ওয়াখান করিডর: আফগানিস্তানের মানচিত্রে সেই ‘সরু আঙুল’ কীভাবে জন্ম নিল?
লেখক: ইমদাদুল হক, সাংবাদিক কলামিস্ট
মানচিত্রে আফগানিস্তানের উত্তর-পূর্ব কোণে চোখ রাখলেই একটি অদ্ভুত দৃশ্য দেখা যায়।
মনে হয়, আফগানিস্তানের মূল ভূখণ্ড থেকে একটি সরু, দীর্ঘ ‘আঙুল’ পূর্ব দিকে এগিয়ে গিয়ে চীনের দরজায় ঠেকেছে।
এই অদ্ভুত ভূখণ্ডটির নাম ওয়াখান করিডর।
প্রায় ৩৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাহাড়ি ভূখণ্ড কোথাও ১৩ কিলোমিটারের মতো সরু, আবার কোথাও প্রায় ৬০–৬৫ কিলোমিটার পর্যন্ত প্রশস্ত। এর পূর্ব প্রান্তে আফগানিস্তানের সঙ্গে চীনের সীমান্ত মাত্র প্রায় ৭৫–৯০ কিলোমিটারের মধ্যে। উত্তরে তাজিকিস্তান, দক্ষিণে পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত গিলগিট-বালতিস্তান ও আফগানিস্তানের দুর্গম পাহাড়, আর পূর্বে চীনের জিনজিয়াং।
প্রশ্ন হলো—আফগানিস্তানের মানচিত্রে এমন একটি সরু ভূখণ্ড এল কীভাবে?
এর উত্তর শুধু পাহাড়-পর্বতের ভূগোলে নেই।
উত্তরটি লুকিয়ে আছে উনিশ শতকের সাম্রাজ্যবাদী রাজনীতি, রাশিয়া-ব্রিটেনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং মধ্য এশিয়ার ভূরাজনৈতিক দাবার বোর্ডে।
‘ওয়াখান’ আসলে কোনো প্রাকৃতিক করিডর নয়—এটি ভূরাজনীতির সৃষ্টি ওয়াখানকে বুঝতে হলে প্রায় দেড়শ বছর পেছনে যেতে হবে।উনিশ শতকে মধ্য এশিয়া ছিল রুশ সাম্রাজ্য ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রতিদ্বন্দ্বিতার অন্যতম প্রধান মঞ্চ।
রাশিয়া তখন মধ্য এশিয়ার দিকে দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। তাশখন্দ, সমরকন্দ, বুখারা, খিভা—একটির পর একটি অঞ্চল রুশ প্রভাবের মধ্যে চলে যাচ্ছে।
অন্যদিকে ভারত তখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সবচেয়ে মূল্যবান উপনিবেশ।ফলে ব্রিটিশদের কাছে সবচেয়ে বড় আতঙ্ক ছিল—রুশ বাহিনী যদি মধ্য এশিয়া পেরিয়ে আফগানিস্তানের দিকে নামে, তাহলে ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে তাদের সামনে সরাসরি একটি প্রতিদ্বন্দ্বী সাম্রাজ্য দাঁড়িয়ে যাবে।
এই প্রতিদ্বন্দ্বিতাই ইতিহাসে পরিচিত হয়ে ওঠে—‘দ্য গ্রেট গেম’।
এটি কোনো একক যুদ্ধ ছিল না। বরং গুপ্তচরবৃত্তি, কূটনীতি, মানচিত্র, সীমান্ত নির্ধারণ, সামরিক অভিযান এবং প্রভাব বিস্তারের এক দীর্ঘ ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা।
আর এই দাবার বোর্ডের মাঝখানে ছিল আফগানিস্তান।
কেন আফগানিস্তান এত গুরুত্বপূর্ণ ছিল?
