এক ভূখণ্ডের তিন অধ্যায়: বঙ্গভঙ্গ, দেশভাগ ও বাংলাদেশের জন্ম

  • প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৬, বিকাল ০৬:২৮
  • আপডেট: ১৫ অক্টোবর ২০২৬, বিকাল ০৬:২৮
বঙ্গভঙ্গ থেকে বাংলাদেশের অভ্যুদয় (2)

১৯০৫ থেকে ১৯৭১—রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, ব্যর্থ সমঝোতা ও বাঙালির স্বাধীনতার পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস

লেখকঃ ইমদাদুল হক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট


ভারতবর্ষ একসময় ব্রিটিশ শাসনের অধীনে ছিল। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটে। কিন্তু স্বাধীনতার মুহূর্তে উপমহাদেশ বিভক্ত হয় ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি রাষ্ট্রে। পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় অংশ পূর্ববাংলা পরবর্তী সময়ে পূর্ব পাকিস্তান নামে পরিচিত হয়। সেই পূর্ব পাকিস্তানই ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। প্রশ্ন হলো, কী কারণে অখণ্ড ভারত ভাগ হলো? কেন ব্যর্থ হলো একসঙ্গে স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের উদ্যোগ? আর কোন রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো এই বিভাজনকে ত্বরান্বিত করেছিল?এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে ফিরে তাকাতে হবে ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ, ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ, সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিকাশ, ১৯৪৬ সালের ক্যাবিনেট মিশন পরিকল্পনা এবং ১৯৪৭ সালের দেশভাগের দিকে। এসব ঘটনা পর্যালোচনা করলে বোঝা যায়, ভারতভাগ কোনো একক সিদ্ধান্তের ফল ছিল না; বরং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিরোধ, পারস্পরিক অবিশ্বাস ও সাংবিধানিক সমঝোতার ব্যর্থতা এর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

বঙ্গভঙ্গ: পূর্ববাংলার প্রত্যাশা ও বিরোধিতার রাজনীতি

১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর ব্রিটিশ ভাইসরয় লর্ড কার্জনের উদ্যোগে বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হয়। এর মাধ্যমে পূর্ববাংলা ও আসামকে নিয়ে নতুন প্রদেশ গঠন করা হয়, যার রাজধানী ছিল ঢাকা। ব্রিটিশ সরকারের যুক্তি ছিল, বিশাল বাংলা প্রেসিডেন্সির প্রশাসনিক কার্যক্রম সহজ করা এবং পূর্বাঞ্চলের উন্নয়নের সুযোগ বাড়ানো।পূর্ববাংলার মুসলমানদের একটি অংশ নতুন প্রদেশকে ইতিবাচকভাবে দেখেছিলেন। তাঁদের প্রত্যাশা ছিল, ঢাকা প্রশাসনিক কেন্দ্র হওয়ায় শিক্ষা, চাকরি, যোগাযোগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। দীর্ঘদিনের অবহেলা কাটিয়ে পূর্বাঞ্চলের উন্নয়নের পথ প্রশস্ত হবে—এমন আশাও তৈরি হয়েছিল।

অন্যদিকে বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করেন কলকাতাকেন্দ্রিক শিক্ষিত মধ্যবিত্ত, রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও ব্যবসায়ী সমাজের বড় একটি অংশ। তাঁদের কাছে এই সিদ্ধান্ত ছিল বাংলার ঐক্য ও রাজনৈতিক প্রভাব খর্ব করার প্রচেষ্টা। শুরু হয় বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলন, স্বদেশি কর্মসূচি এবং ব্রিটিশ পণ্য বর্জনের প্রচারণা। আন্দোলনের কিছু অংশ পরবর্তী সময়ে বিপ্লবী সহিংসতার পথেও এগিয়ে যায়।তবে বঙ্গভঙ্গকে শুধু হিন্দু-মুসলমানের বিরোধ হিসেবে দেখলে ইতিহাসের পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে না। এর সঙ্গে প্রশাসনিক সুবিধা, অর্থনৈতিক স্বার্থ, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও ব্রিটিশদের ঔপনিবেশিক কৌশল জড়িয়ে ছিল। দুই সম্প্রদায়ের মধ্যেও বঙ্গভঙ্গের পক্ষে-বিপক্ষে ভিন্নমত ছিল।

