বিচারাধীন জমিতে বেগুনখেত তছনছের অভিযোগ: প্রভাবশালীদের দাপটে দিশেহারা হতদরিদ্র কৃষক
দক্ষিণ কাকারায় সাড়ে ৯ শতক জমি নিয়ে বিরোধ, কৃষকের দাবি, নষ্ট করা হয়েছে ৪০-৪৫ হাজার টাকা, চেয়ারম্যানের কাছে বিচারাধীন জমি
চকরিয়া প্রতিনিধি
কাগজপত্রে মালিকানার দাবি এক পক্ষের, দখলের দাবি অন্য পক্ষের। বিষয়টি স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের কাছে বিচারাধীন। এর মধ্যেই বিরোধপূর্ণ ওই জমিতে বর্গাচাষ করা এক দরিদ্র কৃষকের বেগুনগাছ নষ্ট করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি ঘটেছে কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার কাকারা ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ কাকারা এলাকায়।
ভুক্তভোগী কৃষক আরিফের অভিযোগ, মৃত সৈয়দ নূরের ছেলে রশিদ আহমদ ও তাঁর সহযোগীরা বহিরাগত লোকজন নিয়ে এসে তাঁর রোপণ করা বেগুনগাছ তছনছ করে দেন। এতে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেন চাষি ।
ধারদেনার টাকায় চাষ, মুহূর্তেই সর্বনাশ
স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগীর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রায় সাড়ে ৯ শতক জমি ফজল করিমের কাছ থেকে বর্গা নিয়ে বেগুন চাষ শুরু করেন কৃষক আরিফ। কৃষিকাজের জন্য ধারদেনা করে বীজ, সার, শ্রমিক ও পরিচর্যায় অর্থ ব্যয় করেন তিনি।
কৃষক আরিফের ভাষ্য, বেগুনগাছগুলো ধীরে ধীরে বেড়ে উঠছিল। ভালো ফলনের আশায় ছিলেন তিনি। কিন্তু জমি নিয়ে বিরোধের জেরে গাছগুলো নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তাঁর সেই আশা ভেস্তে গেছে।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “আমি হতদরিদ্র মানুষ। ধারদেনা করে চাষাবাদ করি। এই চাষের আয় দিয়েই স্ত্রী-সন্তানের ভরণপোষণ চলে। অনেক কষ্ট করে বেগুনগাছগুলো রোপন করেছিলাম। এখন সব নষ্ট হয়ে গেছে। আমার প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা ক্ষতি হয়েছে। আমি এর ন্যায়বিচার চাই।”
অস্ত্রধারী বহিরাগতদের উপস্থিতির অভিযোগ
আরিফ অভিযোগ করেন, রশিদ আহমদ কয়েকজন বহিরাগত লোক নিয়ে জমিতে আসেন। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনের হাতে অস্ত্র ছিল বলেও দাবি তাঁর। এ সময় বেগুনগাছ নষ্ট করার চেষ্টা করা হলে তিনি ও জমির বর্গাদাতা ফজল করিমসহ কয়েকজন বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু অস্ত্রধারীদের ভয়ে তাঁরা কার্যকরভাবে প্রতিরোধ করতে পারেননি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তবে অভিযোগে উল্লেখ করা অস্ত্রধারী ব্যক্তিদের পরিচয়, অস্ত্রের ধরন এবং ঘটনাস্থলে তাঁদের উপস্থিতির বিষয়টি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
জমির মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন, চেয়ারম্যানের কাছে বিচারাধীনঃ
জমিটির খতিয়ানভুক্ত মালিকানা নিজের দাবি করে ফজল করিম বলেন, জমিটি তাঁর নানার সম্পত্তি। ওয়ারিশসূত্রে তাঁর মায়ের অংশ এবং পরবর্তীতে তিনি খতিয়ানভুক্ত মালিক হয়েছেন। তাঁর দাবি, প্রায় দুই বছর ধরে জমিটি তাঁর দখলে রয়েছে।
ফজল করিম বলেন, “রশিদ আহমদের সঙ্গে জমিটি নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হলে বিষয়টি কাকারা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের কাছে বিচারাধীন রয়েছে। চেয়ারম্যানের মৌখিক নির্দেশনা অনুযায়ী আমি এলাকার দরিদ্র ভাতিজা আরিফকে জমিটি বর্গা দিই। বিষয়টি বিচারাধীন থাকা অবস্থায় সেখানে গাছ নষ্ট করার ঘটনা ঘটলে তা অত্যন্ত দুঃখজনক।”
তিনি আরও বলেন, জমির প্রকৃত মালিকানা ও দখল নিয়ে প্রশাসনের সরেজমিনে তদন্ত প্রয়োজন। কাগজপত্র যাচাই করে আইনানুগভাবে বিরোধ নিষ্পত্তির দাবি জানান তিনি।
প্রশ্ন উঠছে ! বিচারাধীন জমিতে চাষ নষ্ট করার অধিকার কার ?
ঘটনাটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখানেই ? জমিটি যখন স্থানীয় জনপ্রতিনিধির কাছে বিরোধপূর্ণ ও বিচারাধীন, তখন কোনো পক্ষ কি নিজের উদ্যোগে সেখানে গিয়ে চাষাবাদ নষ্ট বা দখলের চেষ্টা করতে পারে ?
আরেকটি প্রশ্ন হলো, বর্গাচাষি আরিফ যদি বৈধ অনুমতি নিয়ে সেখানে চাষ করে থাকেন, তাহলে তাঁর ফসল নষ্ট করার অভিযোগের দায় কার ? আর যদি জমিটির মালিকানা নিয়ে রশিদ আহমদের দাবি থাকে, তাহলে সেটি নিষ্পত্তির জন্য আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি কেন, এ বিষয়টিও তদন্তের দাবি রাখে।
অভিযোগ সত্য হলে, একজন দরিদ্র কৃষকের ফসল নষ্ট করার ঘটনা শুধু ব্যক্তিগত জমি বিরোধের বিষয় নয়; এটি কৃষকের জীবিকা, আইনশৃঙ্খলা এবং স্থানীয়ভাবে বিরোধ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করে।
চেয়ারম্যানের বক্তব্যে মিলল বিচারাধীন থাকার তথ্যঃ
কাকারা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শফিউল আলম মুঠোফোনে গণমাধ্যমকে বলেন, জমি নিয়ে বিরোধের বিষয়টি তিনি অবগত এবং তা তাঁর কাছে বিচারাধীন রয়েছে।
তিনি বলেন, “বিষয়টি আমার কাছে বিচারাধীন রয়েছে। আগামী রোববার (৩০ আগস্ট) উভয় পক্ষের বিষয়টি সার্বিকভাবে বিবেচনা করে ন্যায়সঙ্গতভাবে নিষ্পত্তির সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।”
চেয়ারম্যানের বক্তব্য অনুযায়ী, ৩০ আগস্ট বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধান্তের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
রশিদ আহমদের বক্তব্য কী?
বেগুনগাছ নষ্ট করা, বহিরাগত লোকজন নিয়ে আসা এবং অস্ত্র প্রদর্শনের অভিযোগের বিষয়ে রশিদ আহমদের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। জমির মালিকানা বা দখল নিয়ে তাঁর কোনো দাবি থাকলে এবং অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করা হবে।
প্রশাসনের হস্তক্ষেপ চায় ভুক্তভোগী পরিবারঃ
সব মিলিয়ে দক্ষিণ কাকারার সাড়ে ৯ শতক জমির বিরোধ এখন শুধু মালিকানা বা দখলের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে একজন দরিদ্র কৃষকের জীবিকা ও তাঁর পরিবারের ভবিষ্যৎ।
ভুক্তভোগীদের দাবি ; জমির খতিয়ান, দলিল, দখল ও বর্গাচাষের বিষয়গুলো যাচাই করে সরেজমিন তদন্ত করা হউক। একই সঙ্গে ফসল নষ্ট করার অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হউক।
এখন দেখার বিষয়, ৩০ আগস্ট চেয়ারম্যানের বিচারাধীন সিদ্ধান্তে জমি বিরোধের কী সমাধান হয় এবং কৃষক আরিফ তাঁর ক্ষতির কোনো প্রতিকার পান কি না ।