আফগানিস্তানের গুরুত্ব ছিল তার অবস্থানে।
দক্ষিণ এশিয়া থেকে মধ্য এশিয়ার দিকে যেতে হলে হিন্দুকুশ ও পামির অঞ্চলের বহু গুরুত্বপূর্ণ গিরিপথ অতিক্রম করতে হয়। ফলে আফগানিস্তানকে নিয়ন্ত্রণ করা মানে ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিম প্রবেশপথের ওপর প্রভাব বিস্তার করা।
কিন্তু ব্রিটেনও জানত—আফগানিস্তানকে সরাসরি দখল করা সহজ নয়।
আফগান ভূগোল, উপজাতীয় রাজনীতি এবং স্থানীয় প্রতিরোধ ব্রিটিশদের জন্য একের পর এক সমস্যা তৈরি করেছিল।তাই কৌশল বদলাল।আফগানিস্তানকে সরাসরি ব্রিটিশ ভূখণ্ডে পরিণত করার পরিবর্তে তাকে একটি বাফার স্টেট হিসেবে রাখা অধিক কার্যকর হয়ে উঠল।
অর্থাৎ—
রাশিয়া একদিকে, ব্রিটিশ ভারত অন্যদিকে—মাঝখানে আফগানিস্তান।
কিন্তু এখানেই তৈরি হলো আরেকটি সমস্যাআফগানিস্তানের উত্তর-পূর্ব প্রান্তে রুশ নিয়ন্ত্রিত মধ্য এশিয়া এবং ব্রিটিশ প্রভাবাধীন ভারতীয় ভূখণ্ড এত কাছাকাছি চলে এসেছিল যে, একটি সরাসরি সীমান্ত সংঘর্ষের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছিল।
এই জায়গাতেই ওয়াখানের গল্প।
১৮৭৩: ওয়াখানের প্রথম বড় ভূরাজনৈতিক স্বীকৃতি
১৮৭৩ সালে ব্রিটেন ও রাশিয়ার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা হয়।এই সমঝোতার মাধ্যমে পূর্ব বাদাখশান ও ওয়াখানকে আফগানিস্তানের অন্তর্ভুক্ত অঞ্চল হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার কাঠামো তৈরি হয় এবং আমু দরিয়া অঞ্চলে রুশ ও আফগান প্রভাবের সীমা নির্ধারণের কাজ এগিয়ে যায়।অর্থাৎ, ওয়াখানকে হঠাৎ করে ১৮৯৩ সালে আফগানিস্তানকে ‘উপহার’ দেওয়া হয়নি।বরং উনিশ শতকের শেষভাগে ধারাবাহিক কূটনৈতিক সমঝোতার মধ্য দিয়ে এই অঞ্চলের ওপর আফগান শাসকের সার্বভৌমত্বকে স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছিল।
এর পেছনে ছিল অত্যন্ত বাস্তব একটি হিসাব—ব্রিটিশ ভারত ও রুশ সাম্রাজ্যের মধ্যে সরাসরি সীমান্ত যেন না হয়।তাহলে ১৮৯৩ সালের ডুরান্ড চুক্তির ভূমিকা কী?
এখানেই আসে স্যার মর্টিমার ডুরান্ড।
১৮৯৩ সালের ১২ নভেম্বর ব্রিটিশ ভারতের প্রতিনিধি স্যার হেনরি মর্টিমার ডুরান্ড এবং আফগান আমির আব্দুর রহমান খানের মধ্যে চুক্তি হয়।
ইতিহাসে এটি পরিচিত—ডুরান্ড চুক্তি নামে।
এই চুক্তির মাধ্যমে আফগানিস্তান ও ব্রিটিশ ভারতের মধ্যকার পূর্ব ও দক্ষিণ সীমারেখা নির্ধারণ করা হয় এবং দুই পক্ষের প্রভাববলয় স্পষ্ট করা হয়।কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার—ডুরান্ড চুক্তি একা ওয়াখান করিডর সৃষ্টি করেনি।
ওয়াখানের উত্তর দিকে রুশ-আফগান সীমা এবং দক্ষিণ দিকে ব্রিটিশ ভারত-আফগান সীমা নির্ধারণের ধারাবাহিক প্রক্রিয়াই শেষ পর্যন্ত এই সরু ভূখণ্ডকে একটি কৌশলগত ‘বাফার’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
১৮৯৫ সালে রুশ ও ব্রিটিশ কমিশনের মাধ্যমে পামির অঞ্চলের সীমা আরও নির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করা হয়। ১৮৯৬ নাগাদ এই সীমা কার্যত চূড়ান্ত রূপ পায়।অর্থাৎ আজকের মানচিত্রের সেই ‘আঙুল’ কোনো নদী বা পর্বতমালার স্বাভাবিক রাজনৈতিক সীমানা নয়।এটি অনেকটাই সাম্রাজ্যবাদী কূটনীতির আঁকা একটি ভূরাজনৈতিক রেখা।
কেন এত সরু?
