জিআই স্বীকৃতিতে বিশ্বমঞ্চে কুমিল্লার খাদি ও রসমালাই
জিএম মাকছুদুর রহমান:
বাংলাদেশের ইতিহাস ও লোকঐতিহ্যের সমৃদ্ধ স্মারক কুমিল্লা জেলার অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে শতবর্ষী দুটি ঐতিহ্যবাহী পণ্য মাতৃভাণ্ডারের রসমালাই এবং হস্তচালিত তাঁতের খাদি কাপড়। বিশ্ববাণিজ্যে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি লাভের পর এই দুটি শিল্পের উৎপাদন, বিক্রি এবং আন্তর্জাতিক রপ্তানি সম্ভাবনাকে ঘিরে পুরো জেলাজুড়ে এখন এক নতুন অর্থনৈতিক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। কুমিল্লার রসমালাই ও খাদির জিআই অর্জন এই অঞ্চলকে বিশ্বমঞ্চে নতুন করে তুলে ধরেছে। ২০০ বছরের দীর্ঘ ইতিহাস লালন করা কুমিল্লার রসমালাই ২০২৪ সালে শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর (ডিপিডিটি) থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জিআই সনদ লাভ করে। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের মে মাসে কুমিল্লার হস্তচালিত খাদি কাপড়কে বাংলাদেশের ৫০তম জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সনদ হস্তান্তর করা হয়। সরকারি ও স্থানীয় ব্যবসায়ী সমিতির হিসাব মতে, জেলাজুড়ে এখন এই দুই খাতকে কেন্দ্র করে বাৎসরিক ৩০০ কোটি টাকারও বেশি অর্থ লেনদেন হচ্ছে। এর মধ্যে কুমিল্লার বিখ্যাত মনোহরপুরের মাতৃভাণ্ডার ও কান্দিরপাড় এলাকাকে কেন্দ্র করে দৈনিক গড়ে ২ থেকে ৩ টন রসমালাই বিক্রি হয়। এই রসমালাই শুধু স্থানীয় বাজারেই সীমাবদ্ধ নয়; আন্তর্জাতিক প্যাকেটজাতকরণের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রবাসী ও বিদেশী পর্যটকদের মাধ্যমে বিদেশেও পাড়ি জমাচ্ছে। অন্যদিকে চান্দিনা, দেবীদ্বার, ময়নামতি ও কান্দিরপাড়ের প্রায় ৩০০টিরও বেশি খাদি শোরুম এবং হস্তচালিত কারখানা হাজার হাজার তাঁতি পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস হয়ে উঠেছে। ইতিহাস ও উৎপাদন প্রক্রিয়ার দিক থেকেও পণ্য দুটির রয়েছে স্বতন্ত্র ও ঐতিহাসিক পরিচয়। ১৯২১ সালে মহাত্মা গান্ধীর স্বদেশী আন্দোলনের সময় বিদেশী কাপড় বর্জনের মধ্য দিয়ে কুমিল্লায় দেশীয় মোটা সুতা ও 'খাঁদ' বা গর্তে বসে প্যাডেল চালিয়ে তাঁত বোনার মাধ্যমে খাদির সূচনা হয়। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর স্থবির হয়ে পড়া এই শিল্পকে নতুন জীবন দেন বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমির (বার্ড) প্রতিষ্ঠাতা ড. আখতার হামিদ খান এবং চান্দিনার 'দি খাদি কো-অপারেটিভ'-এর প্রতিষ্ঠাতা শৈলেন গুহ। বর্তমানে এই হস্তশিল্প আধুনিক ফ্যাশন হাউসগুলোর হাত ধরে ফরাসি, স্প্যানিশ ও তুর্কি ফ্যাশন সচেতনদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। অন্যদিকে, বিংশ শতাব্দীর শুরুতে খনিন্দ্র সেন ও রামরতন সেনের হাতে মনোহরপুরে সূচনা হওয়া মাতৃভাণ্ডারের রসমালাই সম্পূর্ণ খাঁটি গরুর দুধ দীর্ঘ সময় ধরে জ্বাল দিয়ে ঘন ক্ষীর বানিয়ে ছানার গুটি ডুবিয়ে তৈরি করা হয়। কোনো কৃত্রিম উপাদান বা প্রিজারভেটিভ ছাড়াই তৈরি এই মিষ্টি উপমহাদেশের ভোজনরসিকদের কাছে এক অনন্য স্বাদের প্রতীক। তবে এই বিপুল সাফল্যের আড়ালে কিছু জটিল চ্যালেঞ্জও বিদ্যমান। শিল্প সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে কাঁচামাল যেমন—দুধ, তুলা ও রঙের আকাশচুম্বী দামের কারণে উৎপাদন খরচ বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দুপাশে মাতৃভাণ্ডার নাম ভাঙিয়ে শত শত নকল ও মানহীন রসমালাই বিক্রির ফলে আসল ব্রান্ডের সুনাম ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। পাশাপাশি, নারায়ণগঞ্জের মেশিনচালিত তাঁত ও পাওয়ারলুমের কাপড়ের সাথে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে চান্দিনা ও দেবীদ্বারের প্রান্তিক হস্তচালিত তাঁতিরা টিকতে না পেরে পেশা পরিবর্তন করছেন, যার ফলে দক্ষ কারিগরের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রবীণ ব্যবসায়ীদের মতে, এই ঐতিহাসিক দুটি শিল্পকে দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখতে ও বৈশ্বিক বাজারে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিতে সরকারি পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। খাদি কারিগরদের বাঁচিয়ে রাখতে সুতা ও তুলা ক্রয়ে সরকারি ভর্তুকি প্রদান, সহজ শর্তে বিশেষ ক্ষুদ্র ঋণ বিতরণ এবং হস্তচালিত পণ্যের জন্য আলাদা কিউআর কোড বা হলোগ্রাম যুক্ত ট্যাগ নিশ্চিত করা দরকার। একই সাথে মহাসড়কের নকল রসি বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক মোবাইল কোর্ট পরিচালনা এবং রসমালাইয়ের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানের কোল্ড-চেইন প্রযুক্তি ও ভ্যাকুয়াম এয়ারলাইন্স প্যাকেজিংয়ের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। সঠিক নীতি ও পৃষ্ঠপোষকতা পেলে খাদি এবং রসমালাই রপ্তানি করে বাংলাদেশ প্রতি বছর শত কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে সক্ষম হবে।



