কুমিল্লায় চিকিৎসকের ওপর বর্বর হামলা, প্রতিবাদে উত্তাল হাসপাতাল প্রাঙ্গণ

  • প্রকাশ: ১৮ জুন ২০২৬, দুপুর ০৪:১৬
  • আপডেট: ১৮ জুন ২০২৬, দুপুর ০৪:১৬
WhatsApp Image 2026-06-18 at 2.16.49 PM

জিএম মাকছুদুর রহমান, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার:

কুমিল্লার ‘মেডি কমপ্লেক্স (সৌহার্দ্য হাসপাতাল)’-এ এক গর্ভবতী রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে চরম উত্তেজনা, কৃত্রিম ‘মব’ সৃষ্টি এবং কর্তব্যরত মেডিকেল অফিসারের ওপর অতর্কিত ও বর্বর হামলার ঘটনা ঘটেছে। গত ১৫ জুন (সোমবার) ইভেনিং-নাইট শিফটে দায়িত্বরত মেডিকেল অফিসার ডা. জুবায়ের হোসেনের ওপর এই বেআইনি ও নৃশংস হামলা চালানো হয়। বর্তমানে তিনি গুরুতর আহত ও রক্তাক্ত অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন। কর্তব্যরত অবস্থায় একজন চিকিৎসকের ওপর এমন বর্বরোচিত হামলার ঘটনায় স্থানীয় চিকিৎসক সমাজ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এই ন্যক্কারজনক ঘটনার প্রতিবাদে এবং চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবিতে ১৮ জুন (বৃহস্পতিবার) হাসপাতাল প্রাঙ্গণে বিশাল মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছেন সর্বস্তরের চিকিৎসক, ইন্টার্ন ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। সমাবেশ থেকে হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করা না হলে দেশব্যাপী কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। ​ঘটনার বিবরণে জানা যায়, গত ১৫ জুন সকালে একজন গর্ভবতী রোগী গাইনি বিশেষজ্ঞ ও সিনিয়র কনসালটেন্ট প্রফেসর ডা. শান্তনা রানী পালের চিকিৎসাপত্র নিয়ে উনার অধীনে সৌহার্দ্য হাসপাতালে ভর্তি হন। সকালের শিফটের দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক নিয়মানুযায়ী ইভেনিং শিফটের মেডিকেল অফিসার ডা. জুবায়ের হোসেনকে উক্ত রোগীর কেস হ্যান্ডওভার দেন এবং জানান যে, প্রফেসর ডা. শান্তনা রানী পাল কিছুক্ষণের মধ্যেই রোগীকে দেখতে আসবেন। পরবর্তীতে বিকেল আনুমানিক ৩:৩০ মিনিটের দিকে প্রফেসর ডা. শান্তনা রানী পাল হাসপাতালে এসে রোগীকে নিজে পর্যবেক্ষণ করেন এবং ব্যবস্থাপত্রে কিছু নতুন ওষুধ যুক্ত করে দেন। দুর্ভাগ্যবশত, সিনিয়র কনসালটেন্টের নির্দেশিত ওষুধ প্রয়োগের কিছুক্ষণের মধ্যেই রোগীর শরীরে তীব্র ড্রাগ রিয়েকশন (Drug Hypersensitivity) দেখা দেয়। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে অন-ডিউটি মেডিকেল অফিসার ডা. জুবায়ের তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি প্রফেসর ডা. শান্তনা রানী পালকে অবহিত করেন। খবর পাওয়া মাত্রই অধ্যাপক শান্তনা রানী পাল তাঁর চেম্বার থেকে দ্রুত রোগীর কাছে ছুটে আসেন, জরুরি ভিত্তিতে কিছু ওষুধ প্রয়োগের নির্দেশ দেন এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য রোগীকে দ্রুত আইসিইউতে (ICU) রেফার করেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, কুমিল্লা মেডিকমপ্লেক্স (সৌহার্দ্য হাসপাতাল)-এ রোগীর সম্পূর্ণ চিকিৎসা সেবা ও ওষুধ প্রদান প্রক্রিয়া সিনিয়র কনসালটেন্ট প্রফেসর ডা. শান্তনা রানী পালের সরাসরি তত্ত্বাবধানে ও নির্দেশে সম্পন্ন হয়েছে। এখানে অন-ডিউটি মেডিকেল অফিসার ডা. জুবায়ের হোসেন নিজ থেকে কোনো ওষুধ বা চিকিৎসা প্রদান করেননি। পরবর্তীতে রোগীকে অন্য হাসপাতালে স্থানান্তরের পর হাসপাতালের বাইরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। কিন্তু রোগীর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে রোগীর স্বজন ও স্থানীয় কিছু লোক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিডিয়া কাভারেজ নিয়ে এসে হাসপাতালে একটি 'মব' বা কৃত্রিম উত্তেজনা সৃষ্টি করে। তারা মূল চিকিৎসক প্রফেসর ডা. শান্তনা রানী পালকে হাসপাতালে না পেয়ে, সম্পূর্ণ অন্যায়, বেআইনি ও অযৌক্তিক উপায়ে জরুরি বিভাগে কর্তব্যরত নিরীহ মেডিকেল অফিসার ডা. জুবায়ের হোসেনের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। উত্তেজিত জনতার এই নৃশংস হামলায় ডা. জুবায়ের হোসেন গুরুতর শারীরিক আঘাতপ্রাপ্ত হন। হাসপাতাল প্রশাসন এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে দোষীদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে এবং এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত স্থানীয় থানায় মামলার প্রস্তুতি চলছে। ​এদিকে এই বর্বর হামলার প্রতিবাদে আজ ১৮ জুন (বৃহস্পতিবার) হাসপাতাল প্রাঙ্গণে আয়োজিত মানববন্ধন ও সমাবেশে বক্তারা বলেন, দায়িত্ব পালনরত একজন চিকিৎসকের ওপর হামলা শুধু ব্যক্তির ওপর নয়, পুরো চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর আঘাত। এ ধরনের ঘটনা চিকিৎসকদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে এবং সেবার পরিবেশকে বাধাগ্রস্ত করছে। তারা আরও বলেন, চিকিৎসকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে হাসপাতালগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। চিকিৎসকরা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, আগামী দ্রুত সময়ের মধ্যে হামলাকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনি ব্যবস্থা ও গ্রেপ্তার করা না হলে তারা কর্মবিরতিসহ আরও কঠোর কর্মসূচিতে যেতে বাধ্য হবেন।

Ad