বিষাক্ত ধোয়ার গ্রাসে জনপদ

  • প্রকাশ: ১২ জানুয়ারী ২০২৬, রাত ০৮:০২
WhatsApp Image 2026-01-12 at 10.01.41 AM

মীর খাইরুল বরগুনা :জেলার নলটোনা ইউনিয়নের আজগরকাঠী গ্রামে অবৈধ কাঠের চুল্লীতে কয়লা উৎপাদন এখন এক ভয়াবহ পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিয়েছে। বিশখালী নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা একাধিক কাঠের চুল্লী থেকে প্রতিনিয়ত নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে পড়ছে আশপাশের জনপদ। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, দিনের পর দিন ধোঁয়ার সংস্পর্শে থেকে শিশু, নারী ও বৃদ্ধদের মধ্যে শ্বাসকষ্ট, বমি, মাথা ঘোরা, চোখ জ্বালাপোড়া ও দীর্ঘমেয়াদি রোগের উপসর্গ বাড়ছে।


এলাকাবাসীর অভিযোগ, এসব চুল্লীর কোনো পরিবেশগত ছাড়পত্র বা প্রশাসনিক অনুমোদন নেই। তবু প্রকাশ্যে কাঠ পুড়িয়ে কয়লা উৎপাদন চললেও কার্যকর নজরদারির অভাবে পরিস্থিতি দিন দিন ভয়াবহ হয়ে উঠছে। ধোঁয়ার কারণে ঘরে জানালা-দরজা বন্ধ রেখেও স্বস্তি মিলছে না। রাতের বেলা চুল্লীর মুখ খুলে দিলে ঘন ধোঁয়ায় স্বাভাবিক ঘুম পর্যন্ত ব্যাহত হচ্ছে।


আজগরকাঠী গ্রামের বাসিন্দা আমিনুল ইসলাম সবুজ বলেন, 'এই অবৈধ চুল্লীর কারণে ঘরে থাকা কষ্টকর হয়ে পড়েছে। ছোট ছেলেমেয়েদের নিয়ে বাঁচাই দায়। আমরা একাধিকবার প্রশাসনের কাছে গিয়েছি, কিন্তু কোনো স্থায়ী সমাধান পাইনি।'


আরেক ভুক্তভোগী গৃহবধু শিরিন আক্তার ময়না বলেন, 'খাবার খেতে বসলে ধোঁয়ার গন্ধে বমি আসে। রাতে ধোঁয়ায় ঘুমানো যায় না। থানায় অভিযোগ করেছি, কিন্তু ভয় কাজ করে, কিছু বললেই হুমকি আসে।'


স্থানীয় মৎস ব্যবসায়ী আবুল কালাম জানান, ধোঁয়ার কারণে রবিশস্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি বলেন, 'ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। বাচ্চারা পড়াশোনা করতে পারে না। পরিবেশ পুরো ধ্বংসের পথে।' শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়, সামাজিক নিরাপত্তাও পড়েছে হুমকির মুখে।

তিনি আরও অভিযোগে বলেন, অবৈধ চুল্লীর বিরুদ্ধে মুখ খুললেই মালিকপক্ষের লোকজন হুমকি দেয়, এমনকি মারধরের আশঙ্কাও থাকে। ফলে ভুক্তভোগীরা আতঙ্কে থাকলেও অনেকেই প্রকাশ্যে অভিযোগ করতে সাহস পাচ্ছেন না।



অন্যদিকে, চুল্লীতে কর্মরত শ্রমিকরা বলছেন, এই কাঠের চুল্লীই তাদের জীবিকার একমাত্র উৎস। শ্রমিক সোবহান খান বলেন, 'এই কাজ করে সংসার চলে। দৈনিক প্রায় এক হাজার টাকা আয় হয়। চুল্লী বন্ধ হলে আমাদের পরিবার না খেয়ে থাকবে।' এতে করে একদিকে কর্মসংস্থান, অন্যদিকে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের দ্বন্দ্ব আরও প্রকট হয়ে উঠছে।


চুল্লী মালিক কবির মৃধা স্বীকার করেন, তাদের কোনো বৈধ অনুমোদন নেই। তবে তিনি দাবি করেন, 'সরকার সহযোগিতা করলে আধুনিক প্রযুক্তি এনে পরিবেশের ক্ষতি অনেক কমানো সম্ভব।'

আরেক চুল্লী মালিক মাসুদ ফিটার বলেন, 'অনেক শিল্প-কারখানায় পরিবেশ দূষণ হয়, কিন্তু আমাদের ছোট প্রতিষ্ঠানেই বারবার অভিযান হয়।'


এ বিষয়ে বরগুনা সদর থানার অফিসার ইনচার্জ মো. আ. আলীম জানান, সদর থানার ক্যাচমেন্ট এলাকার বাবুগঞ্জ ফাঁড়ির ইনচার্জকে সরেজমিনে তদন্ত করে প্রতিবেদন তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মহোদয়ের সঙ্গে এই অবৈধ চুল্লী বন্ধ করে দেওয়া হবে।


এবিয়ে বরগুনার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) অনিমেষ বিশ্বাস বলেন, 'জেলা প্রশাসন দ্রুত ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে অবৈধ চুল্লীর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


পরিবেশ আইন অনুযায়ী অনুমোদনহীনভাবে কাঠ পুড়িয়ে কয়লা উৎপাদন দণ্ডনীয় অপরাধ হলেও বাস্তবে এর প্রতিফলন খুব কমই দেখা যাচ্ছে। একদিকে কর্মসংস্থানের যুক্তি, অন্যদিকে মানুষের জীবন ও পরিবেশ রক্ষার প্রশ্ন, এই দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষায় প্রশাসনের দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি। অবৈধ কাঠের চুল্লীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে এই জনপদ অচিরেই স্থায়ী পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন সচেতন মহল।

Ad