দেবিদ্বারে ড্রাইভিং লাইসেন্স ও রেজিস্ট্রেশনহীন সিএনজির রাজত্ব

  • প্রকাশ: ০৩ আগস্ট ২০২৬, বিকাল ০৫:৪৮
  • আপডেট: ০৩ আগস্ট ২০২৬, বিকাল ০৫:৪৮
WhatsApp Image 2026-08-03 at 5.45.10 PM

জিএম মাকছুদুর রহমান, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার:

মহাসড়কে সিএনজিচালিত থ্রি-হুইলার চলাচলে উচ্চ আদালতের সুনির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। একই সঙ্গে বিআরটিএ-এর বৈধ নিবন্ধন (রেজিস্ট্রেশন) এবং চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স ব্যতীত গাড়ি নামানো প্রচলিত আইনে আমলযোগ্য ও গুরুতর দণ্ডনীয় অপরাধ। অথচ হাইকোর্টের নির্দেশনা, আইনের স্পষ্ট বিধান এবং শাস্তির তোয়াক্কা না করেই কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলা এবং কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কে অবাধে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে হাজার হাজার নম্বরহীন ও অবৈধ সিএনজি অটোরিকশা। স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন, ট্রাফিক পুলিশ এবং হাইওয়ে পুলিশের সার্বিক নজরদারি ও নিয়মিত টহল থাকা সত্ত্বেও প্রতিদিন কীভাবে এমন বেআইনি কর্মকাণ্ড প্রকাশ্যে ঘটছে, তা নিয়ে সাধারণ যাত্রী ও সচেতন মহলের মনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ​সরেজমিনে দেবিদ্বার নিউ মার্কেট, চান্দিনা রোড, ফুলগাছতলা, জেলা পরিষদ মার্কেট, পুরান বাজার, পুনরা বাজার, পদ্মকোট, গাংচর, ভানি, কালিকাপুর, জাফরগঞ্জ, এলাহাবাদ, মোহনপুর, সুবিল, এগারোগ্রাম, বড়শালঘর, সংচাইল, ফতেহাবাদ, ওয়াহেদপুর, ইউসুফপুর, পান্নারপুল, রসুলপুর, নবীপুর, রাজামেহার, চুলাশ, গুনাইঘর, ছেপারা, গজারিয়া স্ট্যান্ডসহ দেবিদ্বারের আনাচে-কানাচে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, মহাসড়ক ও ব্যস্ততম আঞ্চলিক সড়কগুলোর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে অবৈধ সিএনজি স্ট্যান্ড। এসব সিএনজি ও অটোরিকশার সিংহভাগের নেই কোনো বৈধ কাগজপত্র বা রেজিস্ট্রেশন নম্বর। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, গাড়িগুলোর চালকদের একটি বড় অংশই অনভিজ্ঞ ও অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোর। বিআরটিএ স্বীকৃত কোনো ড্রাইভিং লাইসেন্স বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই তারা স্টিয়ারিং হাতে তুলে নিয়েছে। মহাসড়কে দ্রুতগতির দূরপাল্লার বাস ও ট্রাকের মাঝেই উল্টো পথে (রং সাইড) গাড়ি চালানো, সিগন্যাল অমান্য করা এবং বেপরোয়া ওভারটেকিং করার কারণে দেবিদ্বারে প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে ছোট-বড় প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা। ​আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ অনুযায়ী লাইসেন্স ছাড়া ও রেজিস্ট্রেশনবিহীন গাড়ি চালানো আমলযোগ্য অপরাধ, অর্থাৎ পুলিশ পরোয়ানা ছাড়াই অপরাধীকে গ্রেফতার করতে পারে। আইনটির ৪ ও ৫ নম্বর ধারা লঙ্ঘন করে ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালালে ৬৬ ধারা অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৬ মাসের কারাদণ্ড অথবা ২৫ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের স্পষ্ট বিধান রয়েছে। একইভাবে ৯ নম্বর ধারা লঙ্ঘন করে বিআরটিএ-এর নিবন্ধন ছাড়া সিএনজি রাস্তায় নামালে ৭২ ধারা অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৬ মাসের কারাদণ্ড অথবা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার নিয়ম রয়েছে। এ ছাড়া বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো ও ট্রাফিক নির্দেশ অমান্য করার অপরাধে ৪২ ও ৮৭ ধারা লঙ্ঘনে ৮৮ ও ৮৯ ধারায় অতিরিক্ত জরিমানা ও যানবাহন তাৎক্ষণিক আটক (ডাম্পিং) করার বিধান থাকলেও দেবিদ্বারে তার প্রয়োগ কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। ​স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এসব নিবন্ধহীন সিএনজি কেবল দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায় না, বরং নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডেরও ইন্ধন জোগাচ্ছে। কোনো সুনির্দিষ্ট নম্বরপ্লেট বা পরিচয় না থাকায় এসব অটোরিকশা ব্যবহার করে এলাকায় ছিনতাই, ডাকাতি, অপহরণ ও মাদক চোরাচালানের মতো অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। কোনো অঘটন ঘটিয়ে গাড়ি নিয়ে পালিয়ে গেলে সুনির্দিষ্ট তথ্যের অভাবে পুলিশ অপরাধীদের শনাক্ত করতে হিমশিম খাচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, নির্দিষ্ট পরিবহন সিন্ডিকেট ও প্রভাবশালী চক্রের নিয়মিত চাঁদাবাজি ও মাসোহারা আদায়ের বিনিময়েই এসব অবৈধ যান নির্দ্বিধায় সড়কে চলাচলের সুযোগ পাচ্ছে। আইনি কোনো কাঠামোর মধ্যে না থাকায় চালকেরাও ইচ্ছামতো যাত্রীদের জিম্মি করে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছে। ​দেবিদ্বারের সাধারণ পথচারী ও নিয়মিত যাতায়াতকারী যাত্রীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে হাইওয়ে পুলিশের নিয়মিত টহল ও তল্লাশি থাকা সত্ত্বেও তাদের চোখের সামনে দিয়ে দিনরাত রেজিস্ট্রেশন ও লাইসেন্সহীন সিএনজি চলাচল করছে। প্রশাসন ও পুলিশ সব দেখেও রহস্যজনক কারণে নীরব ভূমিকা পালন করছে। মাঝে মাঝে লোকদেখানো দু-একটি ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চালানো হলেও অভিযান শেষ হতেই পরিস্থিতি আবার আগের রূপ নেয়। প্রশাসনিক এমন উদাসীনতা ও কার্যকর স্থায়ী পদক্ষেপের অভাবে চালকদের আইন অমান্য করার সাহস দিন দিন বেড়েই চলেছে। ​এ অবস্থায় দেবিদ্বারের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনকারী ও সচেতন নাগরিক সমাজ অনতিবিলম্বে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। মহাসড়ক থেকে থ্রি-হুইলার স্থায়ীভাবে উচ্ছেদ করা, নিবন্ধনহীন সিএনজি বাজেয়াপ্ত করে সরাসরি ডাম্পিংয়ে পাঠানো, লাইসেন্সহীন চালক এবং অবৈধ স্ট্যান্ড পরিচালনাকারী মূল সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করার জন্য জেলা প্রশাসন, বিআরটিএ এবং হাইওয়ে পুলিশের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।

Ad