জনহয়রানি ও চাঁদামুক্ত দলিল রেজিস্ট্রি'র প্রত্যয়: পবার নবগঠিত কমিটি
রাজশাহীর পবা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল রেজিস্ট্রির নামে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে অতিরিক্ত অর্থ আদায় ও সীমাহীন হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। সরকারি রাজস্ব ও নির্ধারিত পারিশ্রমিকের বাইরে প্রতিটি দলিলে অতিরিক্ত সাড়ে তিন হাজার টাকা ‘চাঁদা’ আদায়ের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এই সিন্ডিকেট ও চাঁদাবাজি বন্ধের অঙ্গীকার নিয়ে পবায় আত্মপ্রকাশ করেছে 'পবা দলিল লেখক কল্যাণ সমিতি'। সমিতির নেতারা চাঁদাবাজি বন্ধ ও জনদূর্ভোগ কমাতে ইতোমধ্যে বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দাখিল করেছেন। অনুসন্ধানে জানা যায়, পবা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে প্রতিটি দলিল রেজিস্ট্রেশনের জন্য সরকারি খরচ ও লেখকের পারিশ্রমিক ছাড়াও ‘পবা উপজেলা দলিল লেখক সমিতি’র নামে বাড়তি সাড়ে তিন হাজার টাকা চাঁদা আদায় বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এই জুলুমের প্রতিবাদে গত ৮ই এপ্রিল ১৯ জন সনদপ্রাপ্ত দলিল লেখক জেলা প্রশাসক, পুলিশ কমিশনার ও জেলা রেজিস্ট্রারসহ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ জানান। তবে প্রতিকার তো মিলছেই না, উল্টো প্রতিবাদী লেখকদের দাপ্তরিক রশিদ গায়েবসহ নানাভাবে হয়রানি করা হচ্ছে।
ভুক্তভোগী লেখকরা জানান, গত ২৯/০৩/২০২৬ তারিখ থেকে তাদের মাধ্যমে রেজিস্ট্রিকৃত দলিলের রশিদগুলো অফিস থেকে গায়েব করে দেওয়া হয়েছে। অফিসের স্টাফদের দাবি, রশিদগুলো পুরনো সমিতির নেতারা নিয়ে গেছেন। এতে জমি দাতা-গ্রহীতারা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।
অফিসে আগত একজন সেবাগ্রহীতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "আমার দলিলের মূল্য অনুযায়ী সরকারি রাজস্ব আসার কথা ৫০,০০০ টাকা। কিন্তু আমার কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে ৬০,০০০ টাকা। এই বাড়তি ১০,০০০ টাকা কোথায় গেল? কার পকেটে গেল? আমরা তো জিম্মি হয়ে আছি।"
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জনৈক দলিল লেখক জানান, কমিটির ৪/৫ জন প্রভাবশালী ব্যক্তির হাতে পুরো অফিস জিম্মি। তাদের বিরুদ্ধে কথা বলার ক্ষমতা কারও নেই। অনেক অনিয়ম মুখ বুজে সহ্য করতে হয়।
এ অনিয়মের বিরুদ্ধে পাল্টা-পাল্টি অবস্থান ও নতুন সমিতি গঠন করা হয়েছে। এতে উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করেছে। অনিয়মের প্রতিবাদে গত ২৯ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে মহানগরীর কাশিয়াডাঙ্গা মোড়ে মোজাহার আলীকে আহবায়ক এবং রবিউল ইসলাম খোকনকে সদস্য সচিব করে 'পবা দলিল লেখক কল্যাণ সমিতি' গঠিত হয়।
সদস্য সচিব রবিউল ইসলাম খোকন বলেন:"আমরা সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে আর কোনো চাঁদাবাজি হতে দেব না। জনহয়রানি বন্ধ করে সরকারি নিয়ম মেনে সেবা দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য। যারা রশিদ আটকে রেখেছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা চাই।"
অন্যদিকে, পবা দলিল লেখক সমিতির সভাপতি মো: আনারুল ইসলাম আবু ও সাধারণ সম্পাদক মো: আসাদুজ্জামান সবুজ চাঁদাবাজির অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, তারা সদস্যদের কল্যাণের জন্য অর্থ জমা রাখেন। তবে যারা সমিতির অন্তর্ভুক্ত নয়, তাদের বিষয়ে তাদের কোনো হস্তক্ষেপ নেই। বিষয়টিকে তারা 'মিথ্যা ও ভিত্তিহীন' বলে দাবি করেছেন।সচেতন মহলের মতে, যেখানে প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান সারাদেশে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে 'জিরো টলারেন্স' ঘোষণা করেছেন, সেখানে জনগণকে জিম্মি করে এমন কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই কাম্য নয়।
উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার শাহীন আলী বলেন, "অফিসের রশিদ বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"জেলা রেজিস্ট্রার আব্দুর রকিব সিদ্দিক বলেন, "অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে সাধারণ মানুষ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে নজর দিচ্ছি।"জেলা প্রশাসক শহীদুল ইসলাম বলেন: "কোনো সিন্ডিকেট সহ্য করা হবে না। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।"অভিযোগের বিষয়ে পুলিশ কমিশনার জিল্লুর রহমানকে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। এরপর আরএমপি পুলিশের মিডিয়া মুখপাত্র গাজিউর রহমানকেও ফোন দিলে তিনিও ফোন রিসিভ করেননি। একারণে তাঁদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
পবা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে আগত সেবাগ্রহীতাদের দাবি, কোনো প্রকার হয়রানি ও বাড়তি খরচ ছাড়া পূর্ণ নিরাপত্তার সাথে যেন তারা সেবা পেতে পারেন, সে বিষয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিক সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। অন্যথায় সাধারণ মানুষের ক্ষোভ চরম রূপ নিতে পারে।



