শিক্ষা নকআউট খেলা নয়, এটি মানুষ গড়ার ধারাবাহিক যাত্রা
মোঃ নজরুল ইসলাম
শিক্ষা কোনো একদিনের প্রতিযোগিতা নয়, এটি একটি দীর্ঘ যাত্রা। একটি শিশুর প্রথম অক্ষর শেখা থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগার পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ পরবর্তী ধাপের ভিত্তি তৈরি করে। তাই শিক্ষাক্রমকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে নয়, একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখতে হবে।
আমরা অনেক সময় পরীক্ষাকে এমনভাবে উপস্থাপন করি, যেন এটি ফুটবল বিশ্বকাপের নকআউট পর্ব। একটি ম্যাচে হারলেই সব শেষ। কিন্তু শিক্ষা কখনো নকআউট টুর্নামেন্ট নয়। এটি এমন একটি নদী, যার প্রতিটি বাঁক, প্রতিটি স্রোত, প্রতিটি মোহনা পরবর্তী গন্তব্যের সঙ্গে যুক্ত।
একজন শিক্ষার্থী ষষ্ঠ শ্রেণিতে একটু দুর্বল হতে পারে, অষ্টম শ্রেণিতে ঘুরে দাঁড়াতে পারে, এসএসসিতে ভালো করতে পারে, আবার এইচএসসিতে সাময়িকভাবে পিছিয়ে যেতে পারে। তাই একটি পরীক্ষার গ্রেড দিয়ে তার সারাজীবনের মেধার বিচার করা ন্যায়সংগত নয়।
একটি আমগাছকে যেমন প্রথম বছর ফল না দেওয়ার কারণে কেটে ফেলা হয় না, একটি ধানের জমিকে যেমন এক মৌসুমের ফলন দেখে চিরদিনের জন্য অনুর্বর বলা যায় না, তেমনি একজন শিক্ষার্থীকেও একটি পরীক্ষার নম্বর দিয়ে স্থায়ীভাবে মূল্যায়ন করা উচিত নয়।
আমার দৃঢ় বিশ্বাস, স্কুল, কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ব্যবস্থায় একটি মৌলিক সংস্কার প্রয়োজন। এসএসসি কিংবা এইচএসসির গ্রেডকে প্রাথমিক তথ্য হিসেবে রাখা যেতে পারে, কিন্তু চূড়ান্ত সুযোগ নির্ধারণ করবে ভর্তি পরীক্ষা। যে কোনো বিভাগ, যে কোনো গ্রেডের শিক্ষার্থী যদি প্রয়োজনীয় যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারে, তাহলে তার জন্য বুয়েট, মেডিকেল, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের যেকোনো উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দরজা উন্মুক্ত থাকা উচিত।
কারণ ভর্তি পরীক্ষার উদ্দেশ্যই হলো বর্তমান সক্ষমতা যাচাই করা। পাঁচ বছর আগে পাওয়া একটি গ্রেড নয়, আজ একজন শিক্ষার্থী কতটুকু জানে, কতটুকু বুঝে এবং কতটুকু বিশ্লেষণ করতে পারে, সেটিই হওয়া উচিত প্রকৃত মূল্যায়নের ভিত্তি।
ইতিহাস সাক্ষী, অনেক শিক্ষার্থী স্কুলজীবনে মাঝারি ফল করেও পরবর্তীতে অসাধারণ বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, বিচারপতি ও প্রশাসক হয়েছেন। আবার অনেকেই প্রথম জীবনে সর্বোচ্চ গ্রেড পেয়েও কর্মজীবনে সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেননি। কারণ নম্বর মেধার একটি অংশের পরিচয় দেয়, কিন্তু অধ্যবসায়, সৃজনশীলতা, চরিত্র, দায়িত্ববোধ ও সমস্যা সমাধানের ক্ষমতার সম্পূর্ণ পরিচয় দেয় না।
শিক্ষা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় শক্তি হওয়া উচিত দ্বিতীয় সুযোগ দেওয়ার মানসিকতা। যে রাষ্ট্র তার তরুণদের নতুন করে নিজেকে প্রমাণ করার সুযোগ দেয়, সেই রাষ্ট্রই ভবিষ্যতে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলে।
শিক্ষার আরেকটি বড় সংকট আজ মোবাইল ফোনের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার। যে মোবাইল ফোনে একজন শিক্ষার্থীর একটি কল এবং একজন মন্ত্রীর কয়েকটি কথাকে কেন্দ্র করে পুরো দেশ কয়েক দিন ধরে বিভক্ত হয়ে আলোচনা করতে পারে, সেই মোবাইল যদি নিয়ন্ত্রণহীন থাকে, তবে ভবিষ্যতে এর ভয়াবহতা আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
আজ মোবাইল শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়। এটি গুজব ছড়ানোর মাধ্যম, চরিত্রহননের অস্ত্র, মিথ্যা প্রচারের কারখানা, মনোযোগ নষ্ট করার যন্ত্র এবং অনেক ক্ষেত্রে মানসিক আসক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাজার হাজার শিক্ষার্থী বইয়ের চেয়ে পর্দার সামনে বেশি সময় ব্যয় করছে। পাঁচ মিনিট পড়াশোনা, তারপর পনেরো মিনিট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। এভাবে একটি প্রজন্ম ধীরে ধীরে গভীর মনোযোগের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে।
আগুন যেমন রান্নাও করে, আবার অসাবধানতায় ঘরও পুড়িয়ে দেয়; ছুরি যেমন চিকিৎসকের হাতে জীবন বাঁচায়, আবার অপরাধীর হাতে প্রাণ কেড়ে নেয়; মোবাইলও তেমনি জ্ঞান অর্জনের শক্তিশালী মাধ্যম হতে পারে, আবার একটি জাতির ভবিষ্যৎ ধ্বংসের কারণও হতে পারে। তাই প্রযুক্তিকে নিষিদ্ধ নয়, নিয়ন্ত্রিত, নৈতিক এবং দায়িত্বশীল ব্যবহারের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে মোবাইল ব্যবহারের একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকা প্রয়োজন। শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের সময় অপ্রয়োজনীয় মোবাইল ব্যবহার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হওয়া উচিত। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বই, গবেষণা, পাঠাগার, বিতর্ক, বিজ্ঞানচর্চা, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে আবারও শিক্ষাজীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরিয়ে আনতে হবে।
মনে রাখতে হবে, শিক্ষা শুধু জিপিএ পাঁচ অর্জনের প্রতিযোগিতা নয়। শিক্ষা মানুষ হওয়ার অনুশীলন। নম্বর একজন শিক্ষার্থীর ফলাফল জানায়, কিন্তু চরিত্র জানায় তার ভবিষ্যৎ। সনদ চাকরির দরজা খুলতে পারে, কিন্তু সততা, শৃঙ্খলা, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধ ছাড়া সেই দরজা দিয়ে দীর্ঘ পথ হাঁটা যায় না।
আজ আমাদের প্রয়োজন এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা, যেখানে শিক্ষকের মর্যাদা থাকবে, শিক্ষার্থীর অধিকার থাকবে, আবার দায়িত্বও থাকবে। যেখানে প্রশ্ন করার স্বাধীনতা থাকবে, কিন্তু শৃঙ্খলাও থাকবে। যেখানে প্রযুক্তি থাকবে, কিন্তু প্রযুক্তির দাসত্ব থাকবে না। যেখানে নম্বরের মূল্য থাকবে, কিন্তু মানুষের মূল্য নম্বরের চেয়ে বড় হবে।
একজন শিক্ষার্থীর একটি ফোনকলকে ঘিরে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, সেটি আমাদের আরেকটি শিক্ষা দিয়েছে। একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ হয় কেবল পাঠ্যবই দিয়ে নয়, বরং তার মূল্যবোধ, যুক্তিবোধ, ভাষা, শালীনতা, দায়িত্ববোধ এবং পারস্পরিক সম্মানবোধ দিয়েও।
আমরা যদি সত্যিই আগামী প্রজন্মকে শক্তিশালী বাংলাদেশ উপহার দিতে চাই, তাহলে শিক্ষা নিয়ে আবেগ নয়, গবেষণা; স্লোগান নয়, সংস্কার; বিভাজন নয়, দায়িত্বশীল জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তুলতে হবে। কারণ আজকের শ্রেণিকক্ষেই আগামী দিনের রাষ্ট্রনায়ক, বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, বিচারপতি, শিক্ষক ও সৎ নাগরিক তৈরি হচ্ছে। সেই কারখানার প্রতিটি ইট, প্রতিটি নিয়ম এবং প্রতিটি মূল্যবোধই তাই রাষ্ট্রের ভবিষ্যতের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
।।।..............................
বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি শিক্ষাখাতে সাধারণ উন্নতির বদলে ব্যাপক ও যুগোপযোগী পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করে বলেছিলেন, শিক্ষা খাতে শুধু 'হাই জাম্প' দিলেই হবে না, বড় ধরনের ‘পোল ভল্ট জাম্প’ দিতে হবে।

