সভ্যতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ: ইতিহাসের দাঁড়িপাল্লায় ইরান ও আমেরিকা

  • প্রকাশ: ১২ এপ্রিল ২০২৬, বিকাল ০৬:০৮
  • আপডেট: ১২ এপ্রিল ২০২৬, বিকাল ০৭:১৭
সভ্যতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ইতিহাসের দাঁড়িপাল্লায় ইরান ও আমেরিকা

লেখক-ইমদাদুল হক,সাংবাদিক ও কলামিস্টঃ

যে রাত্রিতে সাইরাস দ্য গ্রেট পারস্যের মাটিতে বসে মানবজাতির প্রথম মানবাধিকার সনদ রচনা করছিলেন, সেই একই রাত্রিতে ইউরোপের মানুষ গুহায় আগুন জ্বালিয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছিল। আর আমেরিকা? আমেরিকা তখনও কল্পনার গভীরেও আসেনি। আজ সেই আমেরিকা ঘোষণা দিচ্ছে, ইরানকে 'প্রস্তরযুগে' ফেরত পাঠাবে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এই ধরনের দম্ভ বরাবরই ফাঁকা আওয়াজ হয়ে ফিরে আসে।


ইহুদি জাতির ইতিহাস প্রায় চার হাজার বছরের পুরোনো, কেনান অঞ্চলকে কেন্দ্র করে যার সূচনা। এই জাতির ইতিহাসে যেমন নবী-রাসুলদের আগমন, তেমনি রয়েছে অবাধ্যতা, নির্বাসন, যুদ্ধ ও রাষ্ট্রের পতনের পুনরাবৃত্তি। ইসলামি বর্ণনা অনুযায়ী, হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর বংশধারা থেকে বনি ইসরায়েলের উদ্ভব — বিশেষত হজরত ইসহাক (আ.) ও হজরত ইয়াকুব (আ.)-এর মাধ্যমে।


হজরত দাউদ (আ.) ও সুলাইমান (আ.)-এর যুগে প্রতিষ্ঠিত ঐক্যবদ্ধ ইসরায়েল রাজ্য মাত্র ১২০ বছর টিকেছিল। তারপর বিভক্তি, ব্যাবিলনীয় দাসত্ব, রোমান বিজয়, দ্বিতীয় নির্বাসন এবং বিশ শতকে হলোকাস্টের বিভীষিকা পেরিয়ে ১৯৪৮ সালে আধুনিক ইসরায়েলের জন্ম। আর ১৯১৭ সালের বেলফোর ঘোষণা থেকে শুরু হওয়া সেই প্রক্রিয়ার পেছনে ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ও পরবর্তীকালে আমেরিকার অকুণ্ঠ সমর্থন।


"ইরান কোনো দেশ নয়, একটা সভ্যতা। আমেরিকানরা যখন গুহায় বাস করত, তখন সাইরাস দ্য গ্রেট ইরানে বসে মানবাধিকার রচনা করছিলেন।"


— ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি, ট্রাম্পের হুমকির জবাবে

দ্বাদশ দিনের যুদ্ধ থেকে মহাযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে


২০২৫ সালের জুন মাসে ইসরায়েল একক সামরিক অভিযানে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ও সামরিক নেতৃত্বকে নিশানা করে। মাত্র বারো দিনের সেই যুদ্ধে ইসরায়েল ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় মারাত্মক আঘাত হানতে সক্ষম হলেও পারমাণবিক কার্যক্রম সম্পূর্ণ ধ্বংস করতে পারেনি। ২১ জুন যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধে নামে — ফোর্দো, নাতাঞ্জ ও ইসফাহানে বি-২ স্টেলথ বোমারু বিমান দিয়ে হামলা চালায়।


কিন্তু ইরান ভেঙে পড়েনি। হরমুজ প্রণালী আংশিকভাবে বন্ধ করে দিয়ে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকট তৈরি করে। আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থাকে কৌশলগত মজুদ থেকে চারশ কোটি ব্যারেল তেল ছাড়তে বাধ্য হতে হয়। লেবানন, ইয়েমেন ও ইরাক থেকে প্রক্সি শক্তিগুলো একযোগে সক্রিয় হয়ে ওঠে।


সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ

ডিসেম্বর ২০২৫

ইরানে ব্যাপক অর্থনৈতিক সংকট। রিয়ালের মূল্য রেকর্ড তলানিতে। তেহরানের বাজার থেকে শুরু হয় বিক্ষোভ, যা দ্রুত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে।

জানুয়ারি ২০২৬

ট্রাম্প ইরানিদের বিক্ষোভ চালিয়ে যেতে আহ্বান জানান। ইরান সরকার বিক্ষোভ দমনে কমপক্ষে ৩০,০০০ মানুষ হত্যা করে। যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে ২০০৩ সালের ইরাক আক্রমণের পর সবচেয়ে বড় সামরিক মোতায়েন শুরু করে।