১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ: আস্থার সংকটের সূচনা

দীর্ঘ আন্দোলনের পর ১৯১১ সালের ১২ ডিসেম্বর দিল্লি দরবারে বঙ্গভঙ্গ রদের ঘোষণা দেওয়া হয়। পরবর্তী প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসে বাংলা পুনর্গঠিত হয় এবং বিহার ও উড়িষ্যা পৃথক প্রদেশে পরিণত হয়।বঙ্গভঙ্গ রদের সিদ্ধান্ত পূর্ববাংলার বহু মুসলমানের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করে। তাঁদের একাংশ মনে করেছিলেন, নতুন প্রদেশের মাধ্যমে উন্নয়ন ও প্রশাসনিক প্রতিনিধিত্বের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তা রাজনৈতিক আন্দোলনের চাপে বন্ধ হয়ে গেল। অন্যদিকে বঙ্গভঙ্গবিরোধীরা এটিকে বাংলার ঐক্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিজয় হিসেবে দেখেন।এই ঘটনার রাজনৈতিক তাৎপর্য ছিল সুদূরপ্রসারী। ১৯০৬ সালে ঢাকায় সর্বভারতীয় মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা এবং ১৯০৯ সালের মর্লে-মিন্টো সংস্কারের মাধ্যমে পৃথক নির্বাচকমণ্ডলীর ব্যবস্থা চালু হওয়া ধর্মীয় পরিচয়ভিত্তিক রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়।তবে বঙ্গভঙ্গ রদই ভারতভাগের একমাত্র কারণ—এমন সিদ্ধান্ত ইতিহাসসম্মত নয়। বরং এই ঘটনা পরবর্তী রাজনৈতিক অবিশ্বাস ও প্রতিনিধিত্বের সংকট বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়।

সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও স্বাধীনতার প্রশ্ন

১৯৪০-এর দশকে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ক্রমেই অনিবার্য হয়ে ওঠে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটেনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দুর্বলতা এবং ভারতের স্বাধীনতার দাবির মুখে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রশ্ন সামনে আসে।কিন্তু স্বাধীন ভারতের রাষ্ট্রকাঠামো কেমন হবে, কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে কতটা ক্ষমতা থাকবে এবং মুসলমানদের রাজনৈতিক নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে—এসব প্রশ্নে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে মতপার্থক্য তীব্র হয়।মুসলিম লীগের নেতৃত্বে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ মুসলমানদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক স্বার্থ ও নিরাপত্তার প্রশ্ন সামনে আনেন। অন্যদিকে কংগ্রেস একটি সর্বভারতীয় রাষ্ট্র ও শক্তিশালী কেন্দ্রীয় কাঠামোর পক্ষে অবস্থান নেয়। উভয় দলের মধ্যেই বিভিন্ন মত থাকলেও শেষ পর্যন্ত পারস্পরিক আস্থার সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি।এই বিরোধের মধ্যেই ১৯৪৬ সালে অখণ্ড ভারত বজায় রেখে ক্ষমতা হস্তান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেয় ব্রিটিশ সরকার।

ক্যাবিনেট মিশন পরিকল্পনা: অখণ্ড ভারত রক্ষার শেষ সুযোগ?

১৯৪৬ সালের মার্চে ব্রিটিশ সরকার লর্ড প্যাথিক-লরেন্স, স্যার স্ট্যাফোর্ড ক্রিপস ও এ. ভি. আলেকজান্ডারকে নিয়ে ক্যাবিনেট মিশন ভারতে পাঠায়। ১৬ মে ঘোষিত পরিকল্পনায় একটি ভারতীয় ইউনিয়ন গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্রনীতি ও যোগাযোগের মতো সীমিত বিষয় কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে রেখে অন্যান্য ক্ষেত্রে প্রদেশ ও প্রাদেশিক গ্রুপগুলোর ব্যাপক ক্ষমতা রাখার কথা বলা হয়েছিল।পরিকল্পনায় প্রদেশগুলোকে তিনটি গ্রুপে ভাগ করার প্রস্তাব ছিল। ‘এ’ গ্রুপে প্রধানত হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশগুলো, ‘বি’ গ্রুপে উত্তর-পশ্চিমের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশগুলো এবং ‘সি’ গ্রুপে বাংলা ও আসামকে রাখার কথা বলা হয়।এই কাঠামোর মাধ্যমে অখণ্ড ভারত বজায় রেখে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলোর স্বায়ত্তশাসনের দাবি মেটানোর একটি সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। মুসলিম লীগ ও কংগ্রেস উভয় পক্ষই পরিকল্পনার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনায় অংশ নেয়। কিন্তু প্রাদেশিক গ্রুপিং বাধ্যতামূলক হবে কি না, কেন্দ্রীয় গণপরিষদের ক্ষমতা কতটা থাকবে এবং ভবিষ্যতে প্রদেশগুলোর অবস্থান কী হবে—এসব প্রশ্নে মতবিরোধ দেখা দেয়।১৯৪৬ সালের জুলাইয়ে কংগ্রেসের সভাপতি জওহরলাল নেহরুর বক্তব্যের পর পরিকল্পনার ব্যাখ্যা ও বাস্তবায়ন নিয়ে বিরোধ আরও তীব্র হয়। মুসলিম লীগ কংগ্রেসের অবস্থানকে পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ শর্ত থেকে সরে যাওয়ার ইঙ্গিত হিসেবে দেখে। পরবর্তী সময়ে লীগ পরিকল্পনার প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করে।ক্যাবিনেট মিশন পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ার জন্য শুধু নেহরু, জিন্নাহ কিংবা অন্য কোনো একজন নেতাকে দায়ী করা যথেষ্ট নয়। কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে ক্ষমতা বণ্টনের বিরোধ, পরিকল্পনার অস্পষ্টতা, পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং ব্রিটিশ সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত—সবকিছুই এর সঙ্গে যুক্ত ছিল।তবে এটিও সত্য, পরিকল্পনাটি কার্যকর হলে অখণ্ড ভারত বজায় রাখার একটি সাংবিধানিক সম্ভাবনা অন্তত তৈরি হতে পারত। সেই সম্ভাবনা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি।

ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে ও সাম্প্রদায়িক সহিংসতা

ক্যাবিনেট মিশন পরিকল্পনা নিয়ে বিরোধের পর মুসলিম লীগ ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’ পালন করে। কলকাতায় এ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। কয়েক দিন ধরে চলা সহিংসতায় হিন্দু ও মুসলমান—উভয় সম্প্রদায়ের বহু মানুষ নিহত হন। অসংখ্য মানুষ আহত হন এবং ঘরবাড়ি ও সম্পদ হারান।এরপর নোয়াখালী, বিহার ও পাঞ্জাবসহ বিভিন্ন অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে। রাজনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনা সংকুচিত হতে থাকে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ে।এই ঘটনাগুলো দেশভাগের পক্ষে রাজনৈতিক যুক্তিকে শক্তিশালী করেছিল। তবে দাঙ্গার দায় নির্ধারণে রাজনৈতিক নেতৃত্ব, প্রশাসনের ভূমিকা, উসকানি ও সহিংসতার ধারাবাহিকতা—সবকিছু বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। কোনো সম্প্রদায়ের কিছু মানুষের অপরাধের দায় পুরো সম্প্রদায়ের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ইতিহাসের নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ হতে পারে না।

১৯৪৭ সালের দেশভাগ: রাজনৈতিক সমঝোতার ব্যর্থ পরিণতি

১৯৪৭ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লিমেন্ট অ্যাটলি ঘোষণা করেন, ব্রিটিশ সরকার ১৯৪৮ সালের জুনের মধ্যে ভারতে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে। পরে ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় এগিয়ে আনেন। ৩ জুন ভারত ভাগের পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়।ভারতীয় স্বাধীনতা আইনের মাধ্যমে ভারত ও পাকিস্তান দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় অংশ পূর্ববঙ্গ নামে পরিচিত হয়। এর মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটলেও উপমহাদেশে নতুন সীমান্ত, বাস্তুচ্যুতি ও সাম্প্রদায়িক সহিংসতার এক গভীর সংকট তৈরি হয়।দেশভাগের পেছনে কংগ্রেসের শক্তিশালী কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষা, মুসলিম লীগের পৃথক রাষ্ট্রের দাবি, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ, সাংবিধানিক সমঝোতার ব্যর্থতা এবং ব্রিটিশ সরকারের দ্রুত ক্ষমতা হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।সুতরাং ভারতভাগের ইতিহাসকে শুধু একটি দলের ষড়যন্ত্র কিংবা একজন নেতার সিদ্ধান্তের ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায় না। বরং একাধিক রাজনৈতিক শক্তির বিরোধ ও ব্যর্থতার সম্মিলিত পরিণতি হিসেবেই ঘটনাটিকে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

