টাঙ্গাইলে এমআরএ সনদবিহীন প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেন; ঝুঁকিতে গ্রামীণ অর্থনীতি

  • প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৬, দুপুর ০৪:০৭
  • আপডেট: ২৫ আগস্ট ২০২৬, দুপুর ০৪:০৭
WhatsApp Image 2026-08-25 at 11.42.40 AM

সুলতান কবির :

সমাজ সেবা অধিদপ্তরের স্বেচ্ছাসেবী সনদকে পুঁজি করে টাঙ্গাইল জেলাজুড়ে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে বিভিন্ন এনজিও এর ছদ্মনামে সমবায় সমিতি এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন।এই সব প্রতিষ্ঠান মাইক্রো-ক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির- এমআরএ'র সনদ ছাড়াই অতিরিক্ত সুদে ঋণ বিতরণ করায় ঝুঁকির মুখে পড়ছে জেলার গ্রামীণ অর্থনীতি। এ ছাড়াও সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে বিভিন্ন মেয়াদের এফডিআর( মেয়াদী আমানত) সংগ্রহ গ্রাহককে আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে।সরেজমিনে দেখা গেছে, সরকারি বিধি-বিধানকে উপেক্ষা করে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় এনজিওর আদলে ঋণ বিতরণ, আদায় ও সঞ্চয় কার্যক্রম চালাচ্ছে কিছু মুনাফালোভী ব্যক্তি ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। পাশবই ছাপানো, ঋণ বিতরণ ও আদায়ের জন্য কর্মী-ব্যবস্থাপক নিয়োগ, এমনকি একই নামে একাধিক শাখা খুলে প্রকাশ্যে সাইনবোর্ড লাগিয়েও চলছে এই অবৈধ ঋণ ও সঞ্চয় জমা নেওয়ার কারবার। অথচ দীর্ঘদিনেও নীরব এই বিষয়ে রয়েছে প্রশাসন।অভিযোগ রয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠান ঋণের জামানত হিসেবে গ্রাহকের কাছ থেকে স্বাক্ষর করা খালি চেক ও ফাঁকা স্ট্যাম্প রেখে দেয়। পরে কিস্তি দিতে দেরি হলেই তা দিয়ে ব্ল্যাকমেইল বা মামলার হুমকি দেয়া হয়। এভাবে ঋণের জালে আটকে সাধারণ মানুষ দরিদ্র থেকে হতদরিদ্রে পরিণত হচ্ছে। অন্যদিকে, অবৈধ সুদি কারবারিরা রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ হচ্ছে।সরেজমিন প্রতিবেদনে আরও উঠে এসেছে, শুধু ২৪-২৫ ও ২৫-২৬ এই দুই অর্থবছরেই টাঙ্গাইল জেলায় গ্রাহকদের প্রায় ৫০ কোটি টাকা নিয়ে উধাও হয়েছে প্রায় ১৫টি সমবায় সমিতি ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। সংগঠনগুলো হচ্ছে, সদর উপজেলার গালা ইউনিয়নের ধরনী সমাজ উন্নয়ন ফাউন্ডেশন, শুরু উন্নয়ন সংস্থা, টাঙ্গাইল সদর উপজেলার ছিলিমপুর ইউনিয়নের বরুহা বাজারের নাইন স্টার সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতিসহ টাঙ্গাইল সফল উন্নয়ন সংস্থা প্রমুখো।প্রতিবেদনে আরও উঠে আসে, সদর উপজেলার গালা ইউনিয়নের মোঃ শাহ্ আলম সমাজ সেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক থাকাকালীন শুধু নিজ ইউনিয়নেই ৫০টির বেশি স্বেচ্ছাসেবী সনদ দিয়েছেন। যার প্রত্যেকটিই ঋণ কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত। এই ইউনিয়ন থেকেই বেশ কিছু সংগঠন কোটি টাকা নিয়ে লাপাত্তা হয়ে গেছে। অভিযোগ আছে, সমাজসেবা অফিসের অডিটর আব্দুল বারীর সহযোগিতায় সুদি কারবারিদের সনদ দেয়া ও ভুয়া অফিস অডিটের বিনিময়ে তিনি কোটি টাকার মালিক বনে যান। নিজ এলাকায় গড়ে তোলেন প্রায় ৩কোটি টাকার ইউরোপীয় স্টাইলের আলিশান বাড়ি। এ ঘটনায় দুদকে একাধিক অভিযোগ এবং স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশের পর তাকে টাঙ্গাইল থেকে বদলি করা হয়।

এই সব প্রতিষ্ঠানে এফ ডি আর করে সর্বস্বান্ত আব্দুস সালাম, রাবেয়া খাতুন, জরিনা বেওয়া, আয়মনা বেওয়া জানান, আমাদের জীবন জমা করা সমস্ত টাকা নিয়ে পালিয়েছে সংস্থাগুলো, ফলে বর্তমানে আমাদের অবস্থা ভীষণ খারাপ, স্বামী সংসার নিয়ে চলাই দুষ্কর হয়ে গেছে। আশা করি, কর্তৃপক্ষ যত দ্রুত সম্ভব এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।এ প্রসঙ্গে টাঙ্গাইল সমাজ সেবা অধিদপ্তরের নবাগত উপ-পরিচালক শহিদুল্লাহ্ বলেন, আমি সদ্য এই জেলায় যোগদান করেছি এবং বিষয়টি নিয়ে কাজ শুরু করেছি। সাংবাদিকরা তথ্য দিয়ে সহায়তা করুন, আমি যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করব।এ বিষয়ে টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট শরীফা হক বলেন, “বিষয়টি নিয়ে আমি অবগত ছিলাম না। তবে এ ধরনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে অবশ্যই আইনানুগ কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমআরএ'র অনুমোদন ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান ঋণ কার্যক্রম চালাতে পারে না। এ ধরনের ভুয়া সংগঠন বন্ধে প্রশাসনের জোরালো অভিযান এবং জনসচেতনতা জরুরি। অন্যথায় টাঙ্গাইলের গ্রামীণ অর্থনীতি বড় ধাক্কার মুখে পড়বে।

Ad