অশ্রুজলে জন্ম, অধ্যবসায়ে উত্থান: ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ সিঙ্গাপুর যেভাবে হয়ে উঠল বিশ্বের বিস্ময়

  • প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬, বিকাল ০৫:০৯
  • আপডেট: ২৯ অক্টোবর ২০২৬, বিকাল ০৫:০৯
Untitled Design (1)

যে দেশের প্রধানমন্ত্রী স্বাধীনতার দিনে ক্যামেরার সামনে কেঁদে ফেলেছিলেন, ছয় দশকের মধ্যে সেই দেশই কীভাবে পৌঁছাল বিশ্বের সবচেয়ে সমৃদ্ধ রাষ্ট্রের কাতারে? সাফল্যের গল্প, আর তার আড়ালের কঠিন প্রশ্নগুলো নিয়ে এই প্রতিবেদন।

সাধারণত স্বাধীনতার গল্প মানে সংগ্রাম, রক্ত আর মুক্তিকামী মানুষের বীরত্বগাথা। সিঙ্গাপুরের ইতিহাস এর ঠিক উল্টো। সেখানে কেউ স্বাধীনতার দাবিতে মিছিল করেনি। যে মালয়েশিয়া ফেডারেশনের অংশ হতে চেয়েছিল দ্বীপটি, সেখান থেকেই তাদের রাজনৈতিকভাবে বের করে দেওয়া হয়। এমন নজির বিশ্ব ইতিহাসে বিরল।

১৯৬৫ সালের ৯ আগস্ট সকালে মালয়েশিয়ার পার্লামেন্টে সিঙ্গাপুরকে ফেডারেশন থেকে আলাদা করার সংশোধনী পাস হয়। ভোট পড়েছিল ১২৬-০। বিরোধী সংসদ সদস্যদের অনেকেই সেদিন অধিবেশনে ছিলেন না। সেদিনই সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউ সংবাদ সম্মেলনে বিচ্ছেদের ঘোষণা দেন। টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারিত সেই সম্মেলনে তিনি আবেগ সামলাতে পারেননি। এক পর্যায়ে সাংবাদিকদের অনুরোধ করেন, কিছুক্ষণের জন্য ক্যামেরা বন্ধ রাখতে। বিরতির পর ফিরে এসে বলেন, এই চুক্তি স্বাক্ষরের মুহূর্তটি তাঁর জন্য বেদনার, কারণ সারা জীবন তিনি দুই অঞ্চলের একীভূত হওয়ায় বিশ্বাস করেছেন। (এই উদ্ধৃতি স্মৃতি থেকে ভাবানুবাদ করা। প্রকাশের আগে সরকারি আর্কাইভের মূল পাঠের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া ভালো।)

সেদিনের অশ্রু ছিল স্বাধীনতার আনন্দের নয়। এর পেছনে ছিল অনিশ্চয়তা, সম্পদহীনতা আর টিকে থাকার ভয়। অথচ ছয় দশকেরও কম সময়ে সেই দেশই বিশ্বের অন্যতম ধনী, দক্ষ ও সুশাসিত রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। মাথাপিছু আয় ১৯৬৫ সালের পাঁচ শ ডলারের কিছু বেশি থেকে বেড়ে এখন আশি হাজার ডলারের কাছাকাছি। কীভাবে হলো, সেটাই এই প্রতিবেদনের বিষয়।

এক নজরে: সিঙ্গাপুরের পথচলা

সাল ঘটনা

১৮১৯-স্যার স্ট্যামফোর্ড র‍্যাফলস ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পক্ষে বাণিজ্য-ঘাঁটি স্থাপন করেন

১৯৪২–৪৫-জাপানি দখলদারি

১৯৫৯-ব্রিটিশদের কাছ থেকে অভ্যন্তরীণ স্বায়ত্তশাসন; লি কুয়ান ইউ প্রধানমন্ত্রী

১৯৬২-গণভোটে প্রায় ৭১ শতাংশ ভোটার মালয়েশিয়ার সঙ্গে একীভূত হওয়ার পক্ষে রায় দেন

১৯৬৩-১৬ সেপ্টেম্বর মালয়েশিয়া ফেডারেশন গঠন

১৯৬৪-জুলাই ও সেপ্টেম্বরে জাতিগত দাঙ্গা

১৯৬৫-৯ আগস্ট স্বাধীনতা; সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সদস্যপদ

