জেরুজালেমের এক বর্গকিলোমিটারের জন্য ৪০০০ বছরের সংঘাত! ৩০০ বছর ধরে সরানো যায়নি একটি মই

  • প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬, বিকাল ০৫:১৫
Untitled Design

লেখক: ইমদাদুল হক ,সাংবাদিক ও কলামিস্ট:

পৃথিবীর মানচিত্রে জেরুজালেমের পুরোনো শহরটি খুবই ছোট—এক বর্গকিলোমিটারেরও কম। অথচ এই ক্ষুদ্র ভূখণ্ডকে ঘিরে হাজার হাজার বছর ধরে সংঘাত, অবরোধ, দখল ও পুনর্দখলের ইতিহাস রচিত হয়েছে। ধর্মীয় বিশ্বাস, ঐতিহাসিক স্মৃতি এবং পবিত্র স্থানগুলোর ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে শহরটি আজও বিশ্বরাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

জেরুজালেমের ইতিহাসের একটি বিস্ময়কর প্রতীক হলো পবিত্র সমাধির গির্জার দরজার ওপরে রাখা একটি পুরোনো কাঠের মই। সাধারণ একটি মই হলেও এটি প্রায় ৩০০ বছর ধরে একই স্থানে রয়েছে বলে বহুল আলোচিত। কারণ, গির্জাটির বিভিন্ন অংশের ওপর ছয়টি খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের অধিকার ও ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত বিরোধ রয়েছে। মইটি সরানোর মতো একটি সাধারণ কাজও সেখানে অধিকার পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

২০০৮ সালে গির্জাটির ভেতরে দুই সম্প্রদায়ের সন্ন্যাসীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে হস্তক্ষেপ করতে হয়। এসব ঘটনা জেরুজালেমের পবিত্র স্থানগুলোর ব্যবস্থাপনা কতটা সংবেদনশীল, তা তুলে ধরে।

সম্পদ নয়, বিশ্বাসই জেরুজালেমের মূল শক্তি

সাধারণত নদী, সমুদ্রবন্দর কিংবা গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথকে কেন্দ্র করে বড় শহর গড়ে ওঠে। কিন্তু জেরুজালেমের ক্ষেত্রে চিত্রটি ভিন্ন। শহরটির আশপাশে বড় নদী বা সমুদ্রবন্দর নেই। এটি পাহাড়ি অঞ্চলে অবস্থিত এবং প্রাচীনকালে এর পানির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস ছিল গিহোন ঝরনা।তবু শহরটি প্রাচীন বিশ্বের ইতিহাসে বিশেষ স্থান অর্জন করে। এর প্রধান কারণ ছিল ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব। ইহুদি, খ্রিষ্টান ও মুসলমান—তিন ধর্মের অনুসারীদের কাছে জেরুজালেম বিশেষ মর্যাদার অধিকারী। ফলে শহরটির বিভিন্ন পবিত্র স্থানকে ঘিরে গড়ে উঠেছে গভীর আবেগ, বিশ্বাস ও ঐতিহাসিক দাবি।ইতিহাসবিদ এরিক ক্লাইনের আলোচনায় জেরুজালেমকে ঘিরে দীর্ঘ সময়ে সংঘটিত বহু সংঘাত, অবরোধ ও ক্ষমতার পরিবর্তনের বিবরণ পাওয়া যায়। শহরটির ইতিহাস দেখায়, একটি ছোট ভূখণ্ডও ধর্মীয় পরিচয় ও ঐতিহাসিক স্মৃতির কারণে বিশ্বব্যাপী তাৎপর্য অর্জন করতে পারে।


