গাজীপুরে ভাঙচুর রহস্য: সহানুভূতি আদায়ে ‘নাটক সাজানোর’ অভিযোগ বিএনপি নেতা শাহীনের বিরুদ্ধে

  • প্রকাশ: ১০ মার্চ ২০২৬, দুপুর ০৪:১৭
  • আপডেট: ১০ মার্চ ২০২৬, দুপুর ০৪:১৭
WhatsApp Image 2026-03-10 at 2.12.04 PM

গাজীপুর সংবাদদাতা:

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগে দলের নাম ভাঙিয়ে নিজস্ব আধিপত্য বিস্তার, ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ এবং চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে গাজীপুর মহানগরীর গাছা থানা বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক শাহীনের বিরুদ্ধে। নিজের ব্যবসায়িক স্বার্থ হাসিল করতে তিনি নিজ দলের নেতাকর্মী থেকে শুরু করে মৃত্যুশয্যায় থাকা রোগী- কাউকেই ছাড় দিচ্ছেন না বলে গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। এমনকি প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে নিজের অফিস নিজে ভাঙচুর করে এবং দলীয় শীর্ষ নেতাদের ছবি ভেঙে মিথ্যা মামলা সাজানোর মতো চাঞ্চল্যকর তথ্যও বেরিয়ে এসেছে।


জানা যায়, গত ২৬ ফেব্রুয়ারি গাছা থানা এলাকায় শাহীনের ব্যক্তিগত কার্যালয়ে একটি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। শাহীন একে দলীয় কার্যালয় ভাঙচুর ও তার ওপর হামলা বলে দাবি করলেও খোদ পুলিশ, স্থানীয় বিএনপি নেতা এবং ভুক্তভোগীদের বক্তব্যে ভিন্ন চিত্র ফুটে উঠেছে।


শাহীনের এসব অপকর্মে ক্ষুব্ধ স্থানীয় বিএনপির শীর্ষ নেতারাও। গাছা থানা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি এস এম নাঈম এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, "আমাদের নেতা তারেক রহমান যখন দলকে সুশৃঙ্খল করতে কঠোর পরিশ্রম করছেন, তখন শাহীন নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থে দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করছেন। তার অফিসে ভাঙচুরের যে কথা তিনি প্রচার করছেন, তা মূলত সাজানো নাটক। ঝুট ব্যবসা, ময়লা ও ডিশ ব্যবসার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ নিতেই তিনি নিজের অফিস নিজে ভাঙচুর করে প্রতিপক্ষের নামে মিথ্যা মামলা দিয়েছেন।" তিনি আরও জানান, মহানগর নেতৃবৃন্দের সাথে আলোচনা করে শাহীনকে ‘কারণ দর্শানোর নোটিশ’ (শোকজ) প্রদানসহ সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।


গাছা থানাধীন ৩৩ নং ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মোহাম্মদ আলী শাহীনের রোষানল নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "শাহীন এই এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা নন, তিনি বহিরাগত। তার উগ্র আচরণের কারণে এলাকায় প্রায়ই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে। ডিশ, ইন্টারনেট ও ময়লার ব্যবসা একাই নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে তিনি সাধারণ মানুষের সাথে সংঘাতে লিপ্ত হন।"


শাহীনের রোষানলের শিকার হয়েছেন খোদ নিজ দলের অঙ্গসংগঠনের নেতারাও। গাছা থানাধীন ৩৪ নং ওয়ার্ড ছাত্রদলের যুগ্ম-আহবায়ক মো. মিরাজ অভিযোগ করেন, "কারখানার ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিতে শাহীন আমাদের ওপর ‘আওয়ামী লীগের ট্যাগ’ লাগিয়ে মিথ্যা মামলা দিচ্ছেন। অথচ আমি ২০২২ সাল থেকে সক্রিয়ভাবে ছাত্রদল করছি। সে আমাদের ফাঁসাতে তারেক রহমান ও স্থানীয় এমপির ছবি নিজে ভাঙচুর করে মিথ্যা মামলায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। তার সাথে যারা রাজনীতি করছে, তাদের অনেকেই মাদক কারবারি।"


শাহীনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে অমানবিক অভিযোগটি করেছেন এমারত হোসেন নামে এক ব্যক্তির স্ত্রী লাবনী। তিনি জানান, ৫ আগস্টের পর শাহীন তাদের কাছে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় তার স্বামী ইমারতকে সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে ‘আওয়ামী লীগ’ সাজিয়ে পুলিশে ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। লাবনী বলেন, "আমার স্বামী কোনোদিন আওয়ামী লীগের পদে ছিলেন না, বরং তার কাছে বিএনপির সদস্য কার্ড আছে। কিন্তু চাঁদা না দেওয়ায় আজ তাকে জেল খাটতে হচ্ছে।"


নিষ্ঠুরতার এখানেই শেষ নয়। লাবনীর ভাসুর আতাউর রহমান একজন মুমূর্ষু রোগী, যার দুটি কিডনিই বিকল এবং বর্তমানে তিনি মৃত্যুশয্যায়। অথচ শাহীনের দেওয়া সাজানো মামলায় এই বৃদ্ধ ও অসুস্থ আতাউর রহমানকেও আসামি করা হয়েছে।


অফিস ভাঙচুরের ঘটনায় পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে শাহীনের অভিযোগের সত্যতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। গাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জানান, "আমি ঘটনার দিন ওই কার্যালয়ে গিয়েছিলাম। সেদিন কিছু চেয়ার-টেবিল ভাঙা অবস্থায় দেখলেও দলের কোনো নেতার ছবি ভাঙা দেখিনি। কিন্তু পরের দিন গেলে সেখানে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, তারেক রহমান এবং স্থানীয় এমপির ছবি ভাঙা অবস্থায় দেখতে পাই। প্রথম দিন সেখানে কোনো ছবি ছিল না।"


অন্যদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যায়, শাহীন কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের একটি অনুষ্ঠানে তৎকালীন প্রভাবশালী নেতা মামুন মণ্ডলের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন। এ ভিডিও ও ব্যানারের ছবি ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক সমালোচনা ও জনমনে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়। এছাড়া, ২০২৪ সালের গাজীপুর-২ আসনের সংসদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীকে মনোনীত জাহিদ আহসান রাসেলের পক্ষে শাহীন গাছা থানা নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ছিলেন, যা সম্পর্কিত একটি পত্রও প্রকাশিত হয়েছিল

Ad