১৯৬৭-আসিয়ানের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, নিজস্ব মুদ্রা, বাধ্যতামূলক জাতীয় সেবা

১৯৭১-ব্রিটিশ সেনাঘাঁটি গুটিয়ে নেওয়ার সময়সীমা

১৯৯০-লি কুয়ান ইউ প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়েন; গোহ চক টং দায়িত্ব নেন

২০০৪-লি সিয়েন লুং প্রধানমন্ত্রী

২০২৪-লরেন্স ওং প্রধানমন্ত্রী

১. কেন ভাঙল ঐক্যের স্বপ্ন?

একীভূত হওয়ার পটভূমি। ১৯৫৯ সালে ব্রিটিশদের কাছ থেকে অভ্যন্তরীণ স্বায়ত্তশাসন পায় সিঙ্গাপুর। তখন প্রশ্ন ছিল, এই ক্ষুদ্র দ্বীপ একা টিকবে কীভাবে? উত্তর খোঁজা হয় মালয় উপদ্বীপের সঙ্গে মিলে যাওয়ার মধ্যে। ১৯৬২ সালের গণভোটে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটার এর পক্ষে রায় দেন। ১৯৬৩ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর মালয়া, সাবাহ ও সারাওয়াকের সঙ্গে মিলে গঠিত হয় ‘মালয়েশিয়া’। ক্ষুদ্র এই দ্বীপের জন্য ফেডারেশনে যোগ দেওয়া ছিল অস্তিত্বের প্রশ্ন। তখন:

• দেশে ব্যাপক বেকারত্ব ছিল, বেকারত্বের হার ছিল দুই অঙ্কের ঘরে।

• খনিজ বা কৃষিজমির মতো কোনো প্রাকৃতিক সম্পদ ছিল না।

• খাবার পানির বড় অংশ আসত জোহর থেকে।

• মালয়েশিয়ার বিস্তৃত বাজারই ছিল শিল্পায়নের একমাত্র ভরসা।

মতাদর্শের সংঘাত। একীভূত হওয়ার পর থেকেই দ্বন্দ্ব শুরু হয়। লি কুয়ান ইউ ও তাঁর পিপলস অ্যাকশন পার্টি (পিএপি) চেয়েছিল ‘মালয়েশিয়ান মালয়েশিয়া’, যেখানে জাতিগত পরিচয় নির্বিশেষে চীনা, মালয়, তামিল সবার সমান অধিকার থাকবে। অন্যদিকে কুয়ালালামপুরের শাসকগোষ্ঠী, বিশেষ করে টুঙ্কু আবদুর রহমানের ইউএমএনও, মালয় জনগোষ্ঠীর বিশেষ সাংবিধানিক অধিকার ও অগ্রাধিকার ধরে রাখতে বদ্ধপরিকর ছিল। সিঙ্গাপুরের জনসংখ্যার প্রায় তিন-চতুর্থাংশ চীনা বংশোদ্ভূত হওয়ায় এই দাবি তাদের কাছে হুমকি মনে হয়েছিল। পিএপি মালয়ার মূল ভূখণ্ডের নির্বাচনেও প্রার্থী দিলে অবিশ্বাস আরও গভীর হয়।

অর্থনৈতিক টানাপোড়েন। রাজস্ব বণ্টন নিয়েও বিরোধ ছিল। অভিন্ন বাজার গঠনের যে প্রতিশ্রুতি ছিল, তা বাস্তবে এগোয়নি। দুই সরকারের মধ্যে অবিশ্বাস বাড়তে থাকে। এর মধ্যে ইন্দোনেশিয়ার ‘কনফ্রন্টাশন’ বা সংঘাত-নীতির চাপ আর ১৯৬৫ সালের মার্চে ম্যাকডোনাল্ড হাউসে বোমা হামলার মতো ঘটনা পুরো অঞ্চলকেই অস্থির করে রেখেছিল।