এটাই ওয়াখানের সবচেয়ে আকর্ষণীয় প্রশ্ন।
উত্তরে ছিল রুশ সাম্রাজ্যের প্রভাবাধীন মধ্য এশিয়া।দক্ষিণে ছিল ব্রিটিশ ভারতের সীমান্ত।
এই দুই সাম্রাজ্যের মধ্যে সরাসরি সীমান্ত তৈরি হলে সংঘর্ষের ঝুঁকি বাড়ত।তাই মাঝখানে রাখা হলো আফগানিস্তানের একটি দীর্ঘ, দুর্গম ভূখণ্ড।ফলে ওয়াখান হয়ে উঠল এক ধরনের বাফার জোন।
একদিকে রুশ সাম্রাজ্য।
অন্যদিকে ব্রিটিশ ভারত।
আর মাঝখানে—
আফগানিস্তান।
ভূরাজনীতির ভাষায় এটি ছিল ‘Strategic Buffer’—একটি ভূখণ্ড, যার মূল মূল্য ছিল তার অর্থনৈতিক সম্পদে নয়, বরং কোন দুই শক্তির মধ্যে কতটা দূরত্ব তৈরি করতে পারে—সেখানে।
চীনও কি এই গল্পের বাইরে ছিল?
না।
বরং ওয়াখানের পূর্ব প্রান্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ই হলো চীন।পামিরের এই অঞ্চল চীন, রাশিয়া, ব্রিটিশ ভারত ও আফগানিস্তানের প্রভাববলয়ের সংযোগস্থলে অবস্থান করছিল।
সেই সময় চীনের পশ্চিমাঞ্চল—বিশেষ করে বর্তমান জিনজিয়াং—নিজেও রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সাম্রাজ্যিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে ছিল।
তাই ওয়াখানের একটি বিশেষ ভূরাজনৈতিক মূল্য ছিল—
এটি আফগানিস্তানকে সরাসরি চীনের সঙ্গে একটি সীমান্ত দেয়।
অর্থাৎ আফগানিস্তানের মানচিত্রে এই সরু ‘আঙুল’ শুধু রাশিয়া ও ব্রিটিশ ভারতের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করেনি; এটি আফগানিস্তানকে চীনের সঙ্গে একটি সংক্ষিপ্ত সীমান্তেও যুক্ত করেছে।পরে আফগানিস্তান ও চীন ১৯৬৩ সালে তাদের সীমান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে নির্ধারণ করে।ওয়াখান কি আগে থেকেই জনশূন্য ছিল? একেবারেই নয়।
এই অঞ্চল দুর্গম হলেও বহু শতাব্দী ধরে মানুষ এখানে বসবাস করেছে।
ওয়াখান ছিল মধ্য এশিয়া ও চীনের মধ্যকার পুরোনো বাণিজ্যপথের একটি অংশ। পামিরের গিরিপথ দিয়ে ব্যবসায়ী, পর্যটক ও অভিযাত্রীরা যাতায়াত করতেন।
মার্কো পোলোর এই অঞ্চলের মধ্য দিয়ে যাতায়াতের কথা ঐতিহাসিকভাবে উল্লেখ করা হয়, যদিও তার ভ্রমণের নির্দিষ্ট পথ নিয়ে গবেষকদের মধ্যে কিছু অনিশ্চয়তা রয়েছে। সপ্তম শতাব্দীতে চীনা বৌদ্ধ ভিক্ষু জুয়ানজাংয়ের যাত্রার সঙ্গেও এই অঞ্চলের পথকে যুক্ত করা হয়।১৯০৬ সালে প্রত্নতাত্ত্বিক ও অভিযাত্রী অরেল স্টাইন ওয়াখান অঞ্চলে গিয়ে দেখতে পেয়েছিলেন যে তখনও বছরে বহু বোঝাই ঘোড়া এই পথ দিয়ে চলাচল করত।
অর্থাৎ ওয়াখান কোনো ‘মৃত’ ভূখণ্ড ছিল না|এটি ছিল দুর্গম হলেও একটি ঐতিহাসিক সংযোগপথ।
