আগুন ও সোনার সাম্রাজ্য — পারস্যের অজানা ইতিহাস
ইমদাদুল হক , সাংবাদিক ও কলামিস্ট:
প্রথম অধ্যায়: পাহাড়ের ছেলেরা যেদিন পৃথিবী জয় করল
খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দী। পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষ তখনও জানে না পৃথিবীটা কতটা বড়। ইউরোপ মূলত গ্রিক নগর-রাষ্ট্রগুলোর ছোট ছোট দ্বন্দ্বে মশগুল। মিশরের ফারাওরা তখনও নিজেদের দেবতার সন্তান মনে করেন। চীনে চলছে বিভিন্ন রাজবংশের ক্ষমতার লড়াই। আর ভারতের সিন্ধু উপত্যকায় বাণিজ্য ও কৃষির সুবর্ণযুগ।
এই বিক্ষিপ্ত পৃথিবীতে হঠাৎ এক ঝড় উঠল — ইরানের পার্স অঞ্চলের পাহাড়ি মানুষদের মধ্য থেকে।
আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে যখন ইতিহাসবিদরা পৃথিবীর মানচিত্র আঁকেন, তখন সেই মানচিত্রের কেন্দ্রে থাকে একটিই নাম — আকিমেনিড পারস্য সাম্রাজ্য। এটি শুধু একটি রাজ্য ছিল না, এটি ছিল পৃথিবীর প্রথম প্রকৃত মহাশক্তি — ইতিহাসের প্রথম সুপারপাওয়ার।
পণ্ডিতরা হিসেব করে দেখেছেন, এই সাম্রাজ্য একসময় পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪৪ শতাংশ শাসন করত। আজকের পৃথিবীতে যদি সেই অনুপাত হিসেব করি, তাহলে মানে দাঁড়ায় প্রায় ৩৫০ কোটি মানুষ! তুলনায়, আজকের সবচেয়ে জনবহুল দেশ চীনের জনসংখ্যা মাত্র ১৪০ কোটি।
পশ্চিমে গ্রিস ও বলকান উপদ্বীপ থেকে শুরু করে, দক্ষিণে মিশর ও লিবিয়া, পূর্বে আফগানিস্তান পেরিয়ে আজকের পাকিস্তানের সিন্ধু নদের তীর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল এই সাম্রাজ্য। উত্তরে কৃষ্ণসাগরের তীর থেকে দক্ষিণে পারস্য উপসাগর পর্যন্ত — এই বিশাল ভূখণ্ডে বাস করত ডজনেরও বেশি জাতি, কয়েকশো ভাষার মানুষ, ভিন্ন ভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির অধিকারীরা।
এই সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন একজন মানুষ — যাকে ইতিহাস আজও সম্মানের সাথে স্মরণ করে।
দ্বিতীয় অধ্যায়: সাইরাস — যে রাজা তলোয়ারের চেয়ে হৃদয়কে বিশ্বাস করতেন
খ্রিস্টপূর্ব ৫৫৯ সাল। পার্স অঞ্চলে সিংহাসনে বসলেন এক তরুণ রাজা — সাইরাস, দ্বিতীয়। ইতিহাস তাঁকে চেনে সাইরাস দ্য গ্রেট নামে।
তাঁর রাজত্ব শুরু হয় মিডিয়া রাজ্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ দিয়ে। মিডিয়ার রাজা আস্তিয়াগেস ছিলেন সাইরাসের নিজের মাতামহ — কিন্তু ক্ষমতার লড়াইয়ে রক্তের সম্পর্ক গৌণ হয়ে যায়। সাইরাস মিডিয়া জয় করলেন, তারপর লিডিয়া (আজকের তুরস্ক), তারপর একে একে ব্যাক্ট্রিয়া ও অন্যান্য পূর্বাঞ্চলীয় অঞ্চল।
কিন্তু সাইরাসকে অন্য সব বিজেতা থেকে আলাদা করে রেখেছিল তাঁর একটি অসাধারণ বৈশিষ্ট্য — তিনি জয় করতেন, ধ্বংস করতেন না।
ব্যাবিলনের পতন — তলোয়ার ছাড়া জয়
খ্রিস্টপূর্ব ৫৩৯ সাল। সেসময়ের সবচেয়ে সমৃদ্ধ, সবচেয়ে সুরক্ষিত শহর ছিল ব্যাবিলন। চারপাশে ছিল বিশাল প্রাচীর — এত পুরু যে উপর দিয়ে চার ঘোড়ার রথ চলত পাশাপাশি। ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যান তখন পৃথিবীর সপ্তাশ্চর্যের একটি। শহরটি রক্ষা করত ব্যাবিলনের রাজা নাবোনিদাস।
কিন্তু সাইরাস শহর আক্রমণ করলেন না। তিনি ফোরাত নদীর গতিপথ পরিবর্তন করে দিলেন। নদীর পানি কমিয়ে দিয়ে তাঁর সৈন্যরা রাতের আঁধারে নদীর তলদেশ দিয়ে শহরে ঢুকে পড়ল।
ব্যাবিলন পড়ে গেল প্রায় রক্তপাত ছাড়াই।
কিন্তু এরপর যা হলো, সেটাই সাইরাসকে অমর করে রেখেছে।
তিনি ব্যাবিলনকে লুট করলেন না। মন্দির ধ্বংস করলেন না। বরং ব্যাবিলনের ধর্ম, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে সম্মান দিলেন। রাজা নাবোনিদাস বন্দী হলেও তাঁকে হত্যা করা হলো না — নির্বাসনে পাঠানো হলো।
সাইরাস সিলিন্ডার — পৃথিবীর প্রথম মানবাধিকারের দলিল
ব্যাবিলন জয়ের পর সাইরাস একটি মাটির সিলিন্ডার তৈরি করালেন। প্রায় ২৩ সেন্টিমিটার লম্বা এই সিলিন্ডারে অতি সূক্ষ্ম কিউনিফর্ম লিপিতে খোদাই করা হলো তাঁর ঘোষণা।
সেখানে লেখা ছিল:
"আমি সাইরাস, বিশ্বের রাজা... আমি ব্যাবিলনে প্রবেশ করেছি শান্তিপূর্ণভাবে... কোনো মানুষকে ভয় দেখাইনি। আমি সকল মানুষের অধিকার রক্ষা করব।"
শুধু কথায় নয়, কাজেও প্রমাণ দিলেন। ব্যাবিলনে যেসব জাতিকে বন্দী করে রাখা হয়েছিল — বিশেষত ইহুদিরা, যারা নেবুচাদনেজারের আমল থেকে নির্বাসিত ছিলেন — তাদের নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দিলেন সাইরাস। ইহুদি ধর্মগ্রন্থ তোরাহ ও বাইবেলে সাইরাসকে বলা হয়েছে "ঈশ্বরের মনোনীত মেষপালক।"
এই সিলিন্ডারটি ১৮৭৯ সালে ব্যাবিলনের ধ্বংসাবশেষ থেকে উদ্ধার করেন ব্রিটিশ প্রত্নতত্ত্ববিদ হরমুজদ রাসাম। আজ এটি ব্রিটিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত এবং জাতিসংঘ এটিকে মানবাধিকারের প্রথম ঘোষণাপত্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
সাইরাসের মৃত্যু হয় খ্রিস্টপূর্ব ৫৩০ সালে — মধ্য এশিয়ার মাসাগেটাই উপজাতির বিরুদ্ধে যুদ্ধে। তাঁর সমাধি আজও দাঁড়িয়ে আছে ইরানের পাসারগাদে — একটি সাদা পাথরের সরল স্থাপত্য, কোনো বাড়াবাড়ি নেই, কোনো জাঁকজমক নেই। আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট যখন পারস্য জয় করেন, তখন তিনি নিজেও সাইরাসের সমাধি দেখতে গিয়েছিলেন এবং সেখানে লেখা এপিটাফ পড়ে নাকি কেঁদেছিলেন:
"হে মানুষ! আমি সাইরাস, যে পারস্যের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিল। আমার এই সামান্য সমাধির জন্য আমাকে ঈর্ষা করো না।"
তৃতীয় অধ্যায়: দারায়ুস — যিনি সাম্রাজ্যকে রাষ্ট্রে পরিণত করলেন
সাইরাসের পর ক্ষমতায় এলেন তাঁর পুত্র কম্বিসেস। কম্বিসেস মিশর জয় করলেন — প্রথম পারস্য সম্রাট হিসেবে। কিন্তু খ্রিস্টপূর্ব ৫২২ সালে রহস্যজনক পরিস্থিতিতে তাঁর মৃত্যু হয়।
এরপর শুরু হলো ক্ষমতার লড়াই। একাধিক দাবিদার সিংহাসনের জন্য হানাহানি করল। সেই ঘোলা জলে মাছ ধরলেন এক তরুণ সেনাপতি — দারায়ুস প্রথম।
দারায়ুস দাবি করলেন তিনিও আকিমেনিড বংশের সন্তান — সাইরাসের পূর্বপুরুষ আকিমেনেসের রক্ত তাঁর শিরায়। প্রতিদ্বন্দ্বীদের একে একে পরাজিত করে খ্রিস্টপূর্ব ৫২২ সালেই তিনি সিংহাসনে বসলেন।
কিন্তু সিংহাসন পাওয়া আর সাম্রাজ্য সামলানো এক কথা নয়।
বিসোতুন শিলালিপি — পাথরে লেখা ইতিহাস
ইরানের কেরমানশাহ প্রদেশে আছে একটি পর্বত — বিসোতুন। সেই পর্বতের গায়ে প্রায় ১০০ মিটার উচ্চতায় খোদাই করা আছে বিশাল এক শিলালিপি। সেখানে তিনটি ভাষায় — পুরনো পারস্য, এলামাইট ও ব্যাবিলনীয় — লেখা আছে দারায়ুসের কাহিনী।
কীভাবে তিনি একে একে ন'জন বিদ্রোহী রাজাকে পরাজিত করেছেন, সেই বিবরণ। পাথরে খোদাই করা দারায়ুসের বিশাল মূর্তি, সামনে বেঁধে রাখা পরাজিত শত্রুরা।
এই শিলালিপিই পরে ইউরোপীয় পণ্ডিতদের কিউনিফর্ম লিপি পাঠোদ্ধারের চাবিকাঠি হয়ে উঠেছিল — ঠিক যেভাবে রোসেটা স্টোন মিশরীয় হায়ারোগ্লিফিক পড়তে সাহায্য করেছিল।
একটি সাম্রাজ্যকে যন্ত্রে পরিণত করা
দারায়ুস ছিলেন প্রশাসনের প্রতিভা। তিনি বুঝেছিলেন, শুধু তলোয়ার দিয়ে সাম্রাজ্য ধরে রাখা যায় না — দরকার সুশাসনের যন্ত্রপাতি।
তিনি সাম্রাজ্যকে ভাগ করলেন ২০টি প্রদেশে, যেগুলো পরিচিত হলো সাত্রাপি নামে। প্রতিটি সাত্রাপির প্রধান সাত্রাপ সরাসরি রাজার কাছে দায়বদ্ধ। কিন্তু শুধু সাত্রাপের উপর নির্ভর করলেন না দারায়ুস — প্রতিটি সাত্রাপিতে পাঠালেন একজন গোপন তদন্তকারী, যিনি পরিচিত ছিলেন "রাজার চোখ ও কান" নামে।
এই গোয়েন্দা ব্যবস্থা নিশ্চিত করত যে সাত্রাপরা স্বাধীনভাবে বিদ্রোহের পরিকল্পনা করতে না পারেন।
মুদ্রা ব্যবস্থা: দারায়ুস তৈরি করলেন একক সোনার মুদ্রা — দারিক। এই মুদ্রায় খোদাই থাকত রাজার ছবি, ধনুক হাতে। পুরো সাম্রাজ্যে এই একটিই মুদ্রা চলত — বাণিজ্যের এক অসাধারণ সুবিধা।
ডাক ব্যবস্থা: তিনি তৈরি করলেন ইতিহাসের প্রথম সংগঠিত ডাক ব্যবস্থা। নির্দিষ্ট দূরত্বে দূরত্বে ছিল ঘোড়ার স্টেশন, যেখানে চিঠি ও বার্তা হাত বদল করে দ্রুত পৌঁছে যেত গন্তব্যে। গ্রিক ঐতিহাসিক হেরোডোটাস লিখেছেন: "বরফ, বৃষ্টি, গরম, রাত — কোনো কিছুই এই দূতদের আটকাতে পারে না।" এই বাক্যটিই পরে আমেরিকার পোস্টাল সার্ভিসের আদর্শ মটো হয়ে যায়!
রাজপথ: পার্সিপোলিস থেকে সার্দিস (আজকের তুরস্ক) পর্যন্ত তৈরি হলো রয়্যাল রোড — প্রায় ২,৭০০ কিলোমিটার দীর্ঘ। ঘোড়ার পিঠে সেই পথ পাড়ি দিতে লাগত মাত্র সাত দিন। পায়ে হেঁটে লাগত তিন মাস।
খাল: দারায়ুস নীল নদ ও লোহিত সাগরের মধ্যে একটি খাল খনন করালেন — আজকের সুয়েজ খালের পূর্বসূরি! সেই খালের দু'পাশে স্থাপন করা হয়েছিল গ্রানাইট পাথরের স্মারক স্তম্ভ, যেগুলো ঘোষণা করত দারায়ুসের এই অসাধারণ কীর্তির কথা।
চতুর্থ অধ্যায়: পার্সিপোলিস — সূর্যের নিচে সবচেয়ে ধনী নগরী
দারায়ুসের সবচেয়ে বড় স্থাপত্যকীর্তি ছিল পার্সিপোলিস।
খ্রিস্টপূর্ব ৫১৮ সালে শুরু হয় নির্মাণ। ইরানের ফার্স প্রদেশে একটি পাথুরে মালভূমির উপর — সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১,৮০০ মিটার উচ্চতায় — তৈরি হলো এই অভূতপূর্ব নগরী। ফার্সি ভাষায় এর নাম ছিল পার্স — গ্রিকরা বলত পার্সিপোলিস, যার মানে "পারস্যের নগরী।"
পুরো প্রাসাদ চত্বর ছিল একটি বিশাল কৃত্রিম মঞ্চের উপর — প্রায় ১২৫,০০০ বর্গমিটার, তিন থেকে চার মিটার উঁচু। এই মঞ্চ তৈরি করতে পাহাড় কাটা হয়েছিল, মাটি ভরাট করা হয়েছিল।
প্রবেশদ্বার — সব জাতির ফটক
পার্সিপোলিসে ঢোকার মুখে ছিল "সব জাতির ফটক" — Gate of All Nations। বিশাল দুটি স্তম্ভের পাশে দাঁড়িয়ে থাকত পাথরের বিশাল ষাঁড়ের মূর্তি, যেগুলোর মুখ মানুষের মতো। এই মূর্তিগুলো ছিল মেসোপটেমীয় ঐতিহ্যের প্রতিফলন।
ফটকে তিনটি ভাষায় খোদাই ছিল: "আমি দারায়ুস, মহারাজ। এই ফটক সব জাতির জন্য।"
আপাদানা হল — পৃথিবীর বৃহত্তম সভাকক্ষ
প্রাসাদ চত্বরের কেন্দ্রে ছিল আপাদানা — দর্শকদের জন্য সিংহাসন কক্ষ। প্রায় ৬০ মিটার বাই ৬০ মিটার এই বিশাল হলে ছিল ৭২টি স্তম্ভ, প্রতিটি প্রায় ২০ মিটার উঁচু! একসাথে প্রায় ১০,০০০ মানুষ ধারণ করতে পারত এই হল।
স্তম্ভের চূড়ায় ছিল বিচিত্র ভাস্কর্য — কেউ বলের আকারে, কেউ সিংহের মাথার আকারে, কেউ ষাঁড়ের মাথার আকারে। আজও সেগুলোর কিছু টিকে আছে।
আপাদানার সিঁড়িগুলোর দেয়ালে খোদাই করা আছে পারস্য ইতিহাসের সবচেয়ে মূল্যবান শিল্পকর্ম — প্রতিনিধি দলের মিছিল। ২৩টি জাতির প্রতিনিধি দল একে একে রাজার কাছে উপহার নিয়ে আসছে। লিবীয়রা নিয়ে এসেছে গজেল, ভারতীয়রা এনেছে সোনার পাত্র ও ময়ূর, ইথিওপীয়রা এনেছে হাতির দাঁত ও ওকাপি, আরবরা নিয়ে এসেছে উট। প্রতিটি চেহারা আলাদা, প্রতিটি পোশাক আলাদা — একটি বহুজাতিক সাম্রাজ্যের জীবন্ত দলিল।
পার্সিপোলিস কি দাস শ্রমে তৈরি?
অনেকেই মনে করেন পার্সিপোলিস তৈরি হয়েছিল দাসদের রক্ত-ঘামে। কিন্তু প্রত্নতত্ত্ব ভিন্ন কথা বলে।
১৯৩৩ সালে প্রাসাদের খননকার্যে পাওয়া যায় হাজারো মাটির ট্যাবলেট — "পার্সিপোলিস ফোর্টিফিকেশন ট্যাবলেট"। এই ট্যাবলেটগুলো আসলে পারস্য সরকারের অফিসিয়াল রেকর্ড। এতে লেখা আছে কে কাজ করেছে, কতদিন কাজ করেছে, তার বিনিময়ে কী পেয়েছে।
দেখা গেছে:
নির্মাণ শ্রমিকরা পারিশ্রমিক পেতেন — রেশন আকারে গম, যব, ওয়াইন ও ছাগল।
দক্ষ শ্রমিকরা বেশি মজুরি পেতেন।
মহিলা শ্রমিকরাও কাজ করতেন এবং পুরুষের সমান মজুরি পেতেন — প্রাচীন বিশ্বে এটি ছিল অভূতপূর্ব।
প্রসূতি মায়েরা পেতেন মাতৃত্বকালীন ভাতা!
শ্রমিকরা আসতেন সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে — মিশর, ব্যাবিলন, লিডিয়া।
প্রায় ২৫,০০০ ট্যাবলেট উদ্ধার হয়েছে এখন পর্যন্ত, যার মধ্যে মাত্র এক-তৃতীয়াংশ পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। বাকিগুলো এখনও গবেষণাধীন।
পঞ্চম অধ্যায়: ম্যারাথন থেকে থার্মোপিলি — গ্রিসের সাথে মহাসংঘর্ষ
দারায়ুস যখন সাম্রাজ্যকে সুসংগঠিত করছেন, তখন পশ্চিমে একটি সমস্যা মাথা তুলছিল — গ্রিস।
পারস্যের অধীনে থাকা আইওনিয়ার গ্রিক উপনিবেশগুলো বিদ্রোহ করল খ্রিস্টপূর্ব ৪৯৯ সালে। এথেন্স ও এরেট্রিয়া তাদের সাহায্য করল। দারায়ুস বিদ্রোহ দমন করলেন, কিন্তু গ্রিসকে শাস্তি দেওয়ার পণ করলেন।
ম্যারাথনের বিস্ময় — খ্রিস্টপূর্ব ৪৯০
দারায়ুস পাঠালেন বিশাল নৌবহর — প্রায় ৬০০ যুদ্ধজাহাজ, ২৫,০০০ থেকে ৯০,০০০ সৈন্য (ইতিহাসবিদদের মধ্যে সংখ্যা নিয়ে মতভেদ আছে)। অ্যাটিকার ম্যারাথন সমভূমিতে অপেক্ষা করছিল মাত্র ১০,০০০ এথেনীয় সৈন্য।
কিন্তু এথেনীয়দের সেনাপতি মিলটিয়াডেস একটি অভূতপূর্ব কৌশল নিলেন। লম্বা লাইনে সৈন্য সাজিয়ে মধ্যভাগ কিছুটা দুর্বল রেখে দুই পাশ শক্তিশালী করলেন। পারস্য বাহিনী মাঝখানে ঢুকে পড়তেই দুই পাশ থেকে ঘিরে ফেলা হলো।
পারস্যের পরাজয় হলো। ছয় হাজারেরও বেশি পারস্য সৈন্য মারা গেল, এথেনীয় মৃত মাত্র ১৯২।
এই যুদ্ধের পর একজন দূত — ফেইডিপিডিস — ম্যারাথন থেকে এথেন্স পর্যন্ত প্রায় ৪২ কিলোমিটার দৌড়ে গিয়ে জয়ের সংবাদ দিলেন, তারপর মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন। এই কাহিনী থেকেই জন্ম নিয়েছে আধুনিক ম্যারাথন দৌড়।
দারায়ুস ফিরে এলেন লজ্জিত হয়ে। পুনরায় অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, কিন্তু খ্রিস্টপূর্ব ৪৮৬ সালে মিশরে বিদ্রোহ ও তারপর তাঁর মৃত্যু সেই পরিকল্পনায় ছেদ টানল।
জারক্সেসের প্রতিশোধ — খ্রিস্টপূর্ব ৪৮০
দারায়ুসের পুত্র জারক্সেস বাবার অসম্পূর্ণ কাজ শেষ করার পণ করলেন।
তিনি পাঠালেন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সেনাবাহিনীগুলোর একটি। গ্রিক ঐতিহাসিক হেরোডোটাস দাবি করেছেন ১৭ লাখ সৈন্য — আধুনিক ইতিহাসবিদরা মনে করেন প্রকৃত সংখ্যা ছিল ১ থেকে ৩ লাখের মধ্যে। তবু তা ছিল গ্রিসের পক্ষে মোকাবেলা করার মতো অসম্ভব শক্তি।
হেলেস্পন্ট প্রণালী (আজকের দার্দানেলস) পার হওয়ার জন্য জারক্সেস তৈরি করালেন পনটুন সেতু — নৌকার উপর তক্তা বিছিয়ে! ঝড়ে সেতু ভেঙে পড়লে জারক্সেস নাকি সমুদ্রকে ৩০০ চাবুক মেরে শাস্তি দিয়েছিলেন।
থার্মোপিলির গিরিপথে ৩০০ স্পার্টান সৈন্য তিন দিন আটকে রেখেছিল লক্ষাধিক পারস্য বাহিনীকে। স্পার্টান রাজা লিওনিদাস ও তাঁর সৈন্যরা মারা পড়লেন, কিন্তু তাঁদের আত্মবলিদান গ্রিক বাহিনীকে পিছু হটতে ও পুনর্গঠিত হতে সময় দিল।
এরপর এথেন্স পুড়িয়ে দিলেন জারক্সেস। কিন্তু সালামিসের নৌযুদ্ধে গ্রিক নৌবহল পারস্যকে বিধ্বস্ত করল। পরের বছর প্লাতাইয়ার যুদ্ধে স্থলবাহিনীও পরাজিত হলো।
জারক্সেস বুঝলেন, গ্রিস জয় করা তাঁর ভাগ্যে নেই। তিনি ফিরে গেলেন।
গ্রিকরা এই যুদ্ধকে স্বাধীনতার যুদ্ধ হিসেবে স্মরণ করে। পারস্যের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি ছিল বিদ্রোহী প্রদেশকে শাসনে আনার ব্যর্থ প্রচেষ্টা।
ষষ্ঠ অধ্যায়: পতনের শতাব্দী — ভেতরের ক্ষয়
জারক্সেসের পরাজয়ের পর পারস্য সাম্রাজ্য টিকে রইল আরও দেড়শো বছর। কিন্তু ভেতরে ভেতরে চলতে থাকল ক্ষয়।
মিশর বারবার বিদ্রোহ করল — বারবার হারানো গেল, বারবার ফিরে পাওয়া গেল। সাইডন (আজকের লেবানন) বিদ্রোহ করল খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০ সালে। সিডনীয়রা পারস্যের সঞ্চিত কোষাগার আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিল — রাজার হাতে ধরা পড়ে নিজেদের ধ্বংস না করে।
রাজপরিবারের মধ্যে ষড়যন্ত্র ও হত্যার রাজনীতি চলতে থাকল। একের পর এক রাজার মৃত্যু, প্রাসাদ রাজনীতির কূটকৌশল — সাম্রাজ্যের ভিত দুর্বল হতে থাকল।
তারপর পশ্চিম থেকে এলেন তিনি।
সপ্তম অধ্যায়: আলেকজান্ডার — সর্বনাশের ঝড়
খ্রিস্টপূর্ব ৩৩৪। মাত্র ২২ বছরের এক মেসিডোনীয় রাজপুত্র পারস্যের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করলেন। তাঁর নাম আলেকজান্ডার — পরিচিত দ্য গ্রেট নামে।
গ্রানিকাসের যুদ্ধে (খ্রিস্টপূর্ব ৩৩৪) প্রথম জয়। তারপর ইসোসের যুদ্ধে (খ্রিস্টপূর্ব ৩৩৩) পারস্যের তৃতীয় দারায়ুস পালিয়ে বাঁচলেন, পরিবার বন্দী হলো। গওগামেলার যুদ্ধে (খ্রিস্টপূর্ব ৩৩১) পারস্যের শেষ বড় প্রতিরোধ ভেঙে পড়ল।
আলেকজান্ডার সুসা ও পার্সিপোলিসের অসীম ধনভাণ্ডার দখল করলেন। পার্সিপোলিস থেকে বের করা সোনা-রুপা পরিবহনের জন্য নাকি ২০,০০০ খচ্চর ও ৫,০০০ উট লেগেছিল।
তারপর ঘটল সেই বিধ্বংসী ঘটনা।
পার্সিপোলিসের আগুন
খ্রিস্টপূর্ব ৩৩০ সালের বসন্তে পার্সিপোলিসে আগুন লাগল।
ঠিক কীভাবে লাগল তা নিয়ে ইতিহাসে বিতর্ক আছে। কেউ বলেন আলেকজান্ডার ইচ্ছাকৃতভাবে আগুন দিয়েছিলেন — জারক্সেসের ১৫০ বছর আগে এথেন্সে আগুন দেওয়ার প্রতিশোধ হিসেবে। কেউ বলেন এটি ছিল মদের নেশায় এক রাতের ভুল সিদ্ধান্ত — আলেকজান্ডারের প্রেমিকা থাইসের প্ররোচনায়।
ইরানি দার্শনিক আল-বিরুনি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ "ক্রনোলজি অফ অ্যানশেন্ট নেশনস"-এ লিখেছেন প্রতিশোধের কথাটিই।
আলেকজান্ডার নিজেও পরে এই কাজে অনুতাপ করেছিলেন বলে জানা যায়।
আগুনে পুড়ে গেল পার্সিপোলিসের সিংহভাগ। বিশেষত জ্বলে গেল সিংহাসন কক্ষ ও রাজভাণ্ডার। প্রত্নতাত্ত্বিক খননে আজও কিছু জায়গায় সেই আগুনের চিহ্ন স্পষ্ট — পোড়া মাটির পরত, গলে যাওয়া ধাতু।
তৃতীয় দারায়ুস পালিয়ে পালিয়ে ফিরলেন বলে শেষে তাঁর নিজের সেনাপতি বেসাস তাঁকে হত্যা করল। আলেকজান্ডার মৃত দারায়ুসকে সম্মানের সাথে সমাহিত করলেন। আকিমেনিড রাজবংশের শেষ অধ্যায় এভাবেই শেষ হলো।
অষ্টম অধ্যায়: বিস্মৃতির অন্ধকার ও পুনরাবিষ্কার
আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পর তাঁর সাম্রাজ্য ভাগ হয়ে গেল। পারস্যের ভূখণ্ডে প্রতিষ্ঠিত হলো সেলুসিড রাজবংশ। তারপর পার্থিয়ান, তারপর সাসানিদ — পারস্য শাসন চলল, কিন্তু আকিমেনিড যুগের স্মৃতি ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে গেল।
দশম শতাব্দীতে ইরানের মহাকবি আবুল কাসেম ফেরদৌসী রচনা করলেন তাঁর অমর মহাকাব্য "শাহনামা" — রাজাদের কাহিনী। ইরানি জাতীয় পরিচয়ের মূলগ্রন্থ এটি। কিন্তু অবাক করার বিষয় — এই বইতে সাইরাস, দারায়ুস বা জারক্সেসের নাম নেই। আকিমেনিড ইতিহাস ততদিনে কিংবদন্তির সাথে মিলে গিয়ে অচেনা হয়ে গেছে।
পার্সিপোলিসের ধ্বংসাবশেষ মরুভূমির বালিতে অর্ধেক ঢাকা পড়ে রইল। স্থানীয় মানুষ একে বলত "তখতে জামশিদ" — জামশিদের সিংহাসন। জামশিদ ছিলেন শাহনামার এক পৌরাণিক রাজা। প্রকৃত ইতিহাস হারিয়ে গিয়েছিল।
১৬২০ সালের আগ পর্যন্ত ইউরোপীয়রা জানতই না এই ধ্বংসস্তূপটি ঠিক কী। স্পেনীয় কূটনীতিক গার্সিয়া দে সিলভা ফিগুয়েরোয়া ১৬১৮ সালে প্রথম ইউরোপীয় হিসেবে নিশ্চিত করলেন — এটিই সেই পার্সিপোলিস।
১৮ ও ১৯ শতকে ইউরোপীয় পণ্ডিত ও পর্যটকরা একে একে এলেন — ছবি আঁকলেন, বিবরণ লিখলেন, কিউনিফর্ম লিপি নকল করে নিয়ে গেলেন।
১৯২৪ সালে ইরান সরকার দায়িত্ব দিলেন জার্মান ইরানবিদ ও প্রত্নতত্ত্ববিদ ডক্টর আর্নস্ট হার্টজফেল্ড-কে। তাঁর নেতৃত্বে শুরু হলো পদ্ধতিগত খনন। বেরিয়ে এলো হাজারো ট্যাবলেট, ভাস্কর্যের টুকরো, সিলমোহর।
আজ পার্সিপোলিস ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ পর্যটক আসেন এই ধ্বংসাবশেষ দেখতে।
উপসংহার: আমরা কি পারস্যকে সত্যিই চিনি?
পারস্য সাম্রাজ্যের ইতিহাস আমাদের কাছে বেশিরভাগ সময় এসেছে তাদের শত্রুদের কলম থেকে — হেরোডোটাস, থুসিডাইডস, গ্রিক নাট্যকারদের লেখা থেকে। সেই বিবরণে পারস্যরা প্রায়ই অহংকারী, নিষ্ঠুর শাসক।
কিন্তু মাটির ট্যাবলেট, পাথরের শিলালিপি, প্রাসাদের ভাস্কর্য — এগুলো ভিন্ন কথা বলে। বলে এমন এক সাম্রাজ্যের কথা যেখানে শ্রমিক পারিশ্রমিক পেত, নারীরা সমান মজুরি পেত, ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা নিজেদের উপাসনালয় রাখতে পারত।
সাইরাসের সিলিন্ডারে লেখা মানবতার ঘোষণা, দারায়ুসের তৈরি আন্তর্জাতিক ডাক ব্যবস্থা, পার্সিপোলিসের বহুজাতিক শ্রমিকদের মজুরির হিসাব — এগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ইতিহাস সবসময় বিজয়ীদের দৃষ্টিকোণে লেখা হয়।
পারস্য নিজেদের গল্প নিজেরা লিখেছিল — পাথরে, মাটিতে। সেই লেখা পড়তে আমাদের দুই হাজার বছরেরও বেশি লেগে গেল।
আর সেই পাঠ এখনও চলছে।