জাতিগত সহিংসতা। ১৯৬৪ সালে সিঙ্গাপুরে দুই দফায় (জুলাই ও সেপ্টেম্বরে) মালয় ও চীনা সম্প্রদায়ের মধ্যে রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা হয়। জুলাইয়ের দাঙ্গা শুরু হয়েছিল মহানবী (সা.)-এর জন্মদিনের শোভাযাত্রাকে কেন্দ্র করে। প্রাণহানি ও আহতের ঘটনা দুই সরকারের সম্পর্ককে আরও তিক্ত করে। এই স্মৃতি সিঙ্গাপুরের জাতীয় মানসে আজও গভীর ছাপ রেখে গেছে, আর জাতিগত সম্প্রীতি রক্ষায় রাষ্ট্রের অতি-সতর্কতার একটি ব্যাখ্যা এখান থেকেই পাওয়া যায়।

পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছায় যে ফেডারেশন ধরে রাখার চেয়ে সম্ভাব্য সহিংসতা এড়ানোকেই গুরুত্ব দেয় কুয়ালালামপুর। ফলে ১৯৬৫ সালের ৯ আগস্ট, নিজেদের ইচ্ছার বিরুদ্ধেই, স্বাধীন হতে হয় সিঙ্গাপুরকে।

২. স্বাধীনতার প্রথম দিনগুলো: শূন্য হাতে যুদ্ধ

স্বাধীনতার সময় সিঙ্গাপুরের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ১৯ লাখ (এখন প্রায় ৬০ লাখ)। মাথাপিছু আয় ছিল মাত্র পাঁচ শ ডলারের কিছু বেশি। ছিল না নিজস্ব সেনাবাহিনী, ছিল না প্রাকৃতিক সম্পদ। বেকারত্ব ছিল ব্যাপক। শহরের বড় অংশ থাকত ঘিঞ্জি বস্তি ও কাঠের কুঁড়েঘরে। পানি ও খাদ্যের জন্য প্রতিবেশীর ওপর নির্ভরতা ছিল পুরোপুরি। এর মধ্যে ১৯৬৮ সালে ব্রিটেন ঘোষণা করে, তারা ১৯৭১ সালের মধ্যে সিঙ্গাপুর থেকে সেনাঘাঁটি গুটিয়ে নেবে। অথচ ওই ঘাঁটিগুলো থেকেই দেশের জিডিপির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আসত।

এই অবস্থায় লি কুয়ান ইউ এবং তাঁর অর্থমন্ত্রী গোহ কেং সুই, পাশাপাশি এস. রাজারত্নম, তো চিন চাই ও দেবান নায়ারের মতো ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা সিদ্ধান্ত নেন, বিশ্বকে এমন কিছু দিতে হবে যা অন্য কেউ দিচ্ছে না। লি পরে তাঁর স্মৃতিকথার নাম রাখেন From Third World to First, যা এই যাত্রার সারকথা।

ক) দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স

দুর্নীতি দমন সংস্থা সিপিআইবি (Corrupt Practices Investigation Bureau) ঔপনিবেশিক আমলেই, ১৯৫২ সালে, গঠিত হয়েছিল। তবে স্বাধীনতার পর এটিকে কার্যত ক্ষমতাবান ও স্বাধীন করা হয় এবং ১৯৬০ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন আরও কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হয়। সরকারি কর্মকর্তা ও মন্ত্রীদের বেতন বেসরকারি খাতের সঙ্গে তুলনীয় করা হয়, যাতে সেরা মেধা সরকারি সেবায় আসে এবং ঘুষের প্রলোভন কমে। শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনা হয়। ফল হিসেবে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতি ধারণা সূচকে সিঙ্গাপুর বছরের পর বছর বিশ্বের শীর্ষ কয়েকটি দেশের মধ্যে থেকেছে। সমালোচকেরা অবশ্য মন্ত্রীদের অত্যন্ত উচ্চ বেতনকে ‘ব্যয়বহুল সরকার’ বলে প্রশ্ন তোলেন।

খ) বিদেশি বিনিয়োগ ও শিল্পায়ন

নিজস্ব বাজার ছোট বলে সিঙ্গাপুর তাকাল বিশ্ববাজারের দিকে। জাতিসংঘের ডাচ অর্থনীতিবিদ আলবার্ট উইনসিমিয়াসের পরামর্শ এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে। ১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠিত অর্থনৈতিক উন্নয়ন বোর্ড (EDB) বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে কর ছাড়, দ্রুত লাইসেন্স ও অবকাঠামোগত সুবিধা দিয়ে আকৃষ্ট করে। জুরং শিল্পাঞ্চল গড়ে ওঠে। ১৯৬৮ সালে টেক্সাস ইনস্ট্রুমেন্টস সেমিকন্ডাক্টর কারখানা বসায়, যা ইলেকট্রনিক্স শিল্পের সূচনা করে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে শ্রম আইন সংস্কার করা হয় এবং শ্রমিক, মালিক ও সরকারের ত্রিপক্ষীয় সমঝোতার কাঠামো গড়া হয়।

