একই চেয়ারে দুই দশক। সম্পদে টইটম্বুর জুলফিকার আলী
পিডিবি-দুর্নীতি পর্ব-১
মোঃ আলমগীর হোসেন:
সৈয়দ জুলফিকার আলী, দেখতে মাশাআল্লাহ পুরোপুরি আল্লাহর ওলি। ভেতরটা একদম ফাঁকা। কথা বলেন অনেক গুছিয়ে। মনে হবে সাক্ষাৎ এক দরবেশ। তার সাথে দেখা করতে লাগে বিশেষ অনুমোদন। অনেক চেষ্টার পর সেই মহান ব্যক্তির দেখা পেলাম। তার পদবী- বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের অর্থ পরিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক (বহিঃ অর্থ ও ব্যাংক)। সরকারের আইন কানুনকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে দুই দশকেরও বেশি সময় যাবৎ একই অফিসে একই চেয়ারে অধিষ্ঠিত আছেন। সরকারি চাকরি বিধি মোতাবেক একজন ব্যক্তি একই দপ্তরে ৩ বছরের বেশি হলেই অন্যত্র চলে যাওয়ার কথা থাকলেও সৈয়দ জুলফিকার আলীর ক্ষেত্রে ঘটেছে সম্পুর্ন উল্টো। দুই দশকে দেশে মানুষের জীবনে কত কিছুর পরিবর্তন হয়েছে। কত সরকার এসেছে, গেছে শুধু যায়নি জুলফিকার আলী। পরিবর্তন হয়নি তার চেয়ারের। কোন অদৃশ্য ক্ষমতা বলে তার এই গেড়ে বসা তা নিয়ে অনেকেই আশ্চর্য্য। আছে নানা আলোচনা, সমালোচনা। কিন্তু দেখার কেউ নেই। তাও আবার সরকারি চাকরি। নেই কোন জায়গা পরিবর্তনের ঝামেলা। আছে শুধু প্রমোশন বাগিয়ে নেওয়ার সুযোগ। সরেজমিনে গিয়ে তার সাথে কথা বলে জানা গেছে, জীবনের শুরুতে তিনি বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেছেন। এর মধ্যে যমুনা গ্রুপ ও বিভিন্ন এনজিও প্রতিষ্ঠান অন্তর্ভুক্ত। তার কথা মতে সেখানে সামান্য বেতনে কোন মতে দিনাতিপাত করতেন। জীবনে অনেক কষ্ট করেছি ভাই শেষ পর্যন্ত একটা সম্মানের জায়গায় আসতে পারছি। তিনি জানান বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরির পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি দপ্তরেও চেষ্টা চালিয়েছি। সেই ধারাবাহিক চেষ্টার ফলই হলো আজকের বিদ্যুৎ ভবনে চাকরি (সোনার হরিণ)। দৈনিক পর্যবেক্ষণ এর চলমান অনুসন্ধানে এখন পর্যন্ত কয়েক কোটি টাকা মূল্যের ৫তলা বিশিষ্ট একটি বাড়ির সন্ধান মিলেছে। প্রথমে তিনি নিজেকে ওই বাড়ির কেয়ার টেকার বলে দাবি করলেও পরে নিজের বাড়ি বলে স্বীকার করেন। নামে বেনামে আরো অঢেল সম্পদ আছে বলে অভিযোগ আছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো এই বাড়ী বানাতে তার নিজের পৈতৃক কোন সম্পদ বিক্রি করতে হয়নি। এমনকি চাকরির আগে ও পরে তার দৃশ্যমান এমন কোন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও ছিলোনা। স্বাভাবিক কারনেই জনমনে প্রশ্ন জাগে শুধুমাত্র বেতনের টাকা দিয়ে কি এতো বড় একটা বাড়ী করা সম্ভব? তাহলে এই অঢেল অর্থের উৎস কি? আর সরকারি যে সকল সংস্থা এই সকল বিষয় দেখার কথা তাদেরইবা কাজ কি? সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে, নিশ্চয়ই জুলফিকার আলীর স্ত্রী, সন্তানসহ এই শহরের কোন খাবার খাননি শুধু আলো আর বাতাস ছাড়া। এই শহরে তাও সম্ভবনা বলেই অনেকে মনে করেন। বেতনের সব টাকা এখানে লগ্নি করলেও সম্ভবনা। নাহ, তাও সম্ভব না। তাহলে কি উনি শুধু টাকা খেয়েছেন। তার