দেবিদ্বারে রোহিঙ্গাদের জন্মসনদ জালিয়াতি: কারাবন্দি সাবেক চেয়ারম্যানের 'ভূতুড়ে' স্বাক্ষর
সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার:
কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার ৬নং ফতেহাবাদ ইউনিয়ন পরিষদে টাকার বিনিময়ে রোহিঙ্গাদের জন্ম নিবন্ধন সনদ দেওয়ার ঘটনায় এবার বেরিয়ে এসেছে জালিয়াতির নগ্ন ও রোমহর্ষক চিত্র। অপরাধ ধামাচাপা দিতে ইউনিয়ন পরিষদের ভেতরের একটি অসাধু চক্র এমন এক ভয়ংকর জাল বিস্তার করেছে, যা যেকোনো ক্রাইম থ্রিলারকেও হার মানায়। অভিযোগ উঠেছে, প্রায় ৯ লাখ টাকার ভাগবাটোয়ারা আড়াল করতে জন্ম সনদে ব্যবহার করা হয়েছে সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান মাসুদের জাল স্বাক্ষর। তবে জালিয়াতির সবচেয়ে ভয়ংকর দিকটি হলো— যে সময়ে সনদে সশরীরে স্বাক্ষর করা হয়েছে বলে দেখানো হচ্ছে, সেই সময়ে সাবেক চেয়ারম্যান ছিলেন অন্ধকার কারাগারে! নথিপত্র ও জেলের রেকর্ড বিশ্লেষণ করে জালিয়াতির সবচেয়ে কাঁচা ও ভয়ংকর প্রমাণ মিলেছে। গত ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর, ৭ আগস্ট ২০২৪ তারিখে সাবেক চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান মাসুদ আনুষ্ঠানিকভাবে প্যানেল চেয়ারম্যান মো. সালাহউদ্দিন রুহুলের কাছে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে ঢাকায় চলে যান। এরপর ৮ অক্টোবর থেকে দীর্ঘ আট মাস তিনি কারাগারে বন্দি ছিলেন। অথচ সাইমুন ইসলাম সাজ্জাদ, মবিনা খাতুন ও হাদিসা নামের তিন ব্যক্তির বিতর্কিত জন্ম নিবন্ধনগুলোতে নিবন্ধনের তারিখ (Date of Registration) দেখানো হয়েছে ৪ জানুয়ারি ২০২৫ এবং একটি সনদে ইস্যু বা প্রিন্টের তারিখ (Date of Issuance) লেখা রয়েছে ১৯ অক্টোবর ২০২৫! সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, সার্ভার থেকে জন্ম সনদ প্রিন্ট হওয়ার পর কাগজের নিচের অংশে ইউপি সচিব এবং চেয়ারম্যানকে সশরীরে স্বাক্ষর ও সিল মারতে হয়। এখন জনমনে বড় প্রশ্ন— ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে নিবন্ধিত একটি কাগজে দীর্ঘ আট মাস ধরে কারাবন্দি একজন মানুষ কারাগারের ভেতর থেকে এসে কীভাবে শারীরিক স্বাক্ষর ও সিল দিলেন? সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে ইউপি কার্যালয়ে বসেই চক্রটি (ইউপি সচিব ও উদ্যোক্তারা) জেনেশুনে কারাবন্দি সাবেক চেয়ারম্যানের ভুয়া সিল ও জাল স্বাক্ষর ব্যবহার করে এই জালিয়াতি করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও বার্তায় বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. সালাহউদ্দিন রুহুল নিজেই স্বীকার করেছেন, "আমি দায়িত্ব নিয়েছি ৭-৮-২৪ সালে। তবে জালিয়াতির দায় এড়াতে তিনি ভিডিওতে এক অদ্ভুত ব্যাখ্যার অবতারণা করেন। তিনি বলেন, "আমি নতুন মানুষ হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই গোমতী নদীর বুড়বুড়িয়ার বন্যার কারণে ব্যস্ত ছিলাম। নিজের কারণে হোক বা নতুন হিসেবে না বোঝার কারণে... আমাকে ৪ মাস পর উপজেলা থেকে ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড দেওয়া হয়। তার এই বক্তব্য প্রশাসনের চরম ব্যর্থতা ও দুর্নীতির দিকেই আঙুল তুলছে। সচেতন মহলের প্রশ্ন— ৭ আগস্ট দায়িত্ব নেওয়ার পর একজন চেয়ারম্যান যদি ‘কিছু বুঝি না’ বলে চার মাস সার্ভারের পাসওয়ার্ড না নেন, তবে ওই চার মাস ইউনিয়ন পরিষদের জন্ম নিবন্ধনের কাজ কীভাবে চলল? কার পাসওয়ার্ড দিয়ে ইউপি সচিব ও তথ্যসেবা কেন্দ্রের উদ্যোক্তারা কাজ চালালেন? নিজের অফিসে দিনের পর দিন অন্যের পাসওয়ার্ড দিয়ে বেআইনি কাজ চললেও তিনি কেন নীরব ছিলেন? ভিডিও বার্তায় সালাহউদ্দিন রুহুল সাবেক চেয়ারম্যানের সিলের কথা বারবার বললেও, জালিয়াতির মূল কারিগর নিজের অধীনস্থ ইউপি সচিব ও উদ্যোক্তার বিরুদ্ধে রহস্যজনকভাবে নীরব। জালিয়াতির অকাট্য প্রমাণ পাওয়ার পরও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নিজে বাদী হয়ে কেন এখনো থানায় বা ইউএনও বরাবর মামলা করলেন না— তা নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন। অন্যদিকে, ওই তিন ব্যক্তির ফাইলে স্থানীয় ইউপি মেম্বারদের প্রত্যয়নপত্রও রয়েছে। টাকার বিনিময়ে রোহিঙ্গাদের স্থানীয় বাসিন্দা হিসেবে প্রত্যয়ন দেওয়া মেম্বাররাও এখন পর্যন্ত রয়ে গেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।স্থানীয়দের দাবি, ‘নতুন মানুষ’ সাজার আড়ালে মূলত ৯ লাখ টাকার বিশাল বাণিজ্য ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। জেলের রেকর্ড এবং ডিজিটাল প্রমাণাদি এই জালিয়াতির অকাট্য প্রমাণ বহন করছে। অবিলম্বে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), সিআইডি বা পিবিআইয়ের মতো সংস্থাকে দিয়ে জন্ম নিবন্ধন সার্ভারের ডিজিটাল লগ (IP Address) এবং সনদের ফরেনসিক পরীক্ষা করার জোর দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। ইউপি সচিবসহ সংশ্লিষ্টদের আইনের আওতায় আনলেই বেরিয়ে আসবে কারা এই রাষ্ট্রদ্রোহী জালিয়াতির মূল মাস্টারমাইন্ড।