শ্রমঘন শিল্প দিয়ে শুরু হয়ে অর্থনীতি ধাপে ধাপে ইলেকট্রনিক্স, পেট্রোকেমিক্যাল, আর্থিক সেবা ও জৈবপ্রযুক্তির দিকে সরে যায়। ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে সিঙ্গাপুর বন্দর ও বিমানবন্দর (চাঙ্গি) আধুনিক করে। সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনস আত্মপ্রকাশ করে ১৯৭২ সালে, আর চাঙ্গি বিমানবন্দর চালু হয় ১৯৮১ সালে। সিঙ্গাপুর বন্দর এখন বিশ্বের ব্যস্ততম ট্রান্সশিপমেন্ট কেন্দ্রগুলোর একটি।

গ) আবাসন ও জাতীয় ঐক্য

১৯৬০ সালে গঠিত হাউজিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বোর্ড (HDB) বস্তি উচ্ছেদ করে বহুতল সরকারি আবাসন নির্মাণ করে। আজ প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ এইচডিবি ফ্ল্যাটে থাকেন, আর প্রায় ৯০ শতাংশ পরিবারের নিজস্ব বাড়ির মালিকানা আছে। ১৯৫৫ সালে প্রতিষ্ঠিত সেন্ট্রাল প্রভিডেন্ট ফান্ডের (সিপিএফ) জমানো অবসর তহবিল দিয়ে নাগরিকেরা বাড়ি কেনার সুযোগ পান। ১৯৮৯ সাল থেকে চালু ‘এথনিক ইন্টিগ্রেশন পলিসি’র আওতায় প্রতিটি ভবনে চীনা, মালয়, ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের জন্য নির্দিষ্ট অনুপাত রাখা হয়, যাতে একই জনগোষ্ঠী এক জায়গায় ঘেটো তৈরি না করে।

ঘ) শিক্ষা ও ভাষানীতি

সম্পদ না থাকায় মানুষই হয়ে ওঠে প্রধান পুঁজি। ইংরেজিকে কর্মভাষা করা হয়, আবার মাতৃভাষা (মান্দারিন, মালয়, তামিল) শেখার সুযোগও রাখা হয়। এই দ্বিভাষিক নীতি একদিকে বৈশ্বিক বাণিজ্যে সিঙ্গাপুরিদের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা দেয়, অন্যদিকে ইংরেজিকে নিরপেক্ষ ভাষা হিসেবে ব্যবহার করে জাতিগত সংঘাত কমায়। প্রযুক্তি ও কারিগরি শিক্ষায় বিশেষ জোর দেওয়া হয়, আর ইনস্টিটিউট অব টেকনিক্যাল এডুকেশনের মতো প্রতিষ্ঠান দক্ষ কর্মীবাহিনী গড়ে তোলে। আন্তর্জাতিক মূল্যায়নে সিঙ্গাপুরের শিক্ষার্থীরা গণিত ও বিজ্ঞানে নিয়মিত শীর্ষ স্তরে থাকে। তবে অতিরিক্ত পরীক্ষা-চাপ ও প্রাইভেট টিউশনের সংস্কৃতি নিয়েও দেশটিতে বিতর্ক আছে।

ঙ) প্রতিরক্ষা

১৯৬৭ সালে বাধ্যতামূলক জাতীয় সেবা (National Service) চালু হয়। এভাবে অল্প জনসংখ্যা নিয়েই একটি সংগঠিত প্রতিরক্ষা বাহিনী গড়ে ওঠে। পুরুষ নাগরিকদের এই সেবা একই সঙ্গে ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর তরুণদের এক ছাতার নিচে এনে জাতীয় পরিচয় গড়তেও ভূমিকা রাখে।