র‍্যাডক্লিফের সীমানা ও বাংলার বিভাজন

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারতের বাংলা ও পাঞ্জাবের সীমানা নির্ধারণের দায়িত্ব দেওয়া হয় ব্রিটিশ আইনজীবী সিরিল র‍্যাডক্লিফকে। অল্প সময়ের মধ্যে তাঁকে বিপুল জনসংখ্যা, ধর্মীয় বিন্যাস, ভৌগোলিক সংযোগ ও প্রশাসনিক বাস্তবতা বিবেচনায় সীমানা নির্ধারণ করতে হয়।সীমানা নির্ধারণের ফল প্রকাশ করা হয় ১৯৪৭ সালের ১৭ আগস্ট, ভারত ও পাকিস্তানের স্বাধীনতার পর। ফলে অনেক মানুষ স্বাধীনতার পরও অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিলেন—তাঁদের এলাকা কোন রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।কলকাতা, মুর্শিদাবাদ, মালদহ ও সিলেট-সংলগ্ন অঞ্চলের সীমানা নির্ধারণ নিয়ে নানা বিতর্ক রয়েছে। এসব সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক প্রভাব বা গোপন হস্তক্ষেপের অভিযোগ মূল্যায়নের ক্ষেত্রে প্রামাণ্য দলিল ও ঐতিহাসিক গবেষণা জরুরি। অনুমানকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করলে ইতিহাসের প্রকৃত চিত্র আড়াল হতে পারে।দেশভাগে লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হন, পরিবার বিচ্ছিন্ন হয় এবং অসংখ্য মানুষের জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। স্বাধীনতার আনন্দের সঙ্গে তাই জড়িয়ে থাকে গভীর মানবিক বেদনা।


১৯৪৭ থেকে ১৯৭১: পূর্ববাংলা কেন স্বাধীন হলো?

১৯৪৭ সালে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হলেও পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে ভৌগোলিক দূরত্ব, ভাষা, সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বড় পার্থক্য ছিল। পশ্চিম পাকিস্তানকেন্দ্রিক ক্ষমতাকাঠামোর বিরুদ্ধে পূর্ববাংলায় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের অভিযোগ ক্রমে জোরালো হয়।১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন বাঙালির ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে নতুন মাত্রা দেয়। এরপর স্বায়ত্তশাসনের দাবি, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা, ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান এবং ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংকটকে গভীর করে।১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে অচলাবস্থা তৈরি হয়। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর অভিযান এবং বাঙালির প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ বিজয় অর্জন করে।অর্থাৎ ১৯৪৭ সালের দেশভাগ এবং ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরস্পর সম্পর্কিত হলেও পৃথক ঐতিহাসিক ঘটনা। প্রথমটি ব্রিটিশ ভারতের বিভাজনের মধ্য দিয়ে ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের সৃষ্টি; দ্বিতীয়টি ছিল পাকিস্তানি রাষ্ট্রকাঠামোর বৈষম্য ও দমননীতির বিরুদ্ধে বাঙালির স্বাধীনতার সংগ্রামের পরিণতি।


ইতিহাসের দায় নির্ধারণে প্রয়োজন নিরপেক্ষ অনুসন্ধান

ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন রাজনৈতিক পক্ষগুলো নিজেদের সাফল্যকে বড় করে দেখায় এবং ব্যর্থতার দায় অন্যের ওপর চাপিয়ে দেয়। একইভাবে কোনো সম্প্রদায়ের অবদান অস্বীকার করা কিংবা অন্য সম্প্রদায়কে সামগ্রিকভাবে দায়ী করাও ইতিহাসচর্চার পরিপন্থী।

বঙ্গভঙ্গ রদে পূর্ববাংলার মুসলমানদের একাংশের হতাশা ছিল বাস্তব। ক্যাবিনেট মিশন পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ায় অখণ্ড ভারত বজায় রাখার একটি সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায়। ১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক সহিংসতা দেশভাগের রাজনৈতিক পরিবেশকে আরও জটিল করে তোলে। কিন্তু এসব ঘটনার ব্যাখ্যায় প্রমাণ, দলিল ও নির্ভরযোগ্য গবেষণাকে গুরুত্ব দিতে হবে।বাংলাদেশের ইতিহাস বুঝতে হলে ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ থেকে শুরু করে ১৯৪৭ সালের দেশভাগ এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত ধারাবাহিক ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। কোনো একটি সময়কালকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণ পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়।ইতিহাস কোনো রাজনৈতিক দলের একক সম্পত্তি নয়। রাজনৈতিক নেতা ও ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করা যেমন প্রয়োজন, তেমনি তাঁদের ভূমিকা মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও তথ্যনির্ভর হতে হবে।একটি জাতি তখনই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে পারে, যখন সে নিজের সাফল্যের পাশাপাশি ভুল, ব্যর্থতা ও বিতর্কিত অধ্যায়গুলোকেও খোলামনে পর্যালোচনা করতে পারে। অতীতের ঘটনাগুলো নিয়ে প্রশ্ন তোলা মানে ইতিহাসকে অস্বীকার করা নয়; বরং ইতিহাসের আরও গভীরে যাওয়ার চেষ্টা।


ইতিহাসকে আবেগের জায়গায় বন্দি না রেখে তথ্য, যুক্তি ও প্রমাণের আলোকে বিশ্লেষণ করাই হওয়া উচিত আমাদের লক্ষ্য। কারণ, অতীতের ভুল ও ব্যর্থতা বুঝতে না পারলে ভবিষ্যতের জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়াও কঠিন।

Ad