ফেব্রুয়ারি ২০২৬

ওমানে মার্কিন-ইরান পারমাণবিক আলোচনা। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, চুক্তি "নাগালের মধ্যে"। কিন্তু ট্রাম্পের দেওয়া ১০ দিনের সময়সীমার মধ্যে সমঝোতা হয়নি। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সরাসরি হামলা শুরু করে।

মার্চ ২০২৬

হরমুজ প্রণালী কেন্দ্রীয় রণক্ষেত্রে পরিণত। হুতিরা ইয়েমেন থেকে ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করে। লেবাননে হিজবুল্লাহ পুনরায় সক্রিয়।

এপ্রিল ১২, ২০২৬

মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভান্স পাকিস্তান ছেড়ে চলে যান। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি আলোচনা কোনো চুক্তি ছাড়াই শেষ হয়। সংঘাত চলমান।

শক্তির হিসাব-নিকাশ


সংখ্যার বিচারে ইরান অনেকটাই সুবিধাজনক অবস্থায়। ইরানের সক্রিয় সেনাসংখ্যা প্রায় ছয় লাখ এবং রিজার্ভ তিন লাখ পঞ্চাশ হাজার — ইসরায়েলের মোট সেনাসংখ্যার তিনগুণেরও বেশি। আয়তনের দিক থেকে ইরান ইসরায়েলের চেয়ে প্রায় চুয়াত্তর গুণ বড়। কিন্তু শুধু সংখ্যা দিয়ে যুদ্ধ জেতা যায় না।


ইসরায়েলের আয়রন ডোম, ডেভিড'স স্লিং ও অ্যারো প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মার্কিন সহায়তায় অধিকাংশ ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু প্রতিরক্ষার এই খেলায় দুর্বলতাও আছে — হুতিদের বিরুদ্ধে মাত্র তিন সপ্তাহের অভিযানে আমেরিকার খরচ হয়েছে ১০০ কোটি ডলার। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে এই হিসাব ভয়ঙ্কর আকার নেবে।


"ইরান ঠিকই এই যুদ্ধের পর উঠে দাঁড়াবে নিজের শক্তি দিয়ে। আর আমেরিকার সাহায্য ছাড়া উঠে দাঁড়াতে ৪০ বছর লেগে যাবে ইসরায়েলের।"


— এবিসি নিউজের সামরিক বিশেষজ্ঞ

ইন্দো-প্যাসিফিকের ছায়া


মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় কৌশলগত ক্ষতি হচ্ছে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে। আমেরিকার বিমানবাহী রণতরি ও নৌবাহিনী পারস্য উপসাগরে আটকে যাওয়ায় চীন ও তাইওয়ান প্রশ্নে মার্কিন প্রতিরোধ সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়েছে। বেইজিং ও মস্কো তেহরানকে নেপথ্যে সহায়তা দিয়ে এই দুর্বলতা কাজে লাগাচ্ছে। জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, এই যুদ্ধ সীমিত অপারেশন থেকে দ্রুত বহুমাত্রিক আঞ্চলিক সংঘাতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে আছে।


ইরাক ও আফগানিস্তানের তিক্ত শিক্ষা মনে করিয়ে দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। জেনারেল ডেভিড পেট্রাউস সেই বিখ্যাত প্রশ্নটি আবার প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে: "বলো তো, এর শেষ কোথায়?"


টিকে থাকার লড়াই


ইরান মূলত "যদি না হারো, তাহলে জিতে যাবে" — এই কৌশল অনুসরণ করছে। তারা জেতার চেষ্টা নয়, টিকে থাকার চেষ্টা করছে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল সরবরাহ হয় — ইরান এই প্রণালীকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে চাপে রাখতে পারছে। আর ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকারের ঘোষণা অনুযায়ী, স্থলযুদ্ধ শুরু হলে সত্তর লাখ তরুণ ইরানি অস্ত্র হাতে প্রস্তুত।


সাবেক মার্কিন কর্নেল ডেভিস তাঁর বিশ্লেষণে বলেছেন, পারমাণবিক অস্ত্র ছাড়া আমেরিকা-ইসরায়েল মিলেও ইরানকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করতে পারবে না। আর আমেরিকা পারমাণবিক অস্ত্র কোনো দিনই ব্যবহার করবে না — রাজনৈতিক, নৈতিক ও কূটনৈতিক কারণে।


ইতিহাস বলে, সভ্যতার বিরুদ্ধে যুদ্ধে জেতা যায় না। রোমানরা পারস্য জয় করতে পারেনি, মঙ্গোলরা ধ্বংস করলেও পারস্যের প্রাণ নিভিয়ে দিতে পারেনি। সভ্যতা আঘাত পায়, ভেঙে পড়ে, কিন্তু টিকে থাকে। সোয়া দুই শ বছরের আমেরিকার সামনে প্রশ্নটি তাই কেবল সামরিক নয় — গভীরভাবে সভ্যতার। আর সেই প্রশ্নের উত্তর ইতিহাস ইতিমধ্যেই দিয়ে রেখেছে।

Ad