চ) সবুজ নগরী ও স্বাস্থ্য

১৯৬০-এর দশকের শেষ থেকে ‘গার্ডেন সিটি’ ধারণা নিয়ে ব্যাপক বৃক্ষরোপণ শুরু হয়, কারণ লির বিশ্বাস ছিল পরিচ্ছন্ন ও সবুজ শহর বিনিয়োগকারীদের কাছে দেশের ভাবমূর্তি বদলে দেবে। ১৯৮৪ সালে চালু হয় ‘মেডিসেভ’, যেখানে প্রত্যেকে নিজের আয়ের একটি অংশ জমিয়ে চিকিৎসা ব্যয় মেটান। সরকারি ভর্তুকি ও ব্যক্তিগত সঞ্চয়ের এই মিশ্রণে স্বাস্থ্যব্যয় তুলনামূলক কম রেখেও গড় আয়ু বিশ্বের শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

৩. পানির সংকট: নিউওয়াটারের গল্প

সিঙ্গাপুরের সবচেয়ে বড় দুর্বলতাগুলোর একটি ছিল পানি। ১৯৬১ ও ১৯৬২ সালের দুটি চুক্তির মাধ্যমে জোহর থেকে পানি কেনা হতো। প্রথম চুক্তির মেয়াদ ২০১১ সালে শেষ হয়েছে, দ্বিতীয়টির মেয়াদ ২০৬১ সাল পর্যন্ত। প্রতিবেশীর ওপর এই নির্ভরতা দেশের জন্য কৌশলগত ঝুঁকি ছিল, আর দুই দেশের মধ্যে পানির দাম নিয়ে দর-কষাকষি বহুবার উত্তেজনা তৈরি করেছে। তাই সরকার ‘ফোর ন্যাশনাল ট্যাপস’ কৌশল নেয়: বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, আমদানি, সমুদ্রের পানি লবণমুক্ত করা এবং ব্যবহৃত পানি পুনর্ব্যবহার।

বৃষ্টির পানি ধরে রাখতে নদীর মুখে বাঁধ দিয়ে তৈরি হয়েছে মেরিনা ব্যারাজ (২০০৮), যা শহরের কেন্দ্রে একটি বিশাল স্বাদু পানির জলাধার। এই পুনর্ব্যবহৃত পানিই ‘নিউওয়াটার’ নামে পরিচিত। ২০০৩ সাল থেকে এর বাণিজ্যিক ব্যবহার শুরু হয়, আর এখন এটি দেশের পানির চাহিদার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ মেটায়। পানির বিষয়ে এই আত্মনির্ভরতার চেষ্টা সিঙ্গাপুরের বাস্তবমুখী নীতির উদাহরণ।

৪. সাংবাদিকের চোখে সাফল্যের তিন অনুঘটক

১. বাস্তবমুখী নেতৃত্ব। লি কুয়ান ইউ নিজে কোনো আদর্শিক খোপে বন্দি থাকেননি। যা কাজ করে, তা-ই নিয়েছেন, সেটা পুঁজিবাদী বাজারনীতি হোক বা রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ। রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ সংস্থা টেমাসেক (১৯৭৪) ও জিআইসি (১৯৮১) এই মিশ্র কৌশলেরই ফল। সিঙ্গাপুর নীতি নেওয়ার আগে অন্য দেশের অভিজ্ঞতা খুঁটিয়ে দেখত এবং ভুল বুঝলে দ্রুত সংশোধন করত।

২. মানবসম্পদে বিনিয়োগ। শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও স্বাস্থ্যে ধারাবাহিক ব্যয়। মেধাভিত্তিক নিয়োগ ও পদোন্নতির সংস্কৃতিও এর অংশ। মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি দিয়ে সরকারি সেবায় আনার ব্যবস্থা প্রশাসনের মান ধরে রেখেছে।

৩. দক্ষ প্রশাসন ও কঠোর আইন প্রয়োগ। আইনশৃঙ্খলা ও পরিচ্ছন্নতা নিয়ে কড়া বিধিনিষেধ সিঙ্গাপুরকে বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন নগরে পরিণত করেছে। ১৯৯২ সালে চুইংগাম বিক্রি নিষিদ্ধ করা কিংবা ১৯৯৪ সালে মার্কিন কিশোর মাইকেল ফে-র বেত্রাঘাতের ঘটনা বিশ্বজুড়ে আলোচিত হয়েছিল। বিনিয়োগকারীরা এই পূর্বানুমেয়তাকে মূল্য দেন।

