ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিমদের থেকে বেলুচদের ইতিহাস ও পরিচিতি কেন আলাদা?

  • প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬, রাত ১০:২৭
  • আপডেট: ২২ জুলাই ২০২৬, রাত ১০:২৭
1000248005

লেখকঃ ইমদাদুল হক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট

​দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস, রাজনীতি ও সমাজব্যবস্থা নিয়ে আলোচনার সময় পুরো অঞ্চলকে একটি সাধারণ ভূ-রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার প্রবণতা দেখা যায়। তবে উপমহাদেশের মূলধারার মুসলিম জনগোষ্ঠীর সাথে বেলুচদের ইতিহাস, জাতিগত পরিচয়, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বের গভীর ও মৌলিক পার্থক্য বিদ্যমান।

​১. ভৌগোলিক অবস্থান ও ঐতিহাসিক বলয়

​উপমহাদেশের ইতিহাস ঐতিহাসিকভাবে সিন্ধু নদের পূর্ব পার থেকে বিচার করা হয়। ৭১২ খ্রিস্টাব্দে মুহাম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধু বিজয়ের মাধ্যমে যে ইসলামি ইতিহাসের সূচনা ধরা হয়, তা মূলত সিন্ধুর অববাহিকা ও তার পূর্বাঞ্চলীয় সমভূমিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল।

​অন্যদিকে, বেলুচিস্তান ভৌগোলিকভাবে সিন্ধু নদের পশ্চিমে অবস্থিত। ঐতিহাসিকভাবে এই অঞ্চলটি ভারতীয় মূলভূখণ্ডের প্রশাসনিক বা সামাজিক বলয়ের চেয়ে পারস্য (ইরান) এবং মধ্য এশীয় সভ্যতার সাথে অনেক বেশি সংযুক্ত ছিল। অষ্টাদশ শতকে 'কালাত খানাত' (Khanate of Kalat) একটি স্বাধীন বা প্রায়-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বিরাজমান ছিল। মূলত ১৯ শতকে ব্রিটিশ উপনিবেশের বিস্তার ও সীমানা নির্ধারণের (যেমন: ডুরান্ড লাইন ও গোল্ডস্মিড লাইন) মাধ্যমে বেলুচিস্তানকে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

​২. জাতিগত উৎস ও জেনেটিক পরিচয়

​জাতিগতভাবে বেলুচরা মূল উপজাতীয় উৎস থেকে ইরানীয় (Iranian) জনগোষ্ঠীর অংশ। তাদের শারীরিক গঠন, জেনেটিক বৈশিষ্ট্য এবং রক্তের ধারা মধ্য এশিয়া ও ইরানি প্লেটোর জনগোষ্ঠীর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। অন্যদিকে, ভারতীয় উপমহাদেশের মূলধারার মুসলিমদের একটি বড় অংশ ধর্মান্তরিত বা স্থানীয় দ্রাবিড়ীয় ও আর্য নৃতাত্ত্বিক ধারার সাথে সম্পর্কিত।

​৩. ভাষা ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য

​উপমহাদেশীয় মুসলিমদের একটি বিশাল অংশের জীবনযাত্রা, সাহিত্য ও চিন্তাভাবনায় উর্দু, আরবি ও ফার্সির মিশ্রণে তৈরি একটি স্বতন্ত্র ইন্দো-আর্য সংস্কৃতি প্রতিফলিত হয়। এছাড়া সামাজিক বিনোদন ও পপ-কালচারে হিন্দি ও বাংলা সিনেমার প্রভাব লক্ষণীয়।

​বেলুচদের চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন:

​ভাষা: বেলুচদের মূল ভাষা 'বেলুচি' (Balochi), যা ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাপরিবারের পশ্চিম-ইরানীয় শাখাবুক্ত (Persian ও Kurdish ভাষার সাথে এটি ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত)।

​সংস্কৃতি: তারা ফার্সি সাহিত্য, ইরানি লোকসংস্কৃতি এবং পারস্যের উৎসব-ঐতিহ্যের সাথে আত্মিক টান অনুভব করে। বিনোদনের ক্ষেত্রেও উপমহাদেশের মাধ্যমের চেয়ে ইরানি ও সেন্ট্রাল এশিয়ান সাংস্কৃতিক ধারাই তাদের বেশি পছন্দ।

​৪. ভিন্ন রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব ও হিন্দু ধর্মের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি

​উপমহাদেশীয় রাজনীতির একটি বড় অংশ ১৯৪৭ সালের দেশভাগ, হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ এবং পাকিস্তান-ভারতের দ্বন্দ্বের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ভারতের রাজনীতি বা হিন্দুত্ববাদ নিয়ে উপমহাদেশীয় মুসলিমদের মধ্যে যে ঐতিহাসিক নিরাপত্তাভীতি বা সামাজিক বিভাজন দেখা যায়, বেলুচ মনস্তত্ত্বে তার ভিত্তি নেই।

​ঐতিহাসিক দ্বন্দ্বের অনুপস্থিতি: ইতিহাসে বেলুচদের সাথে হিন্দু রাজন্যবর্গ বা সাধারণ হিন্দু জনগোষ্ঠীর কোনো রক্তক্ষয়ী সংঘাত বা নিপীড়নের ইতিহাস নেই।

​ভূ-রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি: আরব, পারস্য বা আফগানিস্তানের মানুষ যেভাবে ভারতকে ভৌগোলিক বন্ধু বা বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে দেখে, বেলুচদের দৃষ্টিভঙ্গিও অনেকটা সেরকম।

​ভীতিমুক্ত সামাজিক অবস্থান: ধর্মভিত্তিক মেরুকরণ বা 'হিন্দু ভীতি' দেখিয়ে বেলুচ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন বা তাদের সামাজিক মনস্তত্ত্বকে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত করার চেষ্টা ঐতিহাসিক ও সামাজিকভাবে অকার্যকর।

​সংক্ষেপে বলা যায়, বেলুচিস্তানের ভিন্ন ভৌগোলিক অবস্থান, প্রাচীন পারস্যভিত্তিক জাতিগত ও ভাষাগত শিকর, অনন্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং ভারতকেন্দ্রিক সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্বে অসংপৃক্ত ইতিহাসের কারণেই বেলুচদের পরিচয় উপমহাদেশের অন্যান্য মুসলিমদের থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র।

Ad