে চাইনিজ বণিকরা নিয়মিত আসত, যে ঈসা খাঁর আমলেই ৩৬০ আউলিয়ার দল সোনারগাঁও হয়ে সিলেটে প্রবেশ করেছিল—আজকের বাঙালি প্রজন্ম তাদের সেই গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়কে কতটা মনে রেখেছে? আমরা মারাঠা বীর বাজিরাওকে চিনি, বাবর-আকবরের তৈমুরি শৌর্য চিনি, কিন্তু বাংলার নদী-নালা ব্যবহার করে দিল্লির রাজশক্তিকে কাঁপিয়ে দেওয়া ঘরের ছেলে ঈসা খাঁকে আমরা ঠিকঠাক চিনি না। ইতিহাস বড় নিষ্ঠুর, সে বিজিতের বীরত্বগাথা অনেক সময়ই বিজয়ী শাসকের মহিমার আড়ালে চাপা দিয়ে দেয়। কিন্তু ৪০০ বছর পরও, যখনই বাংলার স্বাধিকার আর প্রতিরোধের গল্প উঠবে, ‘মসনদ-ই-আলা’ ঈসা খাঁর নাম সেখানে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

Ad