বেনজীর হওয়াটাই যেখানে নিয়তি: শোষিত যখন শোষক হতে চায়

  • প্রকাশ: ০৩ এপ্রিল ২০২৬, দুপুর ০২:৩৬
  • আপডেট: ০৩ এপ্রিল ২০২৬, দুপুর ০২:৩৬
বেনজীর হওয়াটাই যেখানে নিয়তি: শোষিত যখন শোষক হতে চায়

ইমদাদুল হক, সাংবাদিক ও কলামিষ্ট:

​বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোরগুলোতে আজ যে তরুণদের দীর্ঘশ্বাস শোনা যায়, তাদের বড় অংশটি উঠে এসেছে এই মাটির হাহাকার আর দারিদ্র্যের শেকড় ছিঁড়ে। যাকে আমরা তথাকথিত 'মধ্যবিত্ত' বলে চালিয়ে দিই, নিবিড়ভাবে দেখলে দেখা যায় সেটি আসলে নিম্নবিত্তেরই একটি কিঞ্চিৎ পালিশ করা সংস্করণ। অভাব মানুষকে কেবল উচ্চাভিলাষী করে না, তাকে হিংস্র এবং ক্ষমতালিপ্সুও করে তোলে। আর সেই উচ্চাভিলাষ যখন কেবল 'আর্থিক এবং ক্ষমতা'র বৃত্তে বন্দি থাকে, তখন সমাজ জন্ম দেয় একদল মানসিক বিকারগ্রস্ত ক্যারিয়ারিস্ট।

​আমাদের বিসিএস বা সিভিল সার্ভিস এখন এক ধরনের 'শ্রেণি উত্তরণের লটারি'। এখানে উচ্চবিত্তের অংশগ্রহণ নেই বললেই চলে। আজ এমন কোনো তরুণ অফিসার খুঁজে পাওয়া দুষ্কর, যার পরিবার হাজার কোটি টাকার মালিক। বরং এখানে ভিড় সেই তরুণদের, যাদের শৈশব কেটেছে চরম অনিশ্চয়তায়। কিন্তু সমস্যাটা কেবল দারিদ্র্যে নয়, সমস্যাটা 'সাংস্কৃতিক উচ্চতায়'।

​সততা এবং নৈতিকতা কোনো সস্তা নীতিবাক্য নয়; এগুলো একটি উচ্চতর সাংস্কৃতিক রুচিবোধের বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু একটি প্রদর্শনকামী, ভয়ার্ত এবং লোভী জনগোষ্ঠীর ভেতর এই চর্চা আশা করা অবান্তর। কালচারাল হাইট বা সাংস্কৃতিক উচ্চতা না থাকলে মোরাল হাইট বা নৈতিক উচ্চতা অর্জন করা যায় না। গত দুই দশকে যারা পাবলিক সার্ভিসে ঢুকেছেন, তাদের বড় অংশই মূলত 'ভীতু জন্তু'। চাকরি হারানো, প্রমোশন না পাওয়া বা ভালো পোস্টিং খোয়ানোর যে আদিম ভয়—এই ভয়ই তাদের মেরুদণ্ডহীন করে রাখে। আর যেকোনো অবৈধ ও নিষ্ঠুর কাজ কেবল এই ভীতু মানুষদের দিয়েই করানো সম্ভব।

​এ সুযোগটিই নেয় রাজনৈতিক শক্তি। এই ভীতু অফিসাররা যখন শক্তিকেন্দ্রের ছায়ায় আশ্রয় খোঁজে, তখনই তারা অনিবার্যভাবে একেকজন 'বেনজীর' হয়ে ওঠে। এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, এটিই সিস্টেমের নিয়তি।

​মনস্তাত্ত্বিক দিক দিয়ে দেখলে, দারিদ্র্য মানুষের 'মোরাল ইনস্টিঙ্কট'কে হত্যা করে সেখানে 'সার্ভাইভাল ইনস্টিঙ্কট' বসিয়ে দেয়। শৈশব-কৈশোরের চরম অর্থনৈতিক সংগ্রাম ভেতরে ভেতরে তাদের এতটাই ভঙ্গুর করে দেয় যে, ডিসপ্যাশোনেট বা নির্মোহ চাকরিজীবনের জন্য যে সাহসের প্রয়োজন, তা তারা হারিয়ে ফেলে। প্রাণীজগতে একটি শব্দ আছে—'ক্লিপ্টোপ্যারাসাইটিজম' (Kleptoparasitism) বা চৌর্যপরজীবিতা। হায়েনা যেমন নিজেরা শিকার না করে সিংহের মুখ থেকে খাবার ছিনিয়ে নেয়, আমাদের সরকারি কর্মকর্তাদের বড় অংশই আজ সেই চৌর্যপরজীবী। তারা নিজেরা সম্পদ সৃষ্টি করে না, বরং অন্যের সৃষ্ট সম্পদ কৌশলে দখল করে।

​পীড়িত মানুষের ভেতর সবসময় একটি 'প্রতিশোধবাদী ক্ষমতালিপ্সা' কাজ করে। এটি একটি প্রাকৃতিক এবং কিছুটা শারীরিক প্রতিক্রিয়া। এই রিয়েকশন থেকেই আজকের ছেলেমেয়েরা অ্যাডমিন বা পুলিশ ক্যাডারকে তালিকার শীর্ষে রাখে। যে সমাজে বৈষম্য আকাশচুম্বী, সেখানে এই ক্যাডার সার্ভিসগুলো একজন 'প্রজা'কে 'রাজা' হওয়ার বৈধ লাইসেন্স প্রদান করে। বাংলাদেশের বর্তমান জিঘাংসমূখর সাংস্কৃতিক অবস্থায় সিংহভাগ তরুণের অবচেতন মনে এই জিঘাংসাই কাজ করে।

​ফলস্বরূপ, আজ যদি কোনো স্নাতক বেনজীর হওয়ার স্বপ্ন দেখে, তবে তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। জন্মের পর থেকেই সে দেখে আসছে—ভালো বাড়ি, দামি গাড়ি, আভিজাত্য আর সকল নাগরিক সুবিধা কেবল বেনজীরদের দখলে। যা কিছু সুন্দর ও হৃষ্টপুষ্ট, তার সবটুকুই এই ক্ষমতাধরদের; আর সাধারণের জন্য পড়ে থাকে কেবল কুৎসিত আর ভিখেরিসুলভ উচ্ছিষ্ট।

​এই চরম বৈষম্য আর এক্সেস টু অ্যামেনিটির সীমাবদ্ধতা সাধারণ মানুষের মনে হিংসার আগুন জ্বালিয়ে রাখে। সেই আগুন থেকেই জন্ম নেয় এক কঠিন প্রতিজ্ঞা—"সুযোগ আসুক, একদিন আমিও বেনজীর হবো।"

​যে অর্থনীতিক ও রাজনীতিক কাঠামো আমরা গড়ে তুলেছি, সেখানে সততা একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত আর 'বেনজীর হওয়া' একটি সফল গন্তব্য। যতক্ষণ এই সিস্টেম থাকবে, ততক্ষণ আমরা কেবল শোষক বদলাবো, শোষণ নয়।

Ad