৫. যে প্রশ্নগুলো এড়ানো যায় না

একজন সাংবাদিক হিসেবে এই সাফল্যের গল্পের অন্য দিকটিও উল্লেখ করা জরুরি।

• পিএপি স্বাধীনতার পর থেকে একটানা ক্ষমতায় রয়েছে। ২০২৫ সালের নির্বাচনেও দলটি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে, তবে বিরোধী দলের জন্য প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র অসমান বলে সমালোচকেরা মনে করেন। নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ ও গণমাধ্যমের প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।

• রাজনৈতিক মতপ্রকাশ, গণমাধ্যম ও সমাবেশের ওপর নানা বিধিনিষেধ আছে। অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা আইনে (ISA) বিনা বিচারে আটকের নজির আছে, যেমন ১৯৬৩ সালের ‘অপারেশন কোল্ডস্টোর’। সাংবাদিকদের আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোর গণমাধ্যম স্বাধীনতা সূচকে সিঙ্গাপুর অর্থনৈতিক সাফল্যের তুলনায় অনেক নিচে।

• মৃত্যুদণ্ড ও বেত্রাঘাতের মতো কঠোর শাস্তি মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সমালোচনার মুখে পড়েছে। মাদকসংক্রান্ত অপরাধে বাধ্যতামূলক মৃত্যুদণ্ড বিশেষভাবে বিতর্কিত।

• সাম্প্রতিক বছরে ধনী-গরিব বৈষম্য, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং প্রবাসী শ্রমিকদের অবস্থা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। ২০২০ সালে করোনা মহামারির সময় শ্রমিক ডরমিটরিগুলোতে সংক্রমণের ব্যাপক বিস্তার সেই বিতর্ককে সামনে এনেছিল। এই শ্রমিকদের একটি বড় অংশ বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়া থেকে যাওয়া।

সমর্থকেরা বলেন, নাগরিক স্বাধীনতার সীমা থাকলেও এর বিনিময়ে স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন ও নিরাপত্তা এসেছে। সমালোচকেরা বলেন, উন্নয়নের জন্য স্বাধীনতার মূল্য দিতে হওয়া উচিত ছিল না। এই বিতর্কের সহজ মীমাংসা নেই।

বাংলাদেশের জন্য কী শেখার আছে?

সিঙ্গাপুরের মডেল হুবহু নকল করা যায় না। এটি ছিল ক্ষুদ্র নগর-রাষ্ট্র, যেখানে কৃষিনির্ভর বিশাল গ্রামীণ জনপদ ছিল না, আর বাংলাদেশের জনসংখ্যা ও ভৌগোলিক বাস্তবতা একেবারেই আলাদা। তবু কিছু শিক্ষা সর্বজনীন: দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যতিক্রমহীন আইন প্রয়োগ, দক্ষ ও স্বাধীন প্রশাসন, বিনিয়োগবান্ধব ও পূর্বানুমেয় নীতি, মানবসম্পদে ধারাবাহিক বিনিয়োগ এবং জাতিগত-ধর্মীয় বৈচিত্র্যকে ঐক্যের শক্তিতে রূপ দেওয়ার চেষ্টা।


১৯৬৫ সালে অনেকেই সন্দেহ করেছিলেন, এই ক্ষুদ্র দ্বীপ আদৌ টিকে থাকতে পারবে কি না। আজ সিঙ্গাপুরের মাথাপিছু আয় বিশ্বের শীর্ষ স্তরের মধ্যে, আর এটি বৈশ্বিক অর্থ, বাণিজ্য ও পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। যে স্বাধীনতা একসময় ছিল ‘অনাকাঙ্ক্ষিত বিচ্ছেদ’, সময়ের সঙ্গে সেটাই হয়ে উঠেছে নিজের ভাগ্য নিজে গড়ার সুযোগ। ২০১৫ সালে লি কুয়ান ইউর মৃত্যুর পরও এই দেশের সাফল্য বিশ্বের উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোর জন্য একটি পাঠ্যপুস্তকের মতো। তবে সেখান থেকে কী নেওয়া যায় আর কী যায় না, তা প্রতিটি দেশকে নিজের বাস্তবতায় বিচার করতে হবে।


লেখক: ইমদাদুল হক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট

Ad