নিট প্রশ্নপত্র ফাঁস থেকে জাতীয় আন্দোলন কেন উত্তাল ভারতের শিক্ষাঙ্গন?

  • প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬, বিকাল ০৭:৪৮
  • আপডেট: ২৩ জুলাই ২০২৬, বিকাল ০৭:৪৮
Screenshot_9

ইমদাদুল হক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট:

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে হাজারো শিক্ষার্থী ও তরুণের অবস্থান কর্মসূচি এখন শুধু একটি ভর্তি পরীক্ষার অনিয়মের প্রতিবাদ নয়; এটি দেশটির শিক্ষা ব্যবস্থা, কর্মসংস্থান এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিয়ে জমে থাকা ক্ষোভের প্রতীক হয়ে উঠেছে। আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়েছে মেডিকেল কলেজে ভর্তির জাতীয় পরীক্ষা ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স টেস্ট (NEET)-এর প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ। আর সেই ঘটনার জেরে আন্দোলনকারীদের প্রধান দাবি—কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ।রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির তৃতীয় মেয়াদের শুরুতেই এই আন্দোলন তাঁর সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় জনঅসন্তোষের অন্যতম প্রকাশ।একটি পরীক্ষা, লাখো স্বপ্নভারতে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখেন লাখো তরুণ-তরুণী। সেইস্বপ্ন পূরণের একমাত্র জাতীয় প্রবেশদ্বার হলো নিট পরীক্ষা। প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ শিক্ষার্থী এই পরীক্ষায় অংশ নিলেও সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজ মিলিয়ে আসন রয়েছে দেড় লাখেরও কম। অর্থাৎ প্রতি একটি আসনের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন বহু শিক্ষার্থী।ফলে এই পরীক্ষা ঘিরে প্রস্তুতি শুরু হয় অনেক আগে থেকেই। কেউ দুই বছর, কেউ তিন বা চার বছর পর্যন্ত কোচিং করেন। অনেক পরিবার সঞ্চয় ভেঙে কিংবা ঋণ নিয়ে সন্তানকে প্রস্তুতির সুযোগ করে দেয়। তাই একটি পরীক্ষা বাতিল হওয়া মানে শুধু একটি পরীক্ষার তারিখ পিছিয়ে যাওয়া নয়; এটি হাজারো পরিবারের অর্থনৈতিক ও মানসিক স্থিতি নাড়িয়ে দেয়।

যেভাবে শুরু হলো সংকট

গত ৩ মে অনুষ্ঠিত নিট পরীক্ষার পর বিভিন্ন রাজ্যে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ওঠে। তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ার পর কর্তৃপক্ষ পরীক্ষা বাতিল করে পুনঃপরীক্ষার সিদ্ধান্ত নেয়। জুন মাসে পুনরায় পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলেও ক্ষোভ থামেনি।শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রমের পর এমন একটি অনিয়ম তাদের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। অনেকেই দাবি করছেন, এই অনিশ্চয়তা ও মানসিক চাপে কয়েকজন পরীক্ষার্থী আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। যদিও প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে পরীক্ষার সরাসরি সম্পর্ক আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয়নি, তবুও ঘটনাগুলো দেশজুড়ে গভীর আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

কেন শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি?

আন্দোলনকারীদের ভাষ্য, প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এটি পরীক্ষা পরিচালনা ব্যবস্থার গভীর দুর্বলতার প্রতিফলন। তাদের মতে, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো যদি পরীক্ষার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তবে এর রাজনৈতিক দায়ও নিতে হবে।তাদের দাবি, শুধু কয়েকজন দালাল বা অপরাধীকে গ্রেপ্তার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। পরীক্ষা পরিচালনার পুরো কাঠামো পুনর্গঠন এবং দায়িত্বশীলদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

প্রশ্নপত্র ফাঁস: পুরোনো সমস্যার নতুন বিস্ফোরণ

ভারতে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা নতুন নয়। শিক্ষক নিয়োগ, পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগ, সরকারি চাকরির বিভিন্ন পরীক্ষা—প্রায়ই এমন অভিযোগ সামনে এসেছে। বিভিন্ন রাজ্যে পরীক্ষা বাতিল, পুনঃপরীক্ষা এবং দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়াও দেখা গেছে।বিশেষজ্ঞদের মতে, ধারাবাহিকভাবে একই ধরনের ঘটনা ঘটতে থাকায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে রাষ্ট্রের প্রতি আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। নিট বিতর্ক সেই ক্ষোভকেই আরও বিস্ফোরক করে তুলেছে।

সামাজিক মাধ্যমে শুরু, রাজপথে বিস্তার

এই আন্দোলনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর সংগঠন পদ্ধতি। 'ককরোচ জনতা পার্টি' নামে একটি ব্যঙ্গধর্মী যুব প্ল্যাটফর্ম সামাজিক মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করে। প্রথমে মিম, ব্যঙ্গচিত্র ও ভিডিওর মাধ্যমে বিষয়টি আলোচনায় এলেও অল্প সময়ের মধ্যেই এটি বাস্তব আন্দোলনের রূপ নেয়।ইনস্টাগ্রামসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিপুল সাড়া পাওয়ার পর আন্দোলনটি দিল্লি, মুম্বাই, বেঙ্গালুরু, কলকাতাসহ বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়ে। তরুণদের বড় একটি অংশ এটিকে নিজেদের ভবিষ্যৎ রক্ষার আন্দোলন হিসেবে দেখছে।

দিল্লির রাজপথে উত্তেজনাসংসদ অভিমুখে বিক্ষোভ মিছিলের সময় পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। টিয়ার গ্যাস, লাঠিচার্জ এবং ব্যারিকেড ভেঙে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা—সব মিলিয়ে রাজধানী দিল্লিতে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।পুলিশি বাধার পরও আন্দোলনকারীরা অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের ঘোষণা, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।

সরকারের প্রতিশ্রুতি, কিন্তু ক্ষোভ কমেনি

শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান বলেছেন, সরকার শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ দূর করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং পরীক্ষা ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার আনা হবে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে.পি. নাড্ডা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছেন। তবে আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, তারা শুধু আশ্বাস নয়, দৃশ্যমান সংস্কার এবং জবাবদিহি চান।

বিরোধী রাজনীতির নতুন ইস্যু

প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এই আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে সরকারকে কঠোর সমালোচনা করছে। সংসদের ভেতরে ও বাইরে বিষয়টি নিয়ে সরকারকে চাপে রাখার ঘোষণা দিয়েছে তারা।বিশ্লেষকদের মতে, তরুণ ভোটারদের মধ্যে শিক্ষা ও কর্মসংস্থান বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু। তাই এই আন্দোলনের প্রভাব আগামী দিনের জাতীয় রাজনীতিতেও পড়তে পারে।

সামনে কী?

ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা, পরীক্ষা পরিচালনায় প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা জোরদার করা এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত বিচার—এখন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের প্রশ্নও স্পষ্ট—বছরের পর বছর পরিশ্রমের পর একটি অনিয়মের জন্য কেন তাদের ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মুখে পড়বে?নিট বিতর্ক তাই কেবল একটি ভর্তি পরীক্ষার সংকট নয়; এটি ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থা, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং তরুণ সমাজের আস্থার বড় এক পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। সরকারের পদক্ষেপ এই আস্থা কতটা ফিরিয়ে আনতে পারে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

Ad