চাঁদাবাজির মামলায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কথিত দুই সাংবাদিকের ৫ বছরের সাজা

  • প্রকাশ: ১১ মে ২০২৬, দুপুর ০৪:২৬
  • আপডেট: ১১ মে ২০২৬, দুপুর ০৪:২৬
1000196757

এনামুল হক আরিফ ,জেলা প্রতিনিধি ব্রাহ্মণবাড়িয়া 

আদালতের কড়া বার্তা সাংবাদিকতার নাম ভাঙিয়ে প্রতারণা করলে রেহাই নেই

রায় ঘোষণার পর কারাগারে প্রেরণ, স্বস্তি প্রকাশ শিক্ষক সমাজ ও সচেতন মহলের

অবশেষে আইনের কঠোর বার্তা পৌঁছে গেল অপ-সাংবাদিকতা ও সাংবাদিক পরিচয়ে চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িতদের কাছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে চাঁদা দাবির ঘটনায় এস.এম আলী আজম ও আশিকুর রহমান রনি নামে দুই কথিত সাংবাদিককে পাঁচ বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একইসঙ্গে রায় ঘোষণার পরপরই আদালত তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।রোববার দুপুরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ দ্বিতীয় আদালতের বিচারক মাসুদ পারভেজ বহুল আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। আদালতের এ রায়ে শিক্ষক সমাজ, সচেতন নাগরিক ও প্রকৃত সাংবাদিকদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে। অনেকেই মনে করছেন, দীর্ঘদিন ধরে সাংবাদিকতার মহান পেশাকে ব্যবহার করে যারা সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি ও ব্ল্যাকমেইল করে আসছিল, তাদের বিরুদ্ধে এটি একটি যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত।মামলার বিবরণে জানা যায়, ২০২১ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলার শরীফপুর পূর্ব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে নিজেদের সাংবাদিক পরিচয় দেন এস.এম আলী আজম ও আশিকুর রহমান রনি। তারা বিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিল-ভাউচার, আর্থিক কাগজপত্র ও গুরুত্বপূর্ণ নথি দেখতে চান। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. হাবিবুর রহমান তাদের জানান, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী এসব নথিপত্র পরিদর্শনের জন্য নির্ধারিত কর্তৃপক্ষ রয়েছে এবং যথাযথ প্রক্রিয়া ছাড়া তা দেখানো সম্ভব নয়।এতেই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন ওই দুই ব্যক্তি। অভিযোগ রয়েছে, তারা শিক্ষকদের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও মানহানিকর সংবাদ প্রকাশের ভয় দেখিয়ে ২০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করেন। শুধু তাই নয়, তারা শিক্ষকদের সঙ্গে অসদাচরণ ও হুমকিমূলক আচরণও করেন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে স্থানীয় লোকজন ও শিক্ষকরা এস.এম আলী আজমকে আটক করেন। তবে অপর আসামি আশিকুর রহমান রনি মোটরসাইকেলে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নির্দেশে আটক ব্যক্তিকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়।

ঘটনার দিনই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বাদী হয়ে আশুগঞ্জ থানায় দণ্ডবিধির ৪১৯, ৩৮৫ ও ৫০৬ ধারায় মামলা দায়ের করেন। তদন্ত শেষে পুলিশ আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয়। দীর্ঘ শুনানি, সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক শেষে আদালত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় দুই আসামির বিরুদ্ধে পাঁচ বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের রায় প্রদান করেন।

বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সৈয়দ তফসির আহমেদ তানভীর বলেন,

“সাংবাদিকতা মানুষের অধিকার রক্ষার পেশা, চাঁদাবাজির হাতিয়ার নয়। সাজাপ্রাপ্তরা দীর্ঘদিন ধরে সাংবাদিকতার নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষের কাছে ভয়ভীতি সৃষ্টি করে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করতেন। আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ করে সঠিক রায় দিয়েছেন।”এদিকে আশুগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি সেলিম পারভেজ বলেন,“প্রকৃত সাংবাদিকরা কখনো চাঁদাবাজি, ব্ল্যাকমেইল বা প্রতারণার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন না। সাজাপ্রাপ্তরা নামসর্বস্ব পত্রিকার কার্ড ব্যবহার করে এবং অনুমোদনহীন ফেসবুক পেজ খুলে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করতেন। তারা মূলধারার সাংবাদিকতার কেউ নন। আদালতের এ রায় ভুয়া সাংবাদিক ও অপ-সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে কঠোর সতর্কবার্তা।”সচেতন মহলের দাবি, দেশের বিভিন্ন এলাকায় সাংবাদিক পরিচয়ে প্রতারণা, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও চাঁদাবাজির ঘটনা বাড়ছে। এতে প্রকৃত সাংবাদিকদের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই এ ধরনের অপরাধীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান ও কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তারা।বিশ্লেষকদের মতে, এই রায় শুধু দুই ব্যক্তির সাজা নয়; এটি সাংবাদিকতার পবিত্রতা রক্ষায় আদালতের একটি দৃঢ় অবস্থান। কারণ সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধ করলে তা শুধু ব্যক্তিগত অপরাধ নয়, বরং পুরো গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর আঘাত। আদালতের এই কঠোর সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে ভুয়া পরিচয়ে প্রতারণা ও চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িতদের জন্য বড় ধরনের সতর্ক সংকেত হয়ে থাকবে।

Ad