ইউপি ভোট: রাজশাহীতে বিএনপির ঘরে ঘরে চেয়ারম্যান প্রার্থী

  • প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬, দুপুর ০৪:২৫
WhatsApp Image 2026-08-31 at 3.59.23 PM

সৈয়দ মোঃ মাসুদ, রাজশাহী:

৭২ ইউপিতেই একাধিক প্রার্থী, বড় চ্যালেঞ্জ ঐক্য, দুশ্চিন্তা বিএনপিতে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের তফসিল এখনো ঘোষণা হয়নি। তবে এরই মধ্যে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতায় সরগরম হয়ে উঠছে রাজশাহীর মাঠ। কেন্দ্রীয় নির্দেশনার অপেক্ষায় না থেকে বিভিন্ন এলাকায় জনসংযোগ ও প্রচার শুরু করেছেন বিএনপির নেতারা। জেলার প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নেই চেয়ারম্যান পদে একাধিক নেতা প্রার্থিতা জানান দিচ্ছেন।রাজশাহী জেলায় মোট ৭২টি ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে। এর মধ্যে পবা উপজেলায় ৮টি, গোদাগাড়ীতে ৯টি, তানোরে ৭টি, মোহনপুরে ৬টি, বাগমারায় ১৬টি, দুর্গাপুরে ৭টি, পুঠিয়ায় ৬টি, চারঘাটে ৬টি এবং বাঘায় ৭টি ইউনিয়ন রয়েছে।দলীয় ও মাঠপর্যায়ের সূত্র বলছে, কোনো কোনো ইউনিয়নে তিন থেকে চারজন পর্যন্ত বিএনপি নেতা চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কোথাও সম্ভাব্য প্রার্থীর সংখ্যা আরও বেশি। ফলে নির্বাচনের আগে একাধিক নেতাকে সমঝোতায় এনে একজনকে দল-সমর্থিত প্রার্থী করা বিএনপির জন্য বড় সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার গনিপুর ইউনিয়নে বিএনপির অন্তত ছয়জন নেতা ও সমর্থক চেয়ারম্যান পদে আগ্রহী। এই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হিসেবে তিন দফায় দায়িত্ব পালন করেছেন উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান রঞ্জু। এবার তিনি উপজেলা চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হতে আগ্রহী। এরই মধ্যে তিনি উপজেলাজুড়ে ব্যানার-পোস্টার সাঁটিয়েছেন।ফলে গনিপুর ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে আগ্রহীদের মধ্যে রয়েছেন ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মুর্তুজা মৃধা বকুল, বিএনপি নেতা জাকিরুল ইসলাম জাকির, এনামুল হক, জেলা বিএনপির সাবেক সদস্য হাবিবুন নবী দেওয়ান শাকিল এবং জিয়া মঞ্চের জেলা কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক প্রকৌশলী ফায়সাল রানা।একই উপজেলার গোয়ালকান্দি ইউনিয়নেও বিএনপির অন্তত ছয়জন নেতা ও সমর্থক চেয়ারম্যান পদে আগ্রহী। তাঁরা হলেন ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি জহুরুল ইসলাম খোকন, সাধারণ সম্পাদক আকরামুল ইসলাম, ২ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি ও ইউনিয়নের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বকুল সরদার, বিএনপি নেতা মামুনুর রশিদ মামুন ওরফে মামুন মহুরী এবং উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক আহ্বায়ক আব্দুল লতিফ মুকুল।স্থানীয় নেতারা বলছেন, প্রার্থিতার বিষয়ে এখনো স্থানীয় পর্যায়ে আনুষ্ঠানিক কোনো সাংগঠনিক নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। ফলে সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজেদের মতো করেই নির্বাচনী প্রস্তুতি নিচ্ছেন।বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, প্রার্থিতার বিষয়ে এখনো স্থানীয় পর্যায়ে কোনো সাংগঠনিক নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। তবে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান জেলা ও মহানগর নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় দলীয় ঐক্য এবং একক প্রার্থীর পক্ষে সবাইকে কাজ করার বিষয়ে নির্দেশনা দিচ্ছেন।কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কেউ প্রার্থী হলে তাঁর বিরুদ্ধে বহিষ্কারসহ সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। তবে আনুষ্ঠানিক নির্দেশনার আগেই একাধিক নেতা মাঠে নেমে পড়ায় শেষ পর্যন্ত সবাইকে একজনের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ করা কঠিন হতে পারে।বিএনপির নেতাদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন দলীয়ভাবে ইউপি নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় এবার স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচন নিয়ে নেতাদের মধ্যে আগ্রহ-উৎসাহ বেশি। তবে এই আগ্রহকে দলীয় শৃঙ্খলার মধ্যে রেখে একক প্রার্থী নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থীকে সমঝোতায় আনতে না পারলে স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধ ও বিভক্তি তৈরি হতে পারে। এতে দলের সাংগঠনিক শক্তি দুর্বল হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। তাই তফসিল ঘোষণার আগেই সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে সমন্বয় করে একজনের পক্ষে সবাইকে দাঁড় করাতে হবে বিএনপিকে।স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপির নেতাদের মধ্যে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ নিয়েও আলোচনা রয়েছে। স্থানীয় নেতাদের ধারণা, আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী বর্তমানে আত্মগোপনে থাকলেও তফসিল ঘোষণার পর তাঁরা বিভিন্ন এলাকায় প্রার্থী হওয়ার চেষ্টা করতে পারেন। তবে তাঁদের মোকাবিলায় কেন্দ্র থেকে এখনো কোনো নির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়নি।অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর সম্ভাব্য প্রার্থীরাও আগে থেকেই মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। দলটির প্রায় সব ইউনিয়নেই প্রার্থী ঘোষণা হয়েছে বলে স্থানীয় নেতারা জানিয়েছেন। একক প্রার্থীকে সামনে রেখে তারা মাঠে কাজ করছে।ফলে বিএনপিকে দলের অভ্যন্তরের একাধিক প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা সামলানোর পাশাপাশি বাইরের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদেরও মোকাবিলা করতে হবে।এদিকে ইউপি নির্বাচনের প্রস্তুতি দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীন গত বৃহস্পতিবার বলেছেন, বছরের শেষ দিকে ইউপি নির্বাচন শুরুর প্রস্তুতি চলছে। প্রায় সাড়ে চার হাজার ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে যেগুলো নির্বাচনের উপযোগী, প্রথম ধাপে সেগুলোতে ভোট নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সেপ্টেম্বরে তফসিল ঘোষণা হতে পারে।ইসি সূত্র বলছে, তফসিল ও ভোটের মধ্যে গড়ে দুই মাস সময় রাখার রীতি এবং ইউপির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে ১৮০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করার আইনি বাধ্যবাধকতা বিবেচনায় নিয়ে সময়সূচি নির্ধারণ করা হবে।এ ছাড়া বন্যা, দুর্গাপূজা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যস্ততা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরীক্ষা, আগামী বছরের রমজান ও ঈদসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিতে হচ্ছে কমিশনকে। এসব কারণে নভেম্বরের শেষ দিকে ইউপি ভোট শুরুর সম্ভাবনাই বেশি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।সব মিলিয়ে তফসিল ঘোষণার আগেই রাজশাহীর ইউনিয়নগুলোতে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতা বাড়ছে। তবে শেষ পর্যন্ত দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে কতজন প্রার্থিতা থেকে সরে দাঁড়াবেন এবং একক প্রার্থীর পক্ষে কতটা ঐক্য ধরে রাখা সম্ভব হবে -এখন সেটিই দেখার বিষয়।

Ad