আমরা অনেকেই খাবারের হালাল হারামের প্রশ্নে অত্যন্ত সতর্ক

  • প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৬, বিকাল ০৭:২৯
  • আপডেট: ১২ জুলাই ২০২৬, বিকাল ০৭:২৯
1000245400

বাজারে গিয়ে মাংস হালাল কি না, রান্নায় নিষিদ্ধ কোনো উপাদান আছে কি না, সে বিষয়ে আমরা সচেতন থাকি। কিন্তু একটি প্রশ্ন কি কখনও নিজেদের করি?

যে অর্থ দিয়ে সেই হালাল খাবারটি কিনছি, সেই অর্থ কি হালাল?

এই প্রশ্নের উত্তরই মানুষের বিবেককে সবচেয়ে বেশি নাড়া দেয়।

অনেক মানুষ মুখে এক ফোঁটা হারাম খাবারও তুলতে চান না। অথচ সেই মানুষই হয়তো ঘুষ গ্রহণ করেন, মানুষের ন্যায্য অধিকার কেড়ে নেন, প্রতারণা করে সম্পদ অর্জন করেন, সুদের লেনদেনে জড়িয়ে পড়েন, মিথ্যা হিসাব দিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করেন কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার করে দুর্বল মানুষের প্রাপ্য আটকে রাখেন। তারপর সেই অর্থ দিয়েই পরিবারের জন্য উৎকৃষ্ট মানের হালাল খাবার কিনে আনেন। বাহ্যিকভাবে খাবারটি হালাল হলেও উপার্জনের উৎস নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

একটি স্বচ্ছ কাঁচের গ্লাসে যদি নির্মল পানি ঢালা হয়, কিন্তু সেই পানির উৎস যদি বিষাক্ত হয়, তবে সেই পানির স্বচ্ছতা কি তাকে নিরাপদ করে তোলে? বাহ্যিক রূপ অনেক সময় সত্যকে আড়াল করতে পারে, কিন্তু উৎসের বিশুদ্ধতা লুকিয়ে রাখতে পারে না।

মানুষের জীবনও তেমনি। শুধু থালার খাবার নয়, সেই থালায় পৌঁছানো প্রতিটি দানার পেছনের ইতিহাসও গুরুত্বপূর্ণ।

একজন কৃষক দিনের পর দিন রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে ফসল ফলান। একজন শ্রমিক ঘাম ঝরিয়ে ইট বহন করেন। একজন রিকশাচালক সারাদিন পরিশ্রম করে অল্প আয় নিয়ে বাড়ি ফেরেন। হয়তো তাদের খাবার খুব সাধারণ। কিন্তু সেই অন্নের প্রতিটি কণায় থাকে পরিশ্রমের মর্যাদা, সততার সুগন্ধ এবং আত্মসম্মানের আলো।

অন্যদিকে, অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ দিয়ে সাজানো বিলাসী ভোজ কখনও কখনও বাহ্যিক চাকচিক্য ছাড়া আর কিছুই নয়। মানুষের চোখকে ফাঁকি দেওয়া যায়, কিন্তু বিবেককে নয়।

একটি বৃক্ষের শিকড় যদি পচে যায়, তবে পাতায় পানি ছিটিয়ে তাকে দীর্ঘদিন সবুজ রাখা যায় না। উপার্জন মানুষের জীবনের সেই শিকড়। শিকড় অসুস্থ হলে ফলও সুস্থ হয় না।

আবার ভাবুন একটি দালানের কথা। বাইরে ঝকঝকে রঙ, দামি টাইলস, দৃষ্টিনন্দন নকশা। কিন্তু ভিত্তি যদি দুর্বল হয়, একদিন সামান্য কম্পনেই সেই দালান ভেঙে পড়বে। মানুষের চরিত্রও ঠিক তেমন। বাহ্যিক ধার্মিকতার চেয়ে নৈতিক ভিত্তি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

সমাজে আমরা প্রায়ই দেখি, কেউ নামাজে নিয়মিত, ধর্মীয় অনুষ্ঠানেও সক্রিয়, কিন্তু অফিসে ঘুষ ছাড়া কাজ করেন না। কেউ দান করেন, কিন্তু কর্মচারীর বেতন আটকে রাখেন। কেউ ধর্মীয় বক্তৃতা দেন, কিন্তু ব্যবসায় মাপে কম দেন। এই দ্বৈততা শুধু ব্যক্তির নয়, সমাজেরও ক্ষতি করে।

