খাগড়াছড়িতে সহিংসতা : নারীদের জীবনে হাহাকার, শিশুদের স্বপ্ন ভস্মীভূত
নিজস্ব প্রতিবেদক:
‘একনিমেষেই সব শেষ হয়ে গেল। এত দিন ধরে তিল তিল করে গড়ে তোলা ঘর পুড়িয়ে দিল, দোকানটাও জ্বালিয়ে দিল। তারা তো শুধু আমার ঘর ও দোকান পোড়ায়নি, আমার ভাত খাওয়ার অবলম্বনও নিয়ে গেছে। এখন আমি কীভাবে চলব? আমার দুই মেয়ের পড়াশোনার খরচ কীভাবে দেব?’—কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন লা সা প্রু মারমা।স্বামীহারা লা সা প্রু সংসার চালাতেন গুইমারা উপজেলার রামেসু বাজারে ছোট্ট কাপড়ের দোকানের আয়ে। সহিংসতার আগুনে সেই দোকানও নেই, নেই বসতবাড়ি। সর্বস্ব হারিয়ে হতাশায় ডুবে আছেন তিনি।
গত রোববার বিকেলে খাগড়াছড়ির গুইমারার রামেসু বাজারে ভয়াবহ সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। পাহাড়ি কিশোরীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগে ‘জুম্ম-ছাত্র জনতা’র ডাকা অবরোধকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ-সংঘর্ষ হয়। এতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় এক পক্ষের সঙ্গে সংঘর্ষে গুলি চালানো হলে তিন পাহাড়ির মৃত্যু হয়। পরে রণক্ষেত্রের মতো পরিস্থিতিতে প্রায় অর্ধশত বসতবাড়ি ও অন্তত ৪০টি দোকান পুড়িয়ে দেওয়া হয়।
সহিংসতার আগুনে রামেসু বাজারের পাহাড়ি নারী-পুরুষেরা এক নিমিষেই হারিয়েছেন মাথা গোঁজার ঠাঁই ও জীবিকার অবলম্বন।লা সা প্রু মারমা ক্ষোভ নিয়ে বলেন, ‘সবাই শুধু আগুনের তালে থাকে। কিছু হলেই আগুন ধরিয়ে দেয়। আমাদের ঘরবাড়ি কেন পুড়িয়ে দেবে? কেন দোকান জ্বালিয়ে দেবে? তার চেয়ে আমাদের মেরে ফেলুক।’
তার দুই জা—শিনু চিং চৌধুরী ও হ্লা পাই মারমাও একই পরিণতির শিকার। শিনু চিং, স্থানীয় এক স্কুলের শিক্ষিকা। ঋণ নিয়ে দোতলা ভবন তুলে দোকান দিয়েছিলেন। সেই দোকান ও বসতবাড়ি—দুটোই ছাই হয়ে গেছে। ঢাকায় পড়ুয়া মেয়ে আর কোচিং করা ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি এখন দিশেহারা। কান্নাজড়িত কণ্ঠে প্রশ্ন করেন, ‘ঋণ শোধ করব কীভাবে? সন্তানদের পড়াশোনার খরচ দেব কীভাবে? ঘর চালাব নাকি লোন শোধ করব?’হ্লা পাই মারমার অবস্থাও একই। তার দুই মেয়ে, একজন এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে পড়েন, অন্যজন সদ্য কলেজে ভর্তি হয়েছে। সব হারিয়ে তিনি ভেঙে পড়েছেন। বলেন, ‘এক কাপড়েই ঘর ছেড়েছি। কিছুই বের করতে পারিনি। ঘরের সবকিছু পুড়ে ছাই।’
সহিংসতার আগুন শুধু বড়দের মাথার উপর ছাদ কেড়ে নেয়নি, কিশোরদের স্বপ্নও জ্বালিয়ে দিয়েছে। হ্লা পাইয়ের ছোট মেয়ে ক্ল্যাচিং প্রু মারমা সদ্য একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছে। নতুন বইগুলোতে ভালো করে চোখ বুলানোর আগেই সেগুলো আগুনে পুড়ে ছাই। চোখ ভরা জল নিয়ে সে বলল, ‘নতুন বইগুলো এখনো ভালো করে উল্টে দেখার সুযোগ পাইনি। তার আগেই ওরা আমার নতুন বইগুলো পুড়িয়ে দিল।’
তার প্রশ্ন, ‘তারা আমাদের ঘর কেন জ্বালিয়ে দিল? জিনিসপত্র নিয়ে যেত, অন্তত রাতে তো ঘরে থাকতে পারতাম। এখন সে সুযোগটুকুও নেই।’দিনের আলো ফুরিয়ে আসছিল, রামেসু বাজারের পোড়া টিলায় বসে লা সা প্রু মারমা, শিনু চিং চৌধুরী, হ্লা পাই মারমা আর ক্ল্যাচিং প্রু মারমাদের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। সূর্য অস্ত যাচ্ছিল, নামছিল রাতের আঁধার।রোববারের আগুন শুধু বসতবাড়ি পোড়ায়নি, পুড়িয়ে দিয়েছে পাহাড়ি পরিবারের স্বপ্ন, শিশুদের শিক্ষা, নারীদের আত্মনির্ভরতার লড়াই। এখন তাঁদের চোখে কেবল অশ্রু, ক্ষোভ ও ভয়ের ছাপ। সামনে কী অপেক্ষা করছে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভরা তাঁদের জীবন।