আজকের ওয়াখান: পৃথিবীর অন্যতম দুর্গম ভূখণ্ড|আজকের ওয়াখান অবশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতার মুখোমুখি।এখানে জনসংখ্যা অত্যন্ত কম। স্থানীয় ওয়াখি জনগোষ্ঠী এবং কিরগিজ জনগোষ্ঠীর মানুষ পশুপালন, কৃষি ও সীমিত বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল।প্রচণ্ড শীত, উচ্চতা এবং দুর্গম পর্বতমালা এখানকার জীবনকে কঠিন করে তুলেছে।অনেক এলাকায় আধুনিক অবকাঠামো অত্যন্ত সীমিত।পাকা সড়ক, বিদ্যুৎ, মোবাইল যোগাযোগ—সবকিছুই দীর্ঘদিন ধরে ছিল দুর্লভ।একটি অঞ্চল, যা একসময় সাম্রাজ্যগুলোর কূটনৈতিক দাবার ঘুঁটি ছিল, আধুনিক যুগে এসে নিজেই হয়ে উঠেছে পৃথিবীর অন্যতম বিচ্ছিন্ন জনপদ।
কিন্তু ওয়াখান কি সত্যিই ‘শান্তির দ্বীপ’?এখানে একটু সতর্ক হওয়া দরকার।
ওয়াখানের দুর্গম ভূগোল অবশ্যই এটিকে আফগানিস্তানের অন্যান্য অনেক অঞ্চলের তুলনায় বিচ্ছিন্ন করেছে।
কিন্তু ‘সবসময় শান্ত ও নিরাপদ’ বলা অতিরঞ্জিত।
কারণ ওয়াখানের গুরুত্ব সামরিক সংঘর্ষের চেয়ে বরং তার কৌশলগত অবস্থানে।আজ তালেবান সরকারও এই অঞ্চলকে অবহেলা করছে না।
চীনের সীমান্ত পর্যন্ত সড়ক যোগাযোগ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘লিটল পামির রোড’ নির্মাণের কথা উঠে আসে। তবে চীন সীমান্তটি আনুষ্ঠানিক বাণিজ্যিক প্রবেশপথ হিসেবে খুলতে অত্যন্ত সতর্ক। এর পেছনে নিরাপত্তা, জিনজিয়াংয়ের স্থিতিশীলতা এবং সন্ত্রাসবাদবিরোধী উদ্বেগ গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
এখানেই একুশ শতকের ওয়াখানের নতুন ভূরাজনীতি শুরু।
চীনের জন্য ওয়াখান কেন গুরুত্বপূর্ণ?
মানচিত্রে দেখলে ওয়াখান যেন আফগানিস্তানের একটি সরু প্রান্ত মাত্র।কিন্তু বেইজিংয়ের দৃষ্টিতে এটি জিনজিয়াংয়ের দরজার কাছাকাছি একটি সীমান্ত অঞ্চল।চীন দীর্ঘদিন ধরেই জিনজিয়াং অঞ্চলের নিরাপত্তা নিয়ে অত্যন্ত সতর্ক।তাই আফগানিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত বাণিজ্য ও যোগাযোগ বাড়ানোর সম্ভাবনা যেমন চীনের জন্য অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করতে পারে, তেমনি নিরাপত্তা ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।এ কারণেই বেইজিংয়ের নীতি অনেকটা—যোগাযোগ চাই, কিন্তু নিয়ন্ত্রণহীন যোগাযোগ নয়।
চীন আফগানিস্তানের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বাড়াতে আগ্রহী হলেও ওয়াখান সীমান্ত খোলার ক্ষেত্রে অত্যন্ত হিসাবি অবস্থান নিয়েছে।
একসময় ব্রিটেন-রাশিয়ার ‘বাফার’, এখন চীন-আফগানিস্তানের কৌশলগত দরজা
এখানেই ওয়াখান করিডরের সবচেয়ে বড় ভূরাজনৈতিক রূপান্তর।
উনিশ শতকে প্রশ্ন ছিল—
রাশিয়া কি ব্রিটিশ ভারতের কাছে পৌঁছে যাবে?