ধর্ম কেবল কিছু আচার পালনের নাম নয়। ধর্ম মানুষের চরিত্র গঠন করে, অন্যের অধিকার রক্ষা করতে শেখায়, সত্যের পাশে দাঁড়াতে সাহস দেয়, দুর্নীতিকে প্রত্যাখ্যান করতে উদ্বুদ্ধ করে এবং নিজের প্রাপ্যের বাইরে হাত না বাড়াতে শিক্ষা দেয়।

মানুষের হক নষ্ট করা এমন এক অন্যায়, যার ক্ষত অনেক সময় আদালতে নয়, মানুষের দীর্ঘশ্বাসে লেখা থাকে। একটি বিধবার প্রাপ্য আটকে রাখা, একজন শ্রমিকের মজুরি বিলম্ব করা, একটি এতিমের সম্পদ আত্মসাৎ করা কিংবা সাধারণ মানুষের সেবার বিনিময়ে ঘুষ দাবি করা, এসব অন্যায়ের প্রতিধ্বনি বহু দূর পর্যন্ত পৌঁছায়।

ইতিহাস সাক্ষী, অসংখ্য সভ্যতা বাহ্যিক শক্তির অভাবে নয়, নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে দুর্বল হয়ে পড়েছে। যখন অন্যায় স্বাভাবিক হয়ে যায়, তখন সমাজের ভিত ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যায়। আর যখন সততা ব্যতিক্রম হয়ে দাঁড়ায়, তখন উন্নয়নের অট্টালিকাও ভঙ্গুর হয়ে ওঠে।

সন্তানকে শুধু ভালো খাবার খাওয়ানো যথেষ্ট নয়। তাকে এমন উপার্জনের অন্ন খাওয়ানো দরকার, যার সঙ্গে কারও কান্না জড়িয়ে নেই, কারও অভিশাপ জড়িয়ে নেই, কারও বঞ্চনার ইতিহাস জড়িয়ে নেই। কারণ শিশুর শরীর যেমন খাদ্যে গড়ে ওঠে, তেমনি তার মূল্যবোধও পরিবারের আচার ও উপার্জনের সংস্কৃতি থেকে জন্ম নেয়।

আমরা প্রায়ই খাবারের উপাদান পরীক্ষা করি, কিন্তু উপার্জনের উপাদান পরীক্ষা করি না। অথচ সততার বাজারে সবচেয়ে মূল্যবান পণ্য হলো পরিষ্কার বিবেক।

একটি সমাজ তখনই সত্যিকার অর্থে উন্নত হয়, যখন সেখানে মানুষের সম্মান কেনাবেচা হয় না, বিচার বিক্রি হয় না, চাকরি পেতে ঘুষ লাগে না, ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে অবৈধ সুবিধা নিতে হয় না এবং ক্ষমতা মানুষের সেবার মাধ্যম হয়, শোষণের অস্ত্র নয়।

নিজেকে প্রশ্ন করুন। আমি যে অন্ন ঘরে নিয়ে যাচ্ছি, সেটি কি শুধু রান্নার দিক থেকে হালাল, নাকি উপার্জনের দিক থেকেও নির্মল? আমার সন্তানের মুখে যে আহার তুলে দিচ্ছি, তার প্রতিটি গ্রাসে কি আমার সততার স্বাক্ষর আছে?

সমাজ পরিবর্তনের শুরু কোনো বড় মঞ্চ থেকে নয়। শুরু হয় মানুষের অন্তর থেকে। শুরু হয় একটি সৎ সিদ্ধান্ত থেকে। শুরু হয় সেই মুহূর্তে, যখন মানুষ বলে, অন্যায় করে নয়, ন্যায়ের পথে থেকেই আমি আমার পরিবারের জন্য অন্ন সংগ্রহ করব।

হালাল জীবন কেবল খাদ্যের একটি তালিকা নয়। এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনদর্শন। যেখানে উপার্জন সৎ, আচরণ মানবিক, বিবেক জাগ্রত, মানুষের অধিকার নিরাপদ এবং আত্মা প্রশান্ত।

কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষকে পরিচিত করে তার থালার খাবার নয়, তার উপার্জনের সততা; তার পোশাক নয়, তার চরিত্র; তার সম্পদ নয়, তার ন্যায়পরায়ণতা।

যেদিন আমরা শুধু হালাল খাবার নয়, হালাল উপার্জন, হালাল চরিত্র এবং হালাল বিবেককে সমান গুরুত্ব দিতে শিখব, সেদিন পরিবার হবে আরও নিরাপদ, সমাজ হবে আরও ন্যায়ভিত্তিক এবং মানুষ সত্যিকার অর্থে মানুষ হয়ে উঠবে।

Ad