ইরান: অতীতের নস্টালজিয়া, নাকি ভবিষ্যতের মরীচিকা?

  • প্রকাশ: ৩১ মার্চ ২০২৬, বিকাল ০৭:১৪
  • আপডেট: ৩১ মার্চ ২০২৬, বিকাল ০৭:১৪
ইরানে কি ফিরছে শাহ রাজত্ব রেজা পাহলভিকে ঘিরে নতুন ঝ

ইমদাদুল হক, সাংবাদিক ও কলামিস্টঃ


একসময় তেহরান-কে বলা হতো ‘মিডল ইস্টের প্যারিস’। আজকের প্রজন্মের কাছে এটি যেন এক রোমান্টিক গল্প—আলো ঝলমলে শহর, আধুনিক জীবনযাপন, সাংস্কৃতিক জাগরণ। কিন্তু এই নস্টালজিয়ার আড়ালে যে বাস্তবতা লুকিয়ে আছে, তা কি আমরা সত্যিই মনে রাখি?ইরানের বর্তমান অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে আবার উচ্চারিত হচ্ছে এক নাম— রেজা শাহ পাহলভি। কেউ তাকে দেখছেন সম্ভাব্য মুক্তিদাতা হিসেবে, কেউবা পুরনো শাসনের পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা করছেন। প্রশ্ন হলো—এটা কি সত্যিকারের রাজনৈতিক বিকল্প, নাকি নিছক হতাশার প্রতিফলন?


নস্টালজিয়া বনাম বাস্তবতা-পাহলভি আমলকে অনেকেই ইরানের ‘স্বর্ণযুগ’ হিসেবে তুলে ধরেন।শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি-এর শাসনামলে আধুনিকায়ন, নারীর অধিকার, শিক্ষা বিস্তার—সবই ঘটেছিল দ্রুতগতিতে। কিন্তু এই গল্পের অন্য দিকটাও কি আমরা সমানভাবে বলি?সেই সময়ই ছিল রাজনৈতিক দমন-পীড়নের এক কঠিন অধ্যায়। ভিন্নমতকে সহ্য না করা, গোপন পুলিশি নজরদারি, এবং ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ—এসবই ছিল বাস্তবতা। যে আধুনিকতার গল্প আমরা শুনি, তা অনেকাংশেই ছিল উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া পরিবর্তন, যা সমাজের সব স্তরে গ্রহণযোগ্য হয়নি।


১৯৭৯: এক বিপ্লবের শিক্ষা

ইরান বিপ্লব কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। এটি ছিল দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, বঞ্চনা ও রাজনৈতিক দমন-পীড়নের বিস্ফোরণ। জনগণ শুধু একজন শাসককে সরায়নি; তারা একটি শাসনব্যবস্থাকেই প্রত্যাখ্যান করেছিল।আজ যখন কেউ কেউ আবার পাহলভিদের প্রত্যাবর্তনের কথা বলেন, তখন প্রশ্ন জাগে—ইতিহাস থেকে আমরা কি কিছুই শিখিনি?


বর্তমান সংকট: শাসনের ব্যর্থতা-এটাও সত্য যে, বর্তমান ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানিদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। অর্থনৈতিক সংকট, আন্তর্জাতিক অবরোধ, এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা মানুষের মধ্যে গভীর হতাশা তৈরি করেছে।কিন্তু একটি ব্যর্থ ব্যবস্থার বিকল্প কি আরেকটি বিতর্কিত অতীত হতে পারে?


রেজা পাহলভি: প্রতীক না প্রলোভন?

রেজা পাহলভি নিজেকে এখন গণতন্ত্রের প্রবক্তা হিসেবে উপস্থাপন করছেন। তিনি বলেন, জনগণই সিদ্ধান্ত নেবে—রাজতন্ত্র নাকি প্রজাতন্ত্র। শুনতে ভালো লাগে। কিন্তু বাস্তব প্রশ্নটি অন্যত্র—একটি রাজবংশের উত্তরাধিকার কি সত্যিই গণতন্ত্রের নির্ভরযোগ্য বাহক হতে পারে?তার জনপ্রিয়তার একটি বড় অংশই গড়ে উঠেছে প্রবাসী ইরানিদের মধ্যে এবং দেশের ভেতরের হতাশাগ্রস্ত তরুণদের মাঝে। কিন্তু এটি কি টেকসই রাজনৈতিক ভিত্তি, নাকি সাময়িক আবেগ?


বিপজ্জনক রোমান্টিসিজম-ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ফাঁদগুলোর একটি হলো ‘নির্বাচিত স্মৃতি’। আমরা ভালোটা মনে রাখি, খারাপটা ভুলে যাই। পাহলভি আমলের ক্ষেত্রেও সেটিই ঘটছে।‘মিডল ইস্টের প্যারিস’—এই বাক্যটি যতটা আকর্ষণীয়, ততটাই বিভ্রান্তিকর। কারণ এটি বাস্তবতার একটি অংশকে বড় করে দেখায়, আর অন্য অংশকে আড়াল করে।

ইরানের সামনে কোন পথ?

ইরানের মানুষ আজ পরিবর্তন চায়—এটা স্পষ্ট। কিন্তু সেই পরিবর্তন কি অতীতে ফিরে যাওয়ার মধ্যে, নাকি নতুন কোনো পথ তৈরির মধ্যে? পাহলভি রাজবংশের প্রত্যাবর্তন হয়তো কিছু মানুষের কাছে আশার প্রতীক। কিন্তু এটি একই সঙ্গে একটি ঝুঁকিপূর্ণ জুয়াও—যেখানে ইতিহাসের পুরনো ভুলগুলো আবারও ফিরে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।

অতএব, প্রশ্নটি শুধু ‘শাহ ফিরবেন কি না’ নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো—ইরান কি সত্যিই সামনে এগোতে চায়, নাকি অতীতের ছায়ার ভেতরেই পথ খুঁজতে থাকবে?

Ad