আদালতের রায়ের পরও জমি দখলের অভিযোগ! তেলীনগরে উত্তেজনা, রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের শঙ্কা
- আলী মিয়ার বিরুদ্ধে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ, হুমকি ও মানববন্ধনে বাধা দেওয়ার অভিযোগ
- প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি এলাকাবাসীর
এনামুল হক আরিফ, জেলা প্রতিনিধি ব্রাহ্মণবাড়িয়াঃ ঃ
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার তালশহর পূর্ব ইউনিয়নের তেলীনগর এলাকায় ৮৫ শতক জমি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। আদালতের রায়ের পরও জমি দখল, সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ, হয়রানি ও হুমকির অভিযোগ তুলে আলী মিয়া ও তাঁর লোকজনের বিরুদ্ধে মানববন্ধন করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) দুপুরে আয়োজিত এ মানববন্ধন থেকে ভুক্তভোগীরা জমির দখল ফিরে পাওয়া, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।মানববন্ধনে নারী-পুরুষসহ স্থানীয় বাসিন্দারা অংশ নেন। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে জমি নিয়ে বিরোধ চললেও এর স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে এলাকায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশঙ্কা রয়েছে বলেও দাবি করেন তাঁরা।
৮৫ শতক জমি নিয়ে বিরোধ, আদালতের রায়ের দাবি
মানববন্ধনে বক্তব্য দেন ভুক্তভোগী রহমত আলী ও মো. রোমান মিয়া। তাঁরা জানান, বিরোধপূর্ণ জমির পরিমাণ প্রায় ৮৫ শতক। জমিটির সাবেক দাগ নম্বর ২১২৬, ২১২৭ ও ২১২৮ এবং বর্তমান দাগ নম্বর ৭০৭৬ ও ৭০৭৭।তাঁদের দাবি, প্রায় ৫০ বছর ধরে তাঁরা ওই জমি ভোগদখল করে আসছেন। জমির মালিকানা নিয়ে প্রায় ৩০ বছর আগে আদালতে মামলা হয়। পরবর্তী সময়ে ২০০৬ সালে নিম্ন আদালত এবং ২০০৮ সালে জেলা জজ আদালত থেকে নিজেদের পক্ষে রায় পেয়েছেন বলে দাবি করেন তাঁরা।
ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন, আদালতের রায়ের পরও যদি জমি নিয়ে বিরোধ ও দখলসংক্রান্ত জটিলতা অব্যাহত থাকে, তাহলে তাঁরা কোথায় গিয়ে প্রতিকার পাবেন? তাঁদের অভিযোগ, আদালতের রায়ের নথি থাকার পরও জমি নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটছে না।
সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ ও বিক্রির সাইনবোর্ড, কী ঘটছে বিরোধপূর্ণ জমিতে?
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, আলী মিয়া ও তাঁর লোকজন তাঁদের দাবি করা জমিতে দেয়াল ও সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করেছেন। একই সঙ্গে জোরপূর্বক জমি দখলের চেষ্টা চালিয়ে সেখানে জমি বিক্রির সাইনবোর্ড টাঙানো হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তাঁরা।তাঁদের দাবি, এভাবে জমি নিয়ে বিরোধ আরও জটিল হয়ে উঠছে। দীর্ঘদিনের ভোগদখল ও আদালতের রায়ের দাবি থাকা সত্ত্বেও তাঁরা নিজেদের জমি নিয়ে উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন।তবে জমির প্রকৃত মালিকানা, আদালতের রায়ের কার্যকারিতা এবং দখলসংক্রান্ত অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রভাব খাটানোর অভিযোগ
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেন, আলী মিয়া নিজেকে তালশহর পূর্ব ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি পরিচয় দিয়ে তাঁদের ওপর প্রভাব বিস্তার ও হুমকি দিয়ে আসছেন। তাঁদের দাবি, সরকার পতনের পর থেকে জমি নিয়ে বিরোধের জেরে তাঁদের হয়রানি করা হচ্ছে। এমনকি এলাকায় বসবাস করতে দেওয়া হবে না বলেও হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তাঁরা।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, জমি নিয়ে বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধানের পরিবর্তে হুমকি ও চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে তাঁদের। এ অবস্থায় নিজেদের নিরাপত্তা এবং জমির অধিকার রক্ষায় প্রশাসনের হস্তক্ষেপ ছাড়া অন্য কোনো পথ দেখছেন না তাঁরা।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে অভিযুক্ত আলী মিয়ার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।মানববন্ধনে বাধা দেওয়ার অভিযোগ, বাড়ছে উত্তেজনা
মানববন্ধন চলাকালে আলী মিয়া বাধা দিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন আয়োজকেরা। তাঁদের দাবি, নিজেদের জমি ও নিরাপত্তার দাবিতে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করতে গিয়েও বাধার মুখে পড়তে হয়েছে।
এলাকাবাসীর আশঙ্কা, দীর্ঘদিনের জমি বিরোধের সঙ্গে নতুন করে উত্তেজনা যুক্ত হওয়ায় যেকোনো সময় অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে বিরোধটি রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নিতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তাঁরা।স্থানীয়দের মতে, জমির সীমানা ও মালিকানা নিয়ে বিরোধের আইনানুগ নিষ্পত্তি এবং উভয় পক্ষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন অত্যন্ত জরুরি।মানববন্ধন থেকে ভুক্তভোগীরা বিরোধপূর্ণ জমির দলিল, দাগ নম্বর ও আদালতের রায় যাচাই করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণের দাবি জানান। পাশাপাশি আইন অনুযায়ী জমির দখলসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি, হুমকি ও হয়রানির অভিযোগ তদন্ত এবং এলাকায় শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান তাঁরা।
তাঁদের দাবি, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর পরিচয় কিংবা প্রভাব যেন আইনানুগ প্রতিকার পাওয়ার পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। জমি নিয়ে বিরোধের নিষ্পত্তি হতে হবে নথিপত্র, আদালতের আদেশ ও প্রচলিত আইনের ভিত্তিতে।
মানববন্ধনে উপস্থিত হাবিবুর রহমান, হুমায়ুন কবির, দুলাল মিয়া, জাহাঙ্গীর মিয়া, হারুন মিয়া, আসলাম মিয়া ও মুজিবুর রহমানসহ স্থানীয় বাসিন্দারা জমি নিয়ে বিরোধের দ্রুত সমাধান এবং সম্ভাব্য সংঘর্ষ এড়াতে প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
এখন এলাকাবাসীর প্রত্যাশা—অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং আইনানুগ পদক্ষেপের মাধ্যমে তেলীনগরের দীর্ঘদিনের জমি বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান নিশ্চিত করা হবে।

.webp)

