বিলিয়ন ডলারের বন্দী
ইমদাদুল হক,সাংবাদিক ও কলামিস্ট:
বিশ্বজুড়ে আটকা ইরানের সম্পদ
তেহরানের হাজার কোটি ডলার যেভাবে মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতির সবচেয়ে শক্তিশালী দরকষাকষির হাতিয়ার হয়ে উঠেছে
ধরুন, আপনার সারাজীবনের সঞ্চয় ব্যাংকে জমা, কিন্তু একটি চাবির অভাবে তা স্পর্শ করা যাচ্ছে না। এই চাবি অন্যের হাতে। ঠিক এই অবস্থায় দশকের পর দশক ধরে রয়েছে ইরান। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ব্যাংকে শত বিলিয়ন ডলার আটকে আছে তেহরানের, অথচ হাতের মুঠোয় নেই একটি পয়সাও।ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সাম্প্রতিক আলোচনায় এই অর্থই এখন কেন্দ্রবিন্দু। একদিকে তেহরানের অর্থনৈতিক বেঁচে থাকার প্রশ্ন, অন্যদিকে ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক চাপের অস্ত্র। যে দেশ যত বেশি এই চাবি নিয়ন্ত্রণ করে, সে তত বেশি ক্ষমতাধর।"এই জব্দকৃত অর্থই হতে পারে ওয়াশিংটন-তেহরান সম্পর্কের ভবিষ্যৎ সমঝোতার কেন্দ্রবিন্দু।"
কোথায় কতটা?
দক্ষিণ কোরিয়া-সবচেয়ে বড় অঙ্ক, তেল বাণিজ্যে জমা
জাপান-ঐতিহাসিক তেল আমদানির বিনিময়
কাতার-২০২৩-এ কোরিয়া থেকে স্থানান্তরিত
চীন-নিষেধাজ্ঞার মাঝেও বাণিজ্য অব্যাহত
ভারত-জ্বালানি আমদানি থেকে সঞ্চয়
আরও যেখানে-UAE, সিঙ্গাপুর, জার্মানি, তুরস্ক
২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তির পর ইরান ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ পেয়েছিল। কিন্তু ২০১৮ সালে ট্রাম্পের প্রত্যাহারের পর সেই দরজা আবার বন্ধ হয়ে যায়। দেশটির মুদ্রা রিয়াল ধসে পড়ে, মূল্যস্ফীতি আকাশচুম্বী হয়, আর আমদানি-রপ্তানি প্রায় স্তব্ধ।
একটি দীর্ঘ ইতিহাস
১৯৭৯ – প্রথম জব্দ
জিম্মি সংকটের জেরে জিমি কার্টার ইরানের প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার আটক করেন।
১৯৮১ – আলজিয়ার্স চুক্তি
সংকটের অবসান, কিছু অর্থ ফেরত। তবে বড় অংশ ঋণ পরিশোধে চলে যায়।
২০১৫ – জেসিপিওএ
পরমাণু চুক্তিতে ১০০ বিলিয়নের বেশি সম্পদ ছাড়ের সুযোগ মেলে।
২০১৮ – আবার বন্ধ
ট্রাম্পের প্রত্যাহার ও "সর্বোচ্চ চাপ" নীতিতে সম্পদ পুনরায় জব্দ।
২০২৩ – আংশিক মুক্তি
কোরিয়ার ৬ বিলিয়ন ডলার কাতারে স্থানান্তর, তবে কঠোর শর্তে।
এখন প্রশ্ন হলো: ইসলামাবাদের আলোচনায় কি সত্যিই কিছু পরিবর্তন আসবে? হোয়াইট হাউস বলছে, "সম্পদ ছাড়ের খবর সত্য নয়"। কিন্তু কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, না বলার মধ্যেও একটা হ্যাঁ লুকিয়ে থাকে।কারণ এই বিপুল সম্পদ শুধু ইরানের অর্থনৈতিক প্রশ্ন নয়, এটি মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার প্রশ্নও। আর সেই স্থিতিশীলতার দরজার চাবি এখন দুই পক্ষের মধ্যে ঝুলছে।
ইতিহাস বলে, অর্থনৈতিক চাপ ছাড়া কূটনৈতিক সমঝোতা হয় না। আর সমঝোতা ছাড়া শান্তি নয়। তেহরানের শত বিলিয়ন ডলার তাই শুধু সংখ্যা নয় — এটি একটি যুদ্ধ ও শান্তির মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা প্রশ্নচিহ্ন।

.webp)