আজ প্রশ্নটি কিছুটা বদলে গেছে—
চীন কি আফগানিস্তানের সঙ্গে সরাসরি স্থল যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বাড়াবে?
আরেকটি প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ—
আফগানিস্তান কি ওয়াখানকে মধ্য এশিয়া, চীন ও দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে একটি বাণিজ্যিক সেতুতে পরিণত করতে পারবে?
যদি পারে, তাহলে এই নিস্তব্ধ পাহাড়ি করিডর ভবিষ্যতে শুধু একটি সীমান্ত অঞ্চল থাকবে না।
এটি হয়ে উঠতে পারে—চীন–আফগানিস্তান–মধ্য এশিয়ার একটি সম্ভাব্য ভূ-অর্থনৈতিক সংযোগপথ।
তবে তার আগে প্রয়োজন রাস্তা, সীমান্ত অবকাঠামো, নিরাপত্তা, কাস্টমস ব্যবস্থা এবং সবচেয়ে বড় কথা—চীনের রাজনৈতিক আস্থা।
নামিবিয়ার সঙ্গে কি এর কোনো মিল আছে?
মানচিত্রের বিচারে তুলনাটি আকর্ষণীয়।
নামিবিয়ার উত্তর-পূর্বে থাকা ক্যাপ্রিভি স্ট্রিপও একটি দীর্ঘ সরু ভূখণ্ড, যা অনেকটা মানচিত্রের ওপর ‘আঙুলের’ মতো বেরিয়ে আছে।
তবে দুই অঞ্চলের ইতিহাস এক নয়।
ক্যাপ্রিভি স্ট্রিপ ছিল জার্মান ঔপনিবেশিক ভূরাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং জার্মান দক্ষিণ-পশ্চিম আফ্রিকাকে জাম্বেজি নদীর দিকে সম্ভাব্য যোগাযোগ দেওয়ার কৌশলগত উদ্দেশ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত।
অন্যদিকে ওয়াখান মূলত রুশ-ব্রিটিশ প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও আফগানিস্তানকে একটি বাফার হিসেবে ব্যবহারের বৃহত্তর ভূরাজনীতির ফল।
অর্থাৎ দুটির মধ্যে মানচিত্রগত সাদৃশ্য আছে, কিন্তু ভূরাজনৈতিক জন্মকাহিনি আলাদা।
শেষ কথা: ওয়াখান আসলে একটি মানচিত্র নয়, একটি ভূরাজনৈতিক গল্প
ওয়াখান করিডরের গল্প আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য শেখায়—
সীমান্ত সবসময় পাহাড়, নদী কিংবা জাতিগত পরিচয়ের স্বাভাবিক ফল নয়। অনেক সময় সীমান্ত আঁকে সাম্রাজ্য।
পামিরের বরফঢাকা পাহাড়ে দাঁড়িয়ে ব্রিটিশ ও রুশ কূটনীতিকরা হয়তো ভাবেননি যে তাদের আঁকা সীমারেখা একশ বছরেরও বেশি সময় পরে এমন এক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার জন্ম দেবে, যেখানে একই সরু ভূখণ্ডের দিকে তাকিয়ে থাকবে আফগানিস্তান, চীন, তাজিকিস্তান এবং পাকিস্তান।
একসময় ওয়াখানের মূল্য ছিল—
ব্রিটিশ ভারতকে রুশ সাম্রাজ্য থেকে আলাদা রাখা।আজ তার সম্ভাব্য মূল্য—চীনকে আফগানিস্তানের সঙ্গে যুক্ত করা।আর ভবিষ্যতে হয়তো এই বরফঢাকা ‘সরু আঙুল’ হয়ে উঠতে পারে মধ্য এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যকার নতুন ভূ-অর্থনৈতিক দরজা।
তাই ওয়াখান করিডরকে শুধু আফগানিস্তানের একটি অদ্ভুত মানচিত্রের অংশ হিসেবে দেখলে ভুল হবে।
এটি আসলে—
‘দ্য গ্রেট গেম’-এর রেখে যাওয়া এক জীবন্ত ভূরাজনৈতিক উত্তরাধিকার।