অফিসের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তির সাথে কথা বলে জানা গেছে, জুলফিকার আলী ফাইল আটকিয়ে বিভিন্ন দোহায় দিয়ে আমাদের থেকে টাকা নেন। তার চাহিদা না মিটলে ফাইল ছাড় দেন না। এছাড়াও বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান থেকেও তার স্ত্রীর নামে কোটি কোটি টাকার অনুদান (একটি ফাউন্ডেশনের কথা বলে) নেন বলে জানান। আমাদের কিছু বলার নেই উনি (জুলফিকার আলী) জানতে পারলে আমাদের চাকরি থাকবেনা। দয়া করে এই আঙ্গিনায় আমাদের সাথে কথা না বললে খুশি হবো। ডিপিডিসি ভবনে তিনি এতটাই পরিচিত ওখানকার ইট, বালু, কণা সবাই তার কাছে ধরা। তার হাত দিয়েই তো সকলের রুটি রুজির ব্যবস্থা হয়। অভিযোগ আছে, জুলফিকার আলীর গ্রামের বাড়ী ফরিদপুর হওয়ায় গত আওয়ামী সরকারের আমলে গোপালগঞ্জের প্রভাব খাটিয়ে যা ইচ্ছে তাই করেছেন যা এখনো চলমান রয়েছে। তার সেচ্ছাচারিতা ও রোষানলে পড়ে অনেকেরই কপাল পুড়েছে মর্মে জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি। সকলেই তার সম্পদ ও আওয়ামী যোগসাজশের পুর্ণ তদন্ত দাবি করেছেন। ইতিহাস থেকে জানা যায়,বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) বাংলাদেশ সরকারের একটি সংস্থা। ১৯৭২ সালে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র রূপে বাংলাদেশের উত্থানের পর দেশটির বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নে একটি পাবলিক সেক্টর প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। সংস্থাটি দেশের বিদ্যুৎ অবকাঠামো নির্মাণ এবং দেশের অধিকাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিচালনার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত। প্রধানত দেশের নগরাঞ্চলে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং বণ্টনের জন্য বি.পি.ডি.বি. দায়বদ্ধ। বোর্ডটি এখন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিদ্যুৎ বিভাগের অধীনে রয়েছে। বিভিন্ন সময় মিডিয়ার কল্যাণে জানা যায়, দেশে যে কয়েকটি দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান আছে তার উপরের সারিতেই আছে বিদ্যুৎ খাতের নাম। বিদ্যুতের কিছু কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর মাধ্যমে যেমন দেশের অর্থ পাচার হচ্ছে বিদেশে তেমনি যে সরকারই ক্ষমতায় বসুক তাদের ভাব মূর্তিও ক্ষুন্ন হচ্ছে। যে কারণে হাজার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়ার পরও প্রতিষ্ঠানটি আলোর মুখ দেখতে পায়না। বিদ্যুৎ এমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ সেক্টর যার সাথে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত শিল্প, কলকারখানা, আবাসন ও মানুষের জীবন জীবিকা। বিদ্যুৎ ধ্বংস মানে মানুষের জীবন ধ্বংস। বিদ্যুৎ ধ্বংস মানে একটি দেশের উন্নয়ন ধ্বংস। এই ধ্বংস যাদের হাত ধরে হচ্ছে তাদেরই একজন সৈয়দ জুলফিকার আলী। এসকল বিষয় তার সাথে কথা বলার এক পর্যায়ে তিনি বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতি প্রদর্শনের চেষ্টা করেন। চলবে--