প্রাচীন জেরুজালেম ও পানি রক্ষার লড়াই

প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে জেরুজালেম অঞ্চলে বসতির চিহ্ন পাওয়া যায়। প্রাচীন মিশরীয় লিপিতেও শহরটির নামের সম্ভাব্য উল্লেখ খুঁজে পেয়েছেন গবেষকেরা। তবে শহরটির প্রাচীন ইতিহাসের বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রত্নতাত্ত্বিকদের মধ্যে এখনো মতপার্থক্য রয়েছে।খ্রিষ্টপূর্ব অষ্টম শতকের শেষ দিকে আশিরীয় সাম্রাজ্যের সম্প্রসারণ জেরুজালেমের জন্য বড় হুমকি হয়ে ওঠে। আশিরীয় রাজা সেনাখেরিবের অভিযানের সময় শহরটির নিরাপত্তার জন্য পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।ইতিহাসে হিজকিয়া নামে পরিচিত শাসকের সময় পাহাড়ের নিচ দিয়ে একটি সুড়ঙ্গ নির্মাণ করা হয়। প্রায় ৫৩০ মিটার দীর্ঘ এই সুড়ঙ্গের মাধ্যমে গিহোন ঝরনার পানি শহরের ভেতরে সিলোয়াম পুলে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছিল। সুড়ঙ্গটির নির্মাণকৌশল প্রাচীন প্রকৌশলবিদ্যার উল্লেখযোগ্য নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত।১৮৮০ সালে সুড়ঙ্গের দেয়ালে একটি প্রাচীন শিলালিপি আবিষ্কৃত হয়, যা সিলোয়াম শিলালিপি নামে পরিচিত। এতে সুড়ঙ্গ নির্মাণের শেষ পর্যায়ে দুই দিক থেকে এগিয়ে আসা শ্রমিকদের মিলিত হওয়ার বিবরণ রয়েছে।সেনাখেরিবের বাহিনী জেরুজালেম অবরোধ করলেও শহরটি দখল করতে পারেনি। এর কারণ নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। বাইবেলের বিবরণে মহামারির কথা বলা হয়েছে, অন্যদিকে আশিরীয় নথিতে হিজকিয়ার কর প্রদানের উল্লেখ রয়েছে। তবে এই ঘটনা জেরুজালেমের ইতিহাসে শহরটির টিকে থাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।


দাউদ ও সুলাইমানের ঐতিহ্য থেকে ব্যাবিলনের ধ্বংসযজ্ঞ

ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী, হযরত দাউদ আলাইহিস সালাম ছিলেন আল্লাহর নবী ও বাদশাহ। তাঁর পুত্র হযরত সুলাইমান আলাইহিস সালামও ছিলেন নবী ও শাসক। ইসলামী ঐতিহ্যে বায়তুল মুকাদ্দাসের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়। ইহুদি ঐতিহ্যে সংশ্লিষ্ট উপাসনালয়টি প্রথম মন্দির হিসেবে পরিচিত।তবে প্রাচীন জেরুজালেমের আকার, রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোর ইতিহাস নিয়ে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় বিভিন্ন মত রয়েছে।খ্রিষ্টপূর্ব ৫৮৬ সালে ব্যাবিলনের রাজা নেবুচাদনেজারের বাহিনী দীর্ঘ অবরোধের পর জেরুজালেম দখল করে। উপাসনালয় ধ্বংস করা হয় এবং বহু মানুষকে বন্দি করে ব্যাবিলনে নিয়ে যাওয়া হয়। এটি শহরটির ইতিহাসে অন্যতম বড় বিপর্যয়।পরবর্তী সময়ে পারস্য সম্রাট সাইরাস নির্বাসিতদের ফিরে আসার অনুমতি দেন। এরপর শহর ও উপাসনালয় পুনর্নির্মাণ করা হয়।রোমান শাসনামলে রাজা হেরোদ উপাসনালয়ের চত্বর সম্প্রসারণ করেন। ওই এলাকার দেয়ালের একটি অংশ বর্তমানে ইহুদিদের কাছে পশ্চিম প্রাচীর এবং মুসলিম ঐতিহ্যে আল-বুরাক প্রাচীর নামে পরিচিত।৭০ খ্রিষ্টাব্দে রোমান বাহিনী জেরুজালেম দখল করে উপাসনালয় ধ্বংস করে। পরবর্তী বিদ্রোহ দমনের পর সম্রাট হাড্রিয়ান শহরটির নাম পরিবর্তন করে এলিয়া ক্যাপিটোলিনা রাখেন। একপর্যায়ে ইহুদিদের শহরে প্রবেশেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।এসব ঘটনা জেরুজালেমকে শুধু একটি ভৌগোলিক স্থান নয়, বরং একটি জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় স্মৃতি ও পরিচয়ের কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।


খ্রিষ্টানদের পবিত্র সমাধির গির্জা খ্রিষ্টান ঐতিহ্য অনুযায়ী, যিশুর ক্রুশবিদ্ধ হওয়া ও পুনরুত্থানের স্মৃতির সঙ্গে জেরুজালেম গভীরভাবে সম্পর্কিত। চতুর্থ শতকে রোমান সম্রাট কনস্টান্টাইনের শাসনামলে শহরটির খ্রিষ্টীয় গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পায়।প্রাচীন বিবরণ অনুসারে, কনস্টান্টাইনের মা হেলেনা জেরুজালেমে যিশুর সমাধির স্থান শনাক্ত করেন বলে খ্রিষ্টান ঐতিহ্যে বর্ণিত আছে। পরবর্তী সময়ে সেখানে নির্মিত হয় পবিত্র সমাধির গির্জা, যা ইংরেজিতে চার্চ অব দ্য হলি সেপালকার নামে পরিচিত।এই গির্জাই সেই স্থান, যার দরজার ওপরে রাখা কাঠের মইটি বিশ্বজুড়ে আলোচিত।শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গির্জাটির বিভিন্ন অংশের ওপর একাধিক খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এসব অধিকার, ব্যবহারবিধি ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিরোধের কারণে সেখানে পরিবর্তন আনা অত্যন্ত জটিল।


মুসলিম শাসন ও খলিফা ওমরের ঐতিহ্য

সপ্তম শতকে মুসলিম বাহিনীর হাতে জেরুজালেমের নিয়ন্ত্রণ আসে। প্রচলিত ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় বর্ণনা অনুযায়ী, খলিফা হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু শহরটির আত্মসমর্পণ গ্রহণ করতে সেখানে যান।একটি বহুল প্রচলিত ঐতিহ্য অনুসারে, তাঁকে পবিত্র সমাধির গির্জায় নামাজ পড়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। কিন্তু তিনি সেখানে নামাজ পড়লে ভবিষ্যতে মুসলমানেরা গির্জাটির ওপর অধিকার দাবি করতে পারেন—এমন আশঙ্কা থেকে তিনি বাইরে নামাজ পড়েন বলে বর্ণনা রয়েছে। এই ঘটনার সঙ্গে ওমর মসজিদের ঐতিহ্য যুক্ত।মুসলমানদের কাছে জেরুজালেমের গুরুত্বের অন্যতম কারণ হলো আল-আকসা মসজিদ এবং ইসরা ও মিরাজের সঙ্গে শহরটির সম্পর্ক। ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী, মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক রাতে মক্কা থেকে জেরুজালেমে গমন করেন এবং সেখান থেকে ঊর্ধ্বলোকে যাত্রা করেন।আল-আকসা মসজিদ ও কুব্বাতুস সাখরা বা ডোম অব দ্য রক জেরুজালেমের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইসলামী স্থাপনা। অন্যদিকে, একই এলাকার সঙ্গে ইহুদি ও খ্রিষ্টান ঐতিহ্যেরও গভীর সম্পর্ক রয়েছে।


একই স্থানের প্রতি ভিন্ন ধর্মীয় বিশ্বাসের এই নিবিড় সংযোগ জেরুজালেমকে বিশেষভাবে সংবেদনশীল করে তুলেছে।


ক্রুসেড, সালাহউদ্দিন ও ক্ষমতার পালাবদল

১০৯৯ সালে প্রথম ক্রুসেডের সময় ইউরোপীয় ক্রুসেডাররা জেরুজালেম দখল করে। সমকালীন বিবরণে শহরটিতে ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের উল্লেখ রয়েছে। মুসলমান ও ইহুদিদের বহু মানুষ প্রাণ হারান। পরে সেখানে প্রতিষ্ঠিত হয় জেরুজালেম রাজ্য।১১৮৭ সালে সুলতান সালাহউদ্দিন হাত্তিনের যুদ্ধে ক্রুসেডার বাহিনীকে পরাজিত করে জেরুজালেম পুনর্দখল করেন। তাঁর শাসনামলে শহরটির ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন আসে এবং ইহুদিদের শহরে ফিরে আসার সুযোগ দেওয়া হয় বলে ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।পরবর্তী সময়ে ১২২৯ সালের একটি চুক্তির মাধ্যমে জেরুজালেমের নিয়ন্ত্রণ সাময়িকভাবে পরিবর্তিত হয়। পবিত্র রোমান সম্রাট দ্বিতীয় ফ্রেডরিক ও মিশরের সুলতান আল-কামিলের মধ্যে এই সমঝোতা হয়েছিল। এর মাধ্যমে যুদ্ধের পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমে শহরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে একটি ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা গড়ে ওঠে।১৫১৭ সালে অটোমান সাম্রাজ্যের অধীনে আসে জেরুজালেম। পরবর্তী সময়ে সুলতান সুলেমানের শাসনামলে পুরোনো শহরের বিখ্যাত প্রাচীর নির্মাণ ও সংস্কার করা হয়।


‘স্ট্যাটাস কো’ এবং ৩০০ বছরের পুরোনো মই

জেরুজালেমের পবিত্র স্থানগুলোর ব্যবস্থাপনার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো ‘স্ট্যাটাস কো’। এর মূলনীতি হলো, বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রচলিত অধিকার ও ব্যবস্থাপনার অবস্থান বজায় রাখা এবং একতরফাভাবে তা পরিবর্তন না করা।১৭৫৭ সালের অটোমান আমলের বিধানকে এই ব্যবস্থার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হয়। পরবর্তী সময়েও পবিত্র স্থানগুলোর প্রচলিত অধিকার রক্ষার নীতি জেরুজালেমের ধর্মীয় স্থাপনাগুলোর ব্যবস্থাপনায় প্রভাব ফেলেছে।পবিত্র সমাধির গির্জার দরজার ওপরে রাখা মইটি এই জটিল ব্যবস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছে। মইটি সরানোর মতো সাধারণ কাজও কোনো সম্প্রদায়ের অধিকার পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হতে পারে। ফলে একটি পুরোনো কাঠের মই যেন সেখানে দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও আপসের ইতিহাস বহন করছে।


ব্রিটিশ শাসন থেকে আধুনিক জেরুজালেম

১৯১৭ সালে ব্রিটিশ বাহিনী অটোমানদের কাছ থেকে জেরুজালেমের নিয়ন্ত্রণ নেয়। ১৯৪৮ সালের যুদ্ধের পর শহরটি পশ্চিম ও পূর্ব অংশে বিভক্ত হয়। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে ইসরায়েল পূর্ব জেরুজালেমসহ পুরো শহরের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে।বর্তমানে পুরোনো জেরুজালেম চারটি ঐতিহাসিক অংশে বিভক্ত—মুসলিম, খ্রিষ্টান, ইহুদি ও আর্মেনীয় কোয়ার্টার। অল্প দূরত্বের মধ্যে অবস্থিত এসব এলাকার গলি ও স্থাপনায় বিভিন্ন ধর্মীয় ঐতিহ্য পাশাপাশি দেখা যায়।জেরুজালেমের মর্যাদা ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে বিরোধ রয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও শহরটির অবস্থান নিয়ে মতপার্থক্য বিদ্যমান। ফলে এর ধর্মীয় গুরুত্বের পাশাপাশি রাজনৈতিক তাৎপর্যও অত্যন্ত গভীর।


খ্রিষ্টান গির্জার চাবি মুসলিম পরিবারের হাতে কেন?

জেরুজালেমের পবিত্র সমাধির গির্জা নিয়ে আলোচনায় আরেকটি ব্যতিক্রমী বিষয় হলো এর প্রধান দরজার চাবি। দীর্ঘদিন ধরে মুসলিম পরিবারের সদস্যরা এই চাবি সংরক্ষণ ও দরজা খোলার দায়িত্ব পালন করে আসছেন বলে প্রচলিত ঐতিহ্যে উল্লেখ রয়েছে।জুদেহ ও নুসাইবে পরিবারের সঙ্গে এই দায়িত্বের সম্পর্ক বিশেষভাবে আলোচিত। প্রচলিত বিবরণ অনুযায়ী, একটি পরিবার চাবি সংরক্ষণ করে এবং অন্য পরিবারের সদস্য দরজা খোলার কাজ করেন।এই ব্যবস্থার পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা রয়েছে। গির্জাটির বিভিন্ন অংশের ওপর একাধিক খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের অধিকার থাকায় কোনো একটি সম্প্রদায়ের হাতে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়ার আশঙ্কা বিরোধ সৃষ্টি করতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়গুলোর বাইরে থাকা একটি মুসলিম পরিবারের কাছে চাবির দায়িত্ব রাখা নিরপেক্ষতা বজায় রাখার ঐতিহাসিক পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।তবে এই দায়িত্বের সূচনা ও সময়কাল সম্পর্কে বিভিন্ন পারিবারিক ঐতিহ্য ও ঐতিহাসিক বিবরণ রয়েছে।গির্জাটির ছাদেও ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলোর উপস্থিতি ও অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। ইথিওপীয় সন্ন্যাসীদের অবস্থান এবং ছাদের ব্যবহার নিয়ে বিরোধের বিবরণও জেরুজালেমের পবিত্র স্থানগুলোর জটিল বাস্তবতা তুলে ধরে।


জেরুজালেমের ইতিহাসের শিক্ষা কী?

জেরুজালেমের ইতিহাসে রয়েছে প্রাচীন সুড়ঙ্গ, ধ্বংস হয়ে যাওয়া উপাসনালয়, ধর্মীয় স্থাপনা, ক্রুসেড, সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন এবং আধুনিক রাজনৈতিক বিরোধ। এসব ঘটনার কেন্দ্রে রয়েছে এমন একটি শহর, যার গুরুত্ব শুধু তার ভূখণ্ডের আয়তন দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।একটি পাথর তিনটি ধর্মের কাছে ভিন্নভাবে পবিত্র। একটি গির্জার চাবি সংরক্ষণের দায়িত্ব পালন করে মুসলিম পরিবার। আর একটি পুরোনো মই শতাব্দী ধরে একই স্থানে রয়ে গেছে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের অধিকারসংক্রান্ত জটিলতার কারণে।এসব ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, জেরুজালেমে ধর্মীয় স্মৃতি ও ঐতিহাসিক অধিকারের প্রশ্ন কতটা গভীর। এখানে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, ভিন্ন বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধাও গুরুত্বপূর্ণ।জেরুজালেমের ইতিহাস তাই শুধু সংঘাতের ইতিহাস নয়; এটি একই ভূখণ্ডে ভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সহাবস্থান, সমঝোতা এবং অবিশ্বাসের মধ্যেও ভারসাম্য বজায় রাখার দীর্ঘ প্রচেষ্টার ইতিহাস।


একটি ছোট শহর কেন হাজার হাজার বছর ধরে বিশ্ব ইতিহাসের কেন্দ্রে রয়েছে—জেরুজালেম তারই এক অনন্য উদাহরণ।